ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে এসে, গাছের উপরে উঠে, শব নাবিয়ে, কাঁধে ফেলে আগের মতাে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, তােমাকে কি কোনাে রাজকুমারী পরীক্ষা করেছ? তা তাে নয়। আর যদি করেও তাহলে সেই পরীক্ষায় যােগ দেওয়ার কোনাে মানে হয় না। কত লােক যােগ দেয়। কে যে কোন কারণে জয়ী হয় তা কেউ বলতে পারে না। এই প্রসঙ্গে তােমাকে হিমবাহুর কন্যা হিমানীর স্বয়ংবর সভার কাহিনি বলছি। শুনলে তােমার এই পথ চলার কঠিন পরিশ্রম কমে যাবে।' বেতাল বলল :
অনেকদিন আগে হিমালয়ের এক দুর্গম অঞ্চলে হিমগড় নামে এক রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের চারদিকে ছিল উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি। একটি মাত্র সরু গিরিপথ দিয়ে সেই রাজ্যে ঢােকার পথ ছিল। ফলে কারও পক্ষে সেই রাজ্যে ঢােকা সহজ ছিল না। জীবন বিপন্ন করে ঢুকতে হত।
হিমগড় রাজ্যের রাজা ছিল হিমবাহু। তার হিমানী নামে এক মেয়ে ছিল। রাজার আর কোনাে সন্তান না হওয়ায় রাজার একমাত্র উত্তরাধিকারী ছিল হিমানী। রাজার মৃত্যুর পর সেই পাবে দেশের সমস্ত কিছুর ভার।
ষােলাে বছর পূর্ণ হতেই হিমবাহু মেয়ের বিয়ের চিন্তা করতে লাগল। হিমানীর জন্য যােগ্য পাত্রের খোঁজ করা তার কাছে এক বিরাট সমস্যার মতাে লাগল। হিমানীকে যে বিয়ে করবে সে রাজকুমার না হলে রাজ্য শাসনের ব্যাপারে হিমানীকে সাহায্য করতে পারবে না। হিমগড় এমন একটা দেশ যেখানে অন্য দেশের লােকের যাতায়াত নেই বললেই চলে। অন্য দেশের মানুষ অত কষ্ট করে হিমগড়ে আসতেও চায় না।
তবে হিমবাহুর কাছে পায়রা ছিল। তারা চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতে পারত। যােগ্য বরের যােগাযােগ করার জন্য আহ্বান জানিয়ে বহু চিঠি পায়রার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিল চারদিকে। পায়রাগুলাে নানান দেশের দিকে উড়ে গেল সেই চিঠি নিয়ে। যাকে যাকে চিঠি দিয়ে আসার তাকে তাকে দিয়ে এল।
সেই কালে সমুদ্রতীরে সমতাত নামে এক দেশ ছিল। একদিন রাত্রে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বন্যার তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যায়। রাতারাতি সমস্ত দেশের চেহারা বদলে গেল রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়ে গেল। ঘরবাড়ি সব ভেঙেচুরে সমুদ্রের জলে ডুবে গেল। সেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েও সমতাত রাজার রাজকুমার সমুদ্রসেন তীরে আছাড় খেয়ে পড়ে রইল। তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর।
সমুদ্রসেন বৌদ্ধ মঠে থেকে লেখাপড়া করতে লাগল। এক বন্যায় সমতাত দেশের সব কিছু ধুয়ে-মুছে যাওয়ায় সে সেই মঠেই লালিতপালিত হতে লাগল। তার অন্য কোথাও যাওয়ার কোনাে উপায় ছিল না। বৌদ্ধ মঠে যারা আসত তারা নানা বিদ্যায় দক্ষ ছিল। প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখার সুযােগ পেত সমুদ্রসেন। অনেক কিছু তার জানা হয়ে গেল। এমনকী জাদুও তার অজানা ছিল না।
এইভাবে নানা বিদ্যা অর্জনের মধ্য দিয়ে ভালাে পরিবেশে সে বাড়তে লাগল।
সমুদ্রসেনের অন্য কোনাে দিকে নজর ছিল না। তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। ছিল বিদ্যা অর্জনের দিকে। সে সবসময় সেই চিন্তা নিয়েই থাকত।
তার বয়স হল কুড়ি। সেইসময় হিমানীর বিয়ের খবর দেশে ছড়িয়ে পড়ল। অনেক রাজকুমার হিমগড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হয়ে ফিরে গেল। সে কথা প্রচার হয়ে গেল। কীভাবে কীভাবে যেন খবরটা বৌদ্ধ মঠেও পৌছাল। সমুদ্রসেন শুনে ঠিক করল হিমগড়ে যাবে। হিমানীকে বিয়ে করবে। মঠাধিপতির কাছে গিয়ে সে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করল। শুনে মঠাধিপতি বলল, ‘যাও। অবশ্যই যাও। কেন যাবে না? তুমি তাে রাজকুমার। এক রাজকুমারের যত রকমের গুণ থাকে আমরা তােমাকে তার প্রত্যেকটা শিখিয়েছি। কিন্তু মনে রেখাে, দুর্গম পথ। দুস্তর অঞ্চল। একটি মাত্র পথ আছে। তাও আছে। বিপদের পাহাড় মাথায় নিয়ে। হিংস্র জন্তুদের আক্রমণের ভয়ও আছে। এত অসুবিধা থাকাতেই কেউ সহজে হিমগড় পৌঁছাতে পারে না। একমাত্র গণ্ডার নাকি সেই পথে যেতে পারে।'
পরদিন জাল পেতে এক গণ্ডার ধরল সমুদ্রসেন। কয়েক দিনের চেষ্টায় তাকে পােষ মানালাে। এক সপ্তাহ পরে সমুদ্রসেন মঠের প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গণ্ডারে চড়ে রওনা হল।

তিন সপ্তাহের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে সে হিমগড়ে পৌঁছাল। সে গিয়ে দেখে তার আগেই রত্ন দেশের রাজার ছেলে হীরককুমার পৌঁছে গেছে। দু-জনের মধ্যে রাজার অতিথিশালায় আলাপ-পরিচয় ও কথাবার্তা হল।
‘আপিন এখানে কীভাবে পৌঁছাতে পারলেন? কবে এলেন?’ সমুদ্রসেন হীরককুমারকে জিজ্ঞেস করল।
‘বিমানে এসেছি। আমার দেশে এক নাম করা শিল্পী আছে। সেই বানিয়ে দিয়েছে। কুড়িটি হংস আমাকে বিমানে করে এখানে এনেছে।' বেশ অহংকারের সঙ্গে বলল হিরককুমার।
‘দুটো রাজকুমার এসে গেছে, এখন কী করা যায় মন্ত্রী ?’ হিমবাহু জিজ্ঞেস করল মন্ত্রীকে।
আড়াল থেকে হিমানী বলল, 'যা করতে হবে আমি করব। ব্যাপারটা, বাবা আপনি আমার উপর ছেড়ে দিতে পারেন।'
'তুমি কী করবে মা? রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল।
‘একটা পরীক্ষা নেব। কী ধরনের পরীক্ষা নেব তা তুমিও দেখতে পাবে।' বলল রাজকুমারী হিমানী।
রাজা ওই দুই রাজকুমারকে দিন কয়েক বিশ্রাম করতে বলল ওই অতিথিশালায়। রাজকুমারী নিজেই নিজের বর বাছাই করে নেবে এবং তারজন্য তাদের প্রস্তুত থাকতেও বলে দিল রাজা হিমবাহু।
হিরককুমার ও সমুদ্রসেন রাজকুমারী হিমানীকে তখনও দেখেনি।
একদিন সকালে রাজকুমারীর পরিচারিকা এসে হিরককুমারকে রাজার উদ্যানে নিয়ে গেল। আড়াল থেকে সে হিমানীকে দেখে নিল। রাজকুমারী একটি গাছের নীচে বসে ফল খাচ্ছিল। গাছটা ছিল বাতাবি নেবুর। গাছ বাতাবি নেবুর ভারে নুয়ে পড়েছিল। হিমানী বাতাবি নেবুই খাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সে একটি বাতাবি নেবু অমৃত ফলের গাছের দিকে ছুঁড়ে মারল। তৎক্ষণাৎ পরিচারিকারা তাকে অমৃত ফলের গাছের নীচে তার শােওয়ার ব্যবস্থা করল। হিমানী সেখানে শুলাে। তারপর যে পরিচারিকা হিরককুমারকে এনেছিল সেই তাকে নিয়ে অতিথিশালায় ফিরে গেল।
পরের দিন সেই পরিচারিকা এসে সমুদ্রসেনকে নিয়ে গেল। হিরককুমার যা যা দেখল সমুদ্রসেনও একই দৃশ্য ও কাজকর্ম দেখতে পেল। তারপর ফিরেও এল।
‘রাজকুমারী হিমানী বাতাবি নেবু খুব পছন্দ করে।' বলল হিরককুমার। 'হতে পারে।' সমুদ্রসেন বলল। ইতিমধ্যে রাজকুমারীর পরিচারিকা ঘুরে এসে বলল, 'কাল সকালে রাজকুমারী প্রত্যেককে আলাদা আলাদা দেখবেন। আপনারা কে কোন উপহার দেবেন তা ঠিক করে রাখুন। কারণ দেয় উপহারের ভিত্তিতেই বর বাছাই নির্ভর করছে।' বলে অন্য কোনাে কথা না বলে পরিচারিকা চলে গেল।
ওর চলে যাওয়ার পর দুই রাজকুমার চিন্তায় পড়ে গেল। দুজনের মধ্যে কোনাে কথা হল না। সােজা যে-যার ঘরে চলে গেল। ভাবতে ভাবতে তারা কুলকিনারা পেল না। সারারাত ভাবতে লাগল। অনেক চেষ্টা করেও তারা ঘুমােতে পারল না।
সকালে পরিচারিকা এসে হিরককুমারকে নিয়ে রাজকুমারীর মন্দিরে নিয়ে গেল। হিরককুমার নিজের পােশাকের ভিতরে একটা বাতবি নেবু লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সে সেটাই রাজকুমারীকে উপহার দিল। রাজকুমারী সাদরে তা গ্রহণ করে হিরককুমারের সঙ্গে ভালােভাবে কথা বলে তাকে বিদায় দিল। হিরককুমারের নিশ্চিত ধারণা হল যে রাজকুমারীর মনের মতাে জিনিসই সে দিতে পেরেছে। সে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে অতিথিশালায় ফিরে এল।
তারপর সমুদ্রসেনের পালা। সে-ও একটা বাতাবি নেবু বের করল। সেটা একটা কাঠের উপর রেখে পকেট থেকে রুমাল বের করে বাতাবি নেবুটাকে ঢাকল। কিছুক্ষণ পরে সে ওই রুমাল তুলে নিতেই দেখা গেল সেখানে বাতাবি নেবুর পরিবর্তে অমৃত ফল আছে। হিমানী চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল।
হাসিখুশি ভাব দেখে সমুদ্রসেন বুঝল যে রাজকুমারী সহজসরল মনে সব বিশ্বাস করেছে। তাই সে বলল, 'একটু জাদুর সাহায্য নিয়েছি।'
হিমানী ঘােষণা করে দিলে যে সে সমুদ্রসেনকেই বরণ করে নিয়েছে। তারপর হিরককুমার হতাশ হয়ে ফেরার মুখে সমুদ্রসেনকে জিজ্ঞেস করল, 'নিশ্চয়ই কিছু একটা কাণ্ড করে বাতাবি নেবুকে অমৃত ফলে রূপান্তরিত করেছ। কী করে করলে বল না ভাই?’
'কীভাবে কী করেছি, বলছি। বাতাবি নেবুকে চিরে তার ভেতরের কোওয়া বের করে তাতে অমৃত ফল ঢুকিয়ে দিয়েছি। এক হাতে ওটাকে হিমানীকে দেখিয়ে অন্য হাতে ঢেকে দিলাম সেটা রুমাল দিয়ে। পরে রুমাল তােলার সময় বাঁ-হাতে অমৃত ফল ধরে চোকলাটাকে রুমাল দিয়ে এমনভাবে তুললাম যাতে রাজকুমারীর চোখে চোকলাটা না পড়ে।'
শুনে, ‘এই তােমার জাদু’, বলে সােজা বিমানে উঠে চলে গেল হিরককুমার। তারপর হিমানীর সঙ্গে সমুদ্রসেনের বিয়ে হল।
বেতাল এই কাহিনি বলে রাজাকে জিজ্ঞেস করল, ‘রাজা, রাজকুমারী হিমানীর বর বাছাই সম্পর্কে তােমার মত কী? রাজার কাছে পরীক্ষা করে বর বাছাই করার কথা বলে শেষে কিনা সামান্য জাদু খেলা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেল। আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।
জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘রাজকুমারী পরীক্ষা নিয়েছে বই কী। তার বাতাবি নেবু খাওয়া এবং তা অমৃত ফলের গাছের দিকে ছুঁড়ে সেখানে বিশ্রাম করা দুটো রাজকুমারেরই নজরে পড়েছিল। কিন্তু তার অর্থ হীরককুমার বুঝতে পারেনি। সমুদ্রসেন বুঝতে পেরেছিল। সে এমনি একটা অমৃত ফল দিলেও হিমানী তাকেই বর হিসেবে গ্রহণ করত। কারণ হিমানী বােঝাতে চেয়েছিল যে তার বর্তমান জীবন বাতাবি নেবুর মতাে। সে অমৃত ফলের মতাে হতে চায়। এই ছিল তার বাসনা। তার ইচ্ছাকে জাদুর মাধ্যমে সুন্দরভাবে প্রকাশ করায় হিমানী সমুদ্রসেনকেই বর হিসেবে বরণ করে নিল।
রাজার এভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল পালাল। আবার গিয়ে উঠল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন