ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজা বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে গেলেন। গাছে উঠে শবদেহ নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, এত পরিশ্রম করে শেষপর্যন্ত হয়তো তুমি জয়ী হবে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে চন্দ্রের মতো তুমিও না শেষে সেই জয়ের মালা পরতে না চাও। চন্দ্রের কাহিনি শুনলে তোমার ভালো লাগবে। পথের শ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল
প্রাচীন কালে সত্রাজিত নামে এক যক্ষরাজ ছিল। তার ছিল এক মেয়ে। নাম তেজবতী। তেজবতী ছিল খুব সুন্দর। সত্রাজিতের দুই দিকে দু-জন যক্ষকুমার সবসময় সেবা করার জন্য প্রস্তুত থাকত। তাদের মধ্যে একজনের নাম রুদ্র। অন্যজনের নাম চন্দ্র।
রুদ্রের প্রতি সত্রাজিতের একটু বেশি স্নেহ ভালোবাসা যেন ছিল। আবার রুদ্র যে সত্রাজিতকে বেশি করে সেবা করত তার মূলে ছিল তেজবতী। রুদ্র তাকে খুব ভালোবাসত। রুদ্রের রূপ তেমন সুন্দর ছিল না। তাকে পরাক্রমশালীও বলা যায় না। অপরপক্ষে চন্দ্রের বেলায় এই কথা খাটে না। চন্দ্র ছিল খুব সুন্দর। শক্তিও তার ছিল প্রবল। তাই চন্দ্রের রূপে তেজবতী মুগ্ধ ছিল। তেজবতীর সৌন্দর্যে চন্দ্রও মুগ্ধ ছিল। চন্দ্র জানত যে তেজবতীকে রুদ্র ভালোবাসে। সে ভালোবাসলেও তেজবতী যে তাকে ভালোবাসে তার প্রমাণ সে পায়নি। চন্দ্র বুঝেছিল, রুদ্র তেজবতীকে পাবে না। তার প্রতি চন্দ্রের সহানুভূতি জেগেছিল।
সত্রাজিত মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে লাগল। জানতে পেরে রুদ্র মনে মনে মরে যাচ্ছিল। শেষে একদিন সাহসে বুক বেঁধে রুদ্র সত্রাজিতকে তার মনের কথা জানিয়ে দিল। শুনে সত্রাজিত রাগ করেনি। বরং মেয়েকে পরামর্শ দিয়েছিল রুদ্রকে বিয়ে করতে।

'কী পরীক্ষা করবি?' সত্রাজিতের প্রশ্ন।
'গন্ধর্ব বনে একটি প্রস্রবণ আছে। সেখানে অনেক সুবর্ণকমল রয়েছে। সেই সুবর্ণকমলের রস খেলে শুধু যে মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায় তাই নয়, রূপও খোলে। স্বর্গবাসীর মতো সুন্দর রূপ হয়। তবে সেখানে গন্ধর্বদের কড়া পাহারা আছে। তাদের পরাজিত করে সে যদি সেই সুবর্ণকমল আনে তবেই তাকে আমি বিয়ে করব। শুধু রুদ্র নয়, যে আনবে তাকেই বিয়ে করব।' তেজবতী বলল।
সত্রাজিত আর দুই সেবক, রুদ্র ও চন্দ্রকে এই কথা জানাল। শুনে দু-জনেই গন্ধর্ব বনের দিকে রওনা হল। চন্দ্রের ছিল প্রচণ্ড সাহস। শক্তিও ছিল তার খুব। অত্যন্ত দুর্গম পথ দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সে চলে গেল গন্ধর্ব বনে। সুবর্ণকমল সে দেখতে পেল। জলে নেমে কমলে হাত দিতেই পিছন দিক দিয়ে একটি সিংহ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আশেপাশে একজন গন্ধর্ব লুকিয়ে বসেছিল। চন্দ্রকে দেখে সে সিংহরূপ ধারণ করে চন্দ্রের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে গর্জন করতে লাগল। চন্দ্র ভয় পেল না। সে মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পেরেছিল যে এটা আসল সিংহ নয়। তাই ঝটপট সিংহের গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে কাবু করে ফেলল। পরমুহূর্তে গন্ধর্ব নিজের রূপ ধারণ করল।
তখন চন্দ্র সব কথা জানাল। শুনে গন্ধর্ব তার হাতে একটি সুবর্ণকমল ছিঁড়ে দিল। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারে আর না এগিয়ে চন্দ্র একটি গুহায় রাত্রি কাটাবে ঠিক করে নিল।
গভীর রাত্রে চন্দ্র সিংহের গর্জন শুনতে পেল। তাড়াতাড়ি গুহা থেকে বেরিয়ে চারদিকে সে ছোটাছুটি করতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পেল রুদ্র ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে গোঁঙাচ্ছে।
তৎক্ষণাৎ চন্দ্র রুদ্রকে নিয়ে গুহায় গেল। তার কাছে যে সুবর্ণকমল ছিল সেটি ছিঁড়ে তার রস বের করে রুদ্রের যেখানে যেখানে ঘা ছিল সেখানে সেখানে লাগাল। দেখতে দেখতে রুদ্র অল্পক্ষণের মধ্যেই সেরে উঠল। তার রূপও বদলে গেল। সে অনেক সুন্দর রূপ পেল। রুদ্র এরজন্য চন্দ্রের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাল। গন্ধর্ব বন থেকে পরে চন্দ্র ও রুদ্র সত্রাজিতের কাছে ফিরে এল। ওদের মধ্যে কেউ স্বর্ণকমল আনল না।
শেষে তেজবতী রুদ্রকেই বিয়ে করল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, তেজবতী সুন্দরের পূজারি ছিল। রুদ্রকে, সুবর্ণকমলের রস লাগানোর পর অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিল। তাই, রুদ্রকে তেজবতী বিয়ে করে স্বাভাবিক কাজই করেছে। কিন্তু অবাক লাগে, চন্দ্র ওই সুবর্ণকমল আনতে গেল কেন? তাহলে কি তেজবতী কৌশল করে চন্দ্রকেও পাঠাতে বলল? তেজবতীর অনুরোধেই কি রাজা রুদ্র ও চন্দ্রকে গন্ধর্ব বনে পাঠিয়েছিল? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'সত্রাজিতের মেয়ে তেজবতীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল রুদ্র, চন্দ্র নয়। ওদের দু-জনের মধ্যে একজনকে বিয়ে করার কথা বললে তেজবতী চন্দ্রকেই বেছে নিত। কিন্তু তা যখন হল না তখন তাকে কৌশল করতে হয়েছিল। কারণ তেজবতী দু-জনেরই ক্ষমতা জানত। সে নিশ্চিত ছিল যে চন্দ্র জয়ী হবে। রুদ্র পরাজিত হবে। তবে ইচ্ছে ছিল, সুবর্ণকমলের রসের সাহায্যে চন্দ্রকে আরও সুন্দর করে তুলে তাকে সে বিয়ে করবে। কিন্তু তেজবতীর সমস্ত ইচ্ছা মাটিতে মিশে গেল। এবং এরজন্য চন্দ্রই দায়ী। সত্রাজিতের নির্দেশমতো চন্দ্র প্রতিযোগিতায় নামল, তেজবতীকে পাওয়ার জন্য নয়। কারণ প্রথম থেকেই রুদ্রের প্রতি তার করুণা জেগেছিল। রুদ্রের ভালো হোক সে তাই চাইত। সে জানত যে রুদ্র তেজবতীকে ভালোবাসে। তাই সে আর সেখানে অপেক্ষা না করে সোজা সত্রাজিতের কাছে ফিরে এল।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল আবার শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন