ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে এসে, গাছ থেকে শব নাবিয়ে কাধে ফেলে আগের মতাে নীরবে শ্মশানের দিকে এগােতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি সত্যি সত্যি প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী কাজ করতে বদ্ধপরিকর দেখছি। কারাে কাছ থেকে সাহায্য না নিয়ে তুমি নিজেই একাজ করতে এগিয়ে এলে। নীলদত্তও একা এগিয়েছিল। কিন্তু বাধা পেয়ে হতাশ হল। সে ভারি মজার কাহিনি। শােনাে তবে। শুনলে তােমার পথ চলার পরিশ্রমও কমে যাবে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে বিজয়পুরী নামক নগরে সােমনাথ নামে একজন নৌকা ব্যবসায়ী ছিল। সে বহু বিদেশিদের সঙ্গে ব্যাবসা করে কোটি কোটি টাকা করেছিল। তার ছিল নীলদত্ত নামে একটি মাত্র ছেলে। নীলদত্ত যখন কৈশাের পেরিয়ে যৌবনে পা দিল তখন তার বাবা নৌকা বােঝাই জাহাজ নিয়ে দূরদেশে যাত্রা করল। পথে প্রচণ্ড ঝড় তুফানের মুখে তার নৌকা পড়ে অতল জলে ডুবে গেল। ফলে লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিস নষ্ট হল এবং সােমনাথের কোনাে খোঁজ পাওয়া গেল না।
দু-বছর কেটে গেল। কিন্তু সােমনাথ আর ফেরেনি। ফলে সােমনাথের স্ত্রী স্বামীর প্রতীক্ষায় দিন গুনতে গুনতে কঠিন অসুখে পড়ে গেল। তারপর সে আর বেশি দিন বাঁচল না।
সােমনাথকে যারা ব্যাবসার ক্ষেত্রে সাহায্য করত এবং যারা তার কাছ থেকে সাহায্য নিত, তারা নীলদত্তকে ঠকিয়ে বহু টাকা মেরে দিল।
তখন নীলদত্ত যুবক। তাকে সহজেই অন্যান্য পেশায় পেয়ে বসেছিল। টাকাপয়সার হিসাব রাখার ভার সে কর্মচারীদের উপর দিয়ে দিয়েছিল। নীলদত্তের এই খেয়ালি ও অকর্মণ্যতার ফলে তার কর্মচারীরা তাকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে অল্পসময়ের মধ্যেই ফতুর করে দিয়েছিল।
ফলে দেখতে দেখতে নীলদত্তকে সব হারিয়ে পথে দাঁড়াতে হল। কোনাে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল না। সােমনাথের এক বন্ধু নীলদত্তকে থাকার আশ্রয় দিল। সােমনাথের সেই বন্ধুর নাম নবকুবের।
নবকুবেরের সঙ্গে সেই দেশের রাজার খুব ভালাে সম্পর্ক ছিল। সে যখন-তখন রাজার কাছে গিয়ে আলাপ-আলােচনা করতে পারত। একবার নবকুবের নীলদত্তকে। সঙ্গে করে রাজমহলে গেল। তখন রাজকুমারী লাবণ্যবতী নীলদকে আড়াল থেকে দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হল। রাজকুমারী মনে মনে ভাবল এহেন রূপবান যুবক যদি তার স্বামী হত তাহলে তার জীবন ধন্য হত।
পরে নীলদত্ত সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে রাজকুমারী তার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারল। নীলদত্ত অন্যের আশ্রয়ে আছে জেনেও তার প্রতি তার আকর্ষণ একরত্তি কমল না।
কিন্তু নবকুবেরের আশ্রয়ে থাকার ফলে নীলদত্তের নিজের উপর ঘৃণা জাগতে লাগল। সে ভাবল এভাবে যদি সে দিন কাটায় তাহলে তার জীবনে আর কোনাে পরিবর্তন দেখা দেবে না। নিজে নিজে যে ব্যাবসা করবে তার টাকাও জুটবে না। আবার অন্যের আশ্রয়ে থেকে ব্যাবসা করাও অনুচিত নানা কথা ভেবে একদিন নীলদত্ত নবকুবেরের খাজানা থেকে কিছু টাকা ও কিছু হিরে চুরি করে পালাল। সে ভেবেছিল হিরে চুরি করে অন্য কোথাও কিছু একটা করে জীবন কাটিয়ে দেবে। কিন্তু মানুষ যা ভাবে তার সঙ্গে যা ঘটে তার কতটুকুই বা মিল থাকে?
নীলদত্ত যা ভাবল তা হল না। সে নগররক্ষীর হাতে ধরা পড়ল। নগররক্ষককে সে কিছুতেই নিজের পরিচয় দিল না। এই না জানানাের ফলে নগররক্ষী বাকি রাতটা কারাগারে রেখে পরের দিন রাজদরবারে এনে রাজার সামনে তাকে হাজির করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল যে তার নাম নীলদত্ত এবং সে যা নিয়ে পালাচ্ছে তা নবকুবেরের। রাজা তাকে দেখেই চিনতে পেরেছিল। রাজা তাকে কঠোর শাস্তি দিত। কিন্তু নবকুবেরের অনুরােধে রাজা তাকে শাস্তি দিল না। ছেড়ে দিল। তবে তাকে সেই দেশে থাকার অনুমতি রাজা দিল না।
নবকুবের নীলদত্তের হাতে টাকা ও হিরের থলি দিয়ে বলল, 'বাবা, তুমি অন্য কোনাে দেশে কিছু একটা করে বাঁচার চেষ্টা কর।'
নীলদত্ত চুরি করেছে জেনেও রাজকুমারীর মনে ঘৃণা জাগল না। রাজা তাকে দেশ থেকে দূর করে দিচ্ছে জেনে সে খুব দুঃখ পেল।
নীলদত্ত বিজয়পুরী থেকে বেরিয়ে অবন্তীপুরে গেল। কী করবে কী না করবে ভাবতে ভাবতে কিছুদিন কেটে গেল। বসে বসে খরচ করে কাটানাের ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তার হাতখালি হয়ে গেল। কাজ না করে বসে কাটানাের ফলে একদিকে যেমন তার টাকাপয়সা খরচ হয়ে গেল অন্যদিকে তেমনি নানা কু-চিন্তা দানা বাঁধতে লাগল। দেখতে দেখতে সে চুরি করা শুরু করে দিল। অল্পদিনের মধ্যেই হাত পাকিয়ে সে একজন পাকা চোর হয়ে গেল।
চোর হওয়ার পর তার মনে বিচিত্র এক ইচ্ছা জাগল। দেশে ফেরার ইচ্ছে জাগল তার মনে। একদিন রাত্রে সে পাহারাদারদের চোখে ধুলাে দিয়ে বিজয়পুরীতে ঢুকল। সেখানে সে দিনের পর দিন গা-ঢাকা দিয়ে থেকে চুরি করতে লাগল। মন টানে মনের মানুষ। নীলদত্তের মনে রাজকুমারীকে দেখার ইচ্ছে জাগল। এ-ঘর ও-ঘর খুঁজে রাজকুমারীর ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় সে ধরা পড়ল প্রহরীর হাতে।
পরের দিন যথারীতি নীলদত্তকে হাজির করা হল রাজার কাছে। দেশের বাইরে থাকার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করার অপরাধে ও রাজমহলে চুরি করার উদ্দেশ্যে ঢােকার অপরাধে নীলদত্তকে আজীবন কারাভােগের শাস্তি দেওয়া হল। রাজা যদি জানত যে নীলদত্ত অনেকদিন আগেই তার রাজ্যে ঢুকে অনেকের বাড়িতে চুরি করেছে তাহলে তার ফাঁসি দিত।
গােপনে নীলদত্ত সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে রাজকুমারী লাবণ্যবতী একদিন গােপন পথে কারাগারে ঢুকে নীলদত্তের সঙ্গে দেখা করে তাকে বলল, ‘নীলদত্ত, আমি যেকোনাে ভাবে আপনাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারি। মুক্ত হয়ে আপনি কি দেশ ছেড়ে চলে যেতে প্রস্তুত আছেন?’
‘রাজকুমারী, কোথাও গিয়ে আমি কী করব? আমি তাে কোনাে কাজই পারি না। আমি তাে অক্ষম, কাজের অনুপযুক্ত। আমি কারাগারে এখন ভালােই আছি।' নীলদত্ত বলল।
রাজকুমারী কারাগারের অধিকারীকে ঘুষ দিয়ে যখন-তখন নীলদত্তের সঙ্গে দেখা করত। তার যখন যা দরকার হত দিত। এইভাবে ওদের দুজনের মধ্যে ঝুঁকি ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে দিনকে দিন ভালােবাসা গভীরতর হতে লাগল।
এক বছর কেটে গেল। এর মধ্যে অবন্তীপুরের রাজা রামসিংহের বড়াে রানি মারা গেল। রামসিংহ লাবণ্যবতীর সৌন্দর্যের কথা অনেক আগেই শুনেছিল। সে ঠিক করল লাবণ্যবতীকে বিয়ে করে বড়াে রানির সম্মান তাকে দেবে। তার দূত এসে বিজয়পুরীর রাজাকে বলল, 'মহারাজ, অবন্তীপুরের মহারাজ আপনার কন্যাকে বিবাহ করতে চান। আপনি বিয়ে দিতে রাজি না হলে উনি আপনার দেশ আক্রমণ করবেন।'

অবন্তীর রাজা ক্ষমতাবান ছিল। তাকে পরাজিত করার ক্ষমতা বিজয়পুরীর রাজার ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে বিজয়পুরীর রাজা নিজের কন্যা লাবণ্যবতীর সঙ্গে রাজা রামসিংহের বিয়েতে রাজি হলেন।
এই খবর কানে যেতেই লাবণ্যবতীর মনে হল যেন তার মাথায় বাজ পড়েছে। রামসিংহের মতাে বৃদ্ধ রাজার সঙ্গে বিয়ে করার চেয়ে তার কাছে মৃত্যু শ্রেয় মনে হল। সেই রাত্রে লাবণ্যবতী গােপনে কারাগারে নীলদত্তের সঙ্গে দেখা করে বলল সব কথা। তারপর তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে বলল, 'তাই ভাবছি, আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। চলুন আমরা দুজনে কোথাও পালাই। বলুন, আপনার কোনাে আপত্তি আছে?’
নীলদত্ত সেই রাত্রে রাজকুমারী লাবণ্যবতীকে নিয়ে অন্য দেশে পাড়ি দিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, রাজকুমারী লাবণ্যবতী এত ধনসম্পত্তি প্রাচুর্য, সুখ সব ছেড়ে কেন গেল নীলদত্তের সঙ্গে? সে কি জানত না যে নীলদত্ত বেকার যুবক ? কোনাে কাজের যােগ্যতা তার মধ্যে যে নেই তা কি সে জানত না? আর নীলদত্তও এর আগে পালানাের সুযােগ পেয়ে না পালিয়ে পরে পালাতে রাজি হল কেন? নীলদত্ত কি এক বারও ভেবেছে রাজকুমারীকে কোথায় রাখবে? কী খাওয়াবে? নাকি ভালােবাসা তাদের বিচারবুদ্ধি লােপ করে ফেলেছিল? আমার এসব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে এই মুহূর্তে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথায় বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘নীলদত্ত নিজেকে ঘােষণা করেছিল বটে অকর্মণ্য বলে তাই বলে রাজকুমারী তাকে ভুল বােঝেনি। সে সত্যি যদি অকর্মণ্য হত তাহলে দেশত্যাগের শাস্তি উপেক্ষা করে সে আবার দেশে ফিরে আসত না। দেশে ঢুকলেও রাজমহলে ঢুকত না। আর তার চুরি করার ইচ্ছে থাকলে খাজানা ঘরে গিয়ে ঢুকত। রাজকুমারীর ঘরে ঢুকতে যেত না। রাজকুমারী লাবণ্যবতীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের আশাতেই সে কারাজীবন কাটাতে চেয়েছিল। অপর পক্ষে রাজকুমারী ভালাে ভাবেই বুঝেছিল যে বৃদ্ধ রাজার স্ত্রী হওয়ার চেয়ে যুবক নীলদত্তের হাত ধরে পাড়ি দেওয়া অনেক আনন্দের। জীবনের দুঃখদুর্দশা অনাহার সম্পর্কে রাজকুমারীর কোনাে অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই সে-বিষয়ে তার আতঙ্কেরও কোনাে কারণ ছিল না। বাকি থাকে ভরণ-পােষণের প্রশ্ন। নীলদত্ত চুরি করে কোনােদিন ধরা পড়েনি। অতএব সে যেকোনাে দেশে চুরি করতে পারবে।
বিক্রমাদিত্যের এভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে সেই গাছে গিয়ে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন