ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যতই চেষ্টা কর না কেন বিধি খণ্ডানোর ক্ষমতা কারও নেই। আমার কথা যে সত্য তার প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে একটি কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শোনার ফলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে। শোন বলছি।
বেতাল কাহিনি শুরু করল
সিন্ধু নদীর তীরে ব্রহ্মস্থলী নামক গ্রামে বেদশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ ছিল। চারটি বেদই তার জানা ছিল। তার ছিল এক বিশেষ শিষ্য। অত্যন্ত পরিশ্রম করে সে বেদ অধ্যয়ন করেছিল। উত্তরকালে তার নাম হয়েছিল দৃঢ়োদ্যম। দৃঢ়োদ্যমের খাওয়া-পরার খরচের ব্যাপারে তার মাথাব্যথা ছিল না। রাতদিন পরিশ্রম করে মাত্র দশ বছরের মধ্যে সে চারটি বেদেই পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিল। দৃঢ়োদ্যম ভিন্নতমস নামে এক ধনী লোকের বাড়িতে থাকত।
একদিন রাত্রে ভিন্নতমস দৃঢ়োদ্যমকে বলল, 'আমার এখন অনেক বয়স হয়েছে। আমি আমার এই বিরাট বাড়ি, অসংখ্য গোরু, মোষ, চাষের অগাধ জমি, স্ত্রী, চাকর ইত্যাদি তোমার হাতে দিয়ে চলে যেতে চাই। ঋষিদের কথামতো এই বয়সে আমার তীর্থে যাওয়া উচিত। তীর্থে তীর্থে ঘুরে অবশেষে আমি মুক্তির জন্য কাশীতে চলে যাব। তুমি এখন থেকে এসব পরিচালনা করার ভার নেবে, দেখাশোনা করবে।'
এই কথায় খুশি হয়ে দৃঢ়োদ্যম ভিন্নতমসের কাছ থেকে সমস্ত বিষয়সম্পত্তি বুঝে নিল। তারপর গুরুর কাছে গিয়ে, বিদায় নিয়ে ভিন্নতমসের বিষয়সম্পত্তি দেখাশোনা করবে বলে তাকে কথা দিয়ে গুরুর কাছে চলে গেল।
পরের দিন দৃঢ়োদ্যম ফিরছে না দেখে ভিন্নতমস দৃঢ়োদ্যমের খোঁজে তার গুরুর বাড়িতে গেল। সেখানে গিয়ে দৃঢ়োদ্যমকে দেখে তাকে না ফেরার কারণ জিজ্ঞেস করল। তখন দৃঢ়োদ্যম ভিন্নতমসকে বলল, 'এখনও আমি গুরুর কাছ থেকে বিদায় নিতে পারিনি। গুরুর অনুমতির অপেক্ষায় আছি। গুরু ভীষণ ব্যস্ত রয়েছেন। কারণ বুঝতে পারছি না।'
ভিন্নতমস একটু হেসে বলল, 'তোমার গুরু তমোভেদের স্ত্রীর পেটে ব্যথা উঠেছে। তাঁর বাচ্চা হবে। আমি জানি তাঁর একটি মেয়ে হবে। আমি এও জানি যে সেই মেয়ের সঙ্গেই তোমার বিয়ে হবে। আর ওই মেয়ে কুলত্যাগী হবে। এখন তোমাদের দিকে তাকানোর সময় তোমাদের গুরুর নেই। স্ত্রীর বাচ্চা হবে বলেই তোমার গুরু এত ব্যস্ত আছেন।'
এ-কথা শুনে দৃঢ়োদ্যম খুব অবাক হল। পরক্ষণেই ভিন্নতমস চলে গেল। তার যাওয়ার পর তমোভেদের সত্যি সত্যি কন্যা হল। ভিন্নতমসের বাকি দুটো কথাও ফলে যেতে পারে ভাবল দৃঢ়োদ্যম। আর এইভাবে চিন্তা করতে করতে বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। দৃঢ়োদ্যম মনে মনে ভাবতে লাগল সে যদি সেখান থেকে পালিয়ে যায় তাহলে আর তাকে বিয়ে করতে হবে না। সে গুরুকে না বলে, ভিন্নতমসের সঙ্গে দেখা না করে, সিন্ধু নদীর তীর থেকে পালিয়ে নানা দেশ ঘুরতে লাগল। দশ বছর ঘুরে বেড়াল।
ঘুরতে ঘুরতে একবার গঙ্গা নদীর তীরে এসে এক ব্রাহ্মণ পল্লিতে ঢুকল। সেখানে এক বুড়িকে বলল দৃঢ়োদ্যম, 'মা কাশীর ভালো জল একটু আছে?'
ওই বুড়ি হেঁকে বলল, 'ও মা, তমালিকা একটা পিঁড়ি দিয়ে এক ঘটি কাশীর জল নিয়ে আয় তো মা।'
ভেতর থেকে কালো পোশাক পরে একটি ট্যারা চোখের মেয়ে এসে এক হাতে পিঁড়ি ও অন্য হাতে জল নিয়ে দাঁড়াল। পিঁড়ি পেতে 'বসুন' বলতে যাবে এমন সময় তার হাত থেকে ঘটিটা পড়ে গেল।
'কী করলি? জল ফেলে দিলি? যা আর এক ঘটি জল নিয়ে আয়।' বলল বৃদ্ধা।
দৃঢ়োদ্যম বসে বিশ্রাম করছিল এমন সময় বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, 'কোন দেশ থেকে আসছ বাবা? কোথায় যাবে?'
'কোন দেশ থেকে যে আসছি তা কী করে বলব? সব দেশই তো ঘোরা হল। এখন আর দেশে দেশে ঘোরাঘুরি ভালো লাগছে না। ভাবছি কোনো এক ব্রাহ্মণ পল্লিতে বাচ্চাদের পড়িয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব।' দৃঢ়োদ্যম বলল।
'তাহলে আর তুমি কোথাও যেয়ো না বাবা। এখানেই লেখাপড়া শিখিয়ে থেকে যাও। আমার হাতেই দু-জন আছে তাদের তুমি লেখাপড়া শেখাবে।' বৃদ্ধা বলল।

এক বছর পরে ভোর বেলায় তমালিকার ঘুম ভেঙে গেলে দৃঢ়োদ্যম জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা বৃদ্ধা তোমার কে হন? হঠাৎ আমার কাছে লেখাপড়া শেখাতে তোমাদের পাঠালেন কেন?'
তমালিকা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিজের কাহিনি শুরু করল, 'এই বুড়ির স্বামী খুব ধনী লোক। দানধর্ম করতেন। ওর একটি মেয়ে হল। মেয়েকে তিনি তার এক শিষ্যকে দিয়েছিলেন। ওই শিষ্য এই ভদ্রমহিলা এবং তার স্বামীকে বাবা-মার মতো দেখত। কিছুকাল পরে শ্যালকদের সঙ্গে বিরোধ হল। তখন ওই শিষ্য স্ত্রীকে নিয়ে সোজা সিন্ধুনদীর তীরে ব্রহ্মস্থলী নামক গ্রামে গিয়ে থাকতে লাগল। ওই শিষ্য চারটি বেদেই দক্ষ ছিল। কিছুকাল পরে ওই শিষ্যের একটি কুলত্যাগী কন্যা হল এবং পরে যমজ পুত্র হল। আমিই সেই কুলত্যাগী কন্যা। আর ওই ছেলেরা হল আমার ছোটো ভাই। আমার মা-বাবাকে আমরা চিনি না। ওদের মুখ আমাদের চোখের সামনে ভাসে না। সিন্ধু নদীর জলে আমরা হয়তো যেকোনো দিন ভেসে যেতাম। আমাদের ভাগ্য ভালো যে আমরা দিদিমার কাছে স্থান পেলাম।'
দৃঢ়োদ্যমের মনে হল যেন তার বুকে কেউ তির বিঁধে দিয়েছে। ভিন্নতমসের তিনটি কথার মধ্যে দুটো ফলে গেল। আর একটি কথা যাতে না ফলে যায় তারজন্য সে সোজা কাশীর পথ ধরল। সেখানে ফুলের মালা বিক্রি করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে ঠিক করল।
বারো বছর পরে কাশীতে পৌঁছানোর মুখে হঠাৎ এক কাপালিক উন্মত্তভাবে দৃঢ়োদ্যমের সামনে হাজির হয়ে দাপাদাপি করতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে তার পেছনে চিৎকার করছিল এক কাপালিনী। ইতিমধ্যে কাপালিনী দৃঢ়োদ্যমকে চিনতে পেরে তার পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করতে লাগল। ভিন্নতমসের কথা যাতে না ফলে যায় তার ভয়ে একদিন দৃঢ়োদ্যম তার বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচবে ভেবেছিল। বাঁচতে পারল না। এক বৃদ্ধার কাছে ছেলে পড়িয়ে কাটাতে হল। তারপর সেই ট্যারা মেয়েকে বিয়ে করতে হল। আর এখন যে কাপালিনীকে কাপালিকের সঙ্গে আসতে দেখেছে সেও ট্যারা। কে জানে কে এই কাপালিনী। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে বহু লোক জমে গেল।
তমালিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'তুমি যে এত বেদ অধ্যয়ন করলে, এত দেশে দেশে ঘুরলে তার ফলে কি এই জ্ঞান হল? তুমি আমাকে ছেড়ে হঠাৎ পালিয়ে গেলে কেন? তুমি আমাকে ছেড়ে পালিয়েছ বলেই আজ আমার এই অবস্থা? আমি পথে পথে এর ওর হাত ধরে ঘুরছি। আমাকে এভাবে পথে পথে ঘুরতে তুমিই বাধ্য করেছ। তুমি এত বড়ো পণ্ডিত হলে কী হবে, তুমি জানো না তোমার স্ত্রীর প্রতি কী কর্তব্য।' সব কথা বুঝে ওখানে যারা জমেছিল তারা তমালিকাকে জিজ্ঞেস করল, 'যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে এখন তুমি বল তুমি ওই কাপালিকের সঙ্গে থাকবে না নিজের স্বামীর কাছে ফিরে আসবে?' তমালিকা সেই মুহূর্তে স্বামীর কাছে ফিরেই আসতে চাইল।
তখন সেখানকার লোক দৃঢ়োদ্যমকে বলল, 'তমালিকার জীবনে যেটুকু পতন হয়েছে তারজন্য তুমিই দায়ী। যে প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত ছিল তার বিধান আমরা দেব। এখন তুমি তমালিকাকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ কর।'
দৃঢ়োদ্যম তাদের কথামতো তমালিকাকে গ্রহণ করল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, দৃঢ়োদ্যমের জীবনে বার বার যে পরিবর্তন দেখা দিল তার জন্য দায়ী কে? এই কি তার বিধির বিধান ছিল? সে কি সত্যিই ভিন্নতমসের ভবিষ্যদবাণী বিশ্বাস করেছিল? এবং ওই বিশ্বাসের ফলেই কি সে বার বার ঘোরাঘুরি করছিল? আমার এইসব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও জবাব না দিলে মাথা এই মুহূর্তে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বিক্রমাদিত্য প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'তিন্নতমসের ভবিষ্যদবাণী বিশ্বাস করেছিল বলেই দৃঢ়োদ্যম নিজেকে বাঁচিয়ে চলার জন্য পথে পথে ঘুরছিল। বিশ্বাস না করলে সে সেখানেই থাকত। ভিন্নতমসের ভবিষ্যদবাণী যদি বিধির বিধান হয়ে থাকে তবে সে বিধান হয়েছিল দৃঢ়োদ্যমের বিধান অনুসারে। একে অন্যকে অনুসরণ করেছিল। তমালিকাকে বিয়ে না করার উদ্দেশ্য সফল করতে হলে তার উচিত ছিল তমালিকার কাছাকাছি অঞ্চলেই থাকা। তমালিকার সম্পর্কে কোনো কিছু না জেনে তাকে বিয়ে করাও দৃঢ়োদ্যমের বোকামি হয়েছে। কারণ এক বছর পরে জেনে তাকে অতটা দুঃখ পেতে হত না। ওভাবে রাতারাতি পালাতে হত না। তার ফলে অত লোকের মধ্যে দৃঢ়োদ্যমকে তার স্ত্রী অপদস্থ করতে পেরেছিল এবং পরিশেষে তমালিকা যে কাপালিকের সঙ্গে না গিয়ে দৃঢ়োদ্যমের সঙ্গে থাকতে চাইল তা তার স্বামী ভক্তিই প্রমাণ করে।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ওই গাছে চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন