অবিশ্বাস

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, তোমার দেখছি ভগবানের উপর ভক্তিশ্রদ্ধা আছে। তুমি অতিসারণের মতো নাস্তিক নও। যারা নাস্তিক তারা অনেক কিছু হাতের কাছে পেয়েও হারায়। অতিসারণের কাহিনি শুনতে তোমার ভালো লাগবে। পথ চলার পরিশ্রমও কমবে। তার কাহিনি বলছি শোনো।' বেতাল কাহিনি শুরু করল

পাটলিপুত্রে নামকরা ব্যাবসাদারদের মধ্যে অতিসারণ ছিল একজন। তার বাবা-মা ভাই-বোন কেউ ছিল না। নিজে সে অবিবাহিত ছিল। সে ভাগ্য বিশ্বাস করত। কিন্তু ঠাকুরদেবতার উপর তার বিশ্বাস ছিল না। তার ধারণা ছিল ভাগ্যে যা লেখা থাকে তাই হয়। দেবতা কিছুই করতে পারে না। তাই সে কোনোদিন মন্দিরে যেত না। বিপদে-আপদে পড়ে ঠাকুরদেবতার নামে মানত রাখত না। মোটামুটি সৎ, জীবনযাপন করার চেষ্টা করত।

একবার সমস্ত টাকাপয়সা ঢেলে সে জাহাজে করে ফিরছিল। তার জাহাজ যখন মাঝসমুদ্রে তখন ঝড় তুফান ওঠে। প্রত্যেকে জোরে জোরে ঠাকুরদেবতার নাম করছিল। প্রার্থনা করছিল। মানত করছিল। কিন্তু অতিসারণ কিছুই করেনি। তা লক্ষ করে অন্যেরা বলাবলি করল, 'এই নাস্তিকের জন্যই আমাদের প্রার্থনা ভগবানের কানে যাচ্ছে না। একে জাহাজ থেকে বের করে দিলে আমরা বাঁচতে পারব। তারপর ওরা সবাই অতিসারণকে ধরে একটা বড়ো কাঠের সঙ্গে বেঁধে সমুদ্রে ফেলে দিল। ওকে ফেলে দেওয়ার পরে জাহাজ ডুবে গেল; জাহাজের সমস্ত যাত্রী মারা গেল।

অতিসারণ ভাসতে ভাসতে সমুদ্রতীরে উঠল। সেটা একটা দ্বীপ। দ্বীপের নাম মণিদ্বীপ। দ্বীপের অধিবাসীরা ওকে দেখতে পেয়ে ধরে নিয়ে গেল তাদের রাজার কাছে। সেই রাজার নাম রত্নকেতু।

'না মহারাজ, পাটলিপুত্রে আমি আর যেতে চাই না। সেখানে আমার কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। আমি এখানেই থেকে যাহোক কিছু করে কোনোরকমে কাটিয়ে দিতে চাই।' অতিসারণ বলল।

রাজা অতিসারণকে নিজের কাছেই রাখলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মাঝে মধ্যে অতিসারণের সঙ্গে তার কথাবার্তা চলত। ঠাকুরদেবতার উপর রাজার গভীর ভক্তি ছিল। ভগবানের উপর অতিসারণের বিশ্বাস নেই দেখে রাজা অবাক হয়েছিল।

একদিন রাজা অতিসারণকে সরাসরি প্রশ্ন করল, 'বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুর যিনি স্রষ্টা, যাঁর ইচ্ছায় সব কিছু চলছে তাঁর প্রতি তোমার বিশ্বাস এবং ভক্তি নেই?'

জবাবে অতিসারণ বলল, 'রাজা, আমার কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই। আমি পাপ করি না, অন্যের অপকার করি না। উপকার করার চেষ্টা করি। আমি কাউকে ভয় করি না। তাই আমার মতো লোকের ভগবানের প্রতি ভক্তি আসবে কোথা থেকে? কোনো কিছুকে ভয় করলে তো ভক্তিভরে ভগবানের কাছে কিছু চাইতে হয়। আমার ভয় নেই। ভগবানকে আমার কীসের জন্য দরকার?'

রাজা কোনো জবাব দিতে পারল না। একদিন রাজা রত্নকেতু রাজসভায় যাচ্ছেন হঠাৎ অতিসারণ রাজাকে পেছন দিক দিয়ে ডেকে বলল, 'মহারাজ একটু দাঁড়ান।'

রাজা দাঁড়াল। আর ঠিক সেইসময় রাজসভায় ঢোকার মুখের দরজা ভেঙে পড়ল। ওই ভারী দরজা রাজার উপর পড়ে গেলে রাজা মরে যেত। এই বিরাট বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে রাজা সেদিন প্রত্যেকটি মন্দিরে ঘুরে পুজো দিয়ে এল। আর একদিনের ঘটনা বলছি।

অন্যদিনের মতো সেদিনও রাজা প্রাসাদের কাছের মন্দিরে ঢুকল। অতিসারণ রাজার সঙ্গে ছিল। আর ছিল রাজার অঙ্গরক্ষক। অতিসারণ রাজার সঙ্গে মন্দির পর্যন্ত গেল কিন্তু মন্দিরে ঢুকল না। বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।

রাজা যখন একমনে পুজো করছিল তখন অঙ্গরক্ষক কোনো অজানা কারণে রাজার গলা কাটতে গেল। তা চোখে পড়তেই অতিসারণ ঝট করে একটা ছোরা ওই অঙ্গরক্ষকের দিকে ছুঁড়ল। অঙ্গরক্ষক আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। রাজা এসব দেখে অবাক হয়ে গেল। যা ঘটেছে অতিসারণ তা রাজাকে বুঝিয়ে বলল।

রাজা অতিসারণের কথা শুনে আর একবার সাষ্টাঙ্গে দেবতাকে প্রণাম করে তাকে বলল, 'দেখ অতিসারণ, চোখের সামনে দেখলে! এটা দেখেও কি তোমার মনে হয় না যে স্বয়ং দেবতা আমাকে কীভাবে বাঁচিয়েছেন। তাই বলছি এবার থেকে তুমিও ঠাকুরদেবতার প্রতি বিশ্বাস পোষণ কর।'

রাজার কথায় অতিসারণ কোনো কথা বলল না। সেদিন চুপচাপ ছিল। পরের দিন পাটলিপুত্রে যাওয়ার ব্যবস্থা করে চলে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অতিসারণের ঠাকুরদেবতার উপর বিশ্বাস ছিল না কেন? রাজা রত্নকেতু অত করে বললেও কেন সে দেবতার ভক্ত হল না? রাজা তাকে কত ভালো রেখেছিল। তবু সে কেন পাটলিপুত্রে ফিরে গেল। আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি সমাধান না দাও তবে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অতিসারণ নাস্তিক ছিল না। ঠাকুরদেবতার প্রতি গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস তার ছিল। তবে ভগবানের প্রতি অন্ধবিশ্বাস ছিল না। যাদের মনে ঠাকুরদেবতার প্রতি অন্ধবিশ্বাস থাকে তারা কোনো বিপদের ফাঁড়া কেটে গেলে অথবা উপকৃত হলে ঘটা করে পুজো দেয়। কিন্তু যে মানুষের জন্য তাদের বিপদ কেটে যায় অথবা উপকৃত হয় তাকে কৃতজ্ঞতা জানায় না। দু-দু-বার অতিসারণ বিপদের হাত থেকে রাজাকে বাঁচাল। কিন্তু রাজা তাকে একবারও ধন্যবাদ জানাল না। ওই ধরনের অকৃতজ্ঞ রাজার কাছে অতিসারণ আর থাকতে চাইল না। সে পাটলিপুত্রে ফিরে গেল।

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%