ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে গেলেন। গাছ থেকে শব নাবিয়ে যাথারীতি মৌনভাবে শব কাধে ফেলে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, দেবতাদের নিন্দা করার ফলে অনেক সময় নানা রকমের বিপদ ঘটে যায়। তােমার কাজ দেখে সন্দেহ জাগছে, তুমিও দেবতাদের বিরুদ্ধে কিছু করছ কি না। দেবতাদের বিরুদ্ধে যৌধেয় শৃঙ্গ গিয়েছিল। ফলে তাকে অনেক দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে। আমি এখন তােমাকে তার কাহিনি শােনাচ্ছি। শুনলে তােমার ভালােই লাগবে। এত রাত্রে তুমি যে পরিশ্রম করছ তা কিছুটা লাঘব হতে পারে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে সিন্ধু প্রদেশের বহুপ্রান্তে নানা জাতের বনবাসীরা বাস করত। তারা বনেই থাকত। বনের জীবজন্তু শিকার করাই তাদের একমাত্র কাজ ছিল। ওদের মধ্যে একজনের নাম ছিল শৃঙ্গ। তার শক্তি সাহস ও শিকার করার কৌশলের ফলে সে কিছুদিনের মধ্যেই একটি দুর্গ তৈরি করে নিতে পারল। কৈশাের অবস্থা থেকেই সে শিকারের ব্যাপারে অন্যদের নেতৃত্ব দিত। এভাবে যৌধেয় জাতির লােক তাকে একদিন তাদের নেতা হিসাবে ঘােষণা করল। নেতা হয়ে শৃঙ্গের ইচ্ছে করল গােটা জাতির উন্নতি সাধনের। সে তার সমগ্র যৌধেয় জাতির উন্নতির জন্য সমস্ত রকমের কষ্ট স্বীকার করে রাতদিন পরিশ্রম করতে লাগল।
যৌধেয়দের বাসস্থানের পাশে মায়াব নামক আর এক জাতের লােক বাস করত। ওরা জাদুর সাহায্যে নানাদিক থেকে নানাভাবে অনেক ধনসম্পত্তি জমিয়েছিল। ওরা জাদু বলে এমনকী ঘরবাড়িও বানাতে পারত। তবু, ওদের একটা অভাব ছিল। তা হল ওদের শক্তি। ওরা নিজেদের মতাে করে দুর্গ বানিয়ে তাতে নিশ্চিন্তে বাস করতে লাগল। বাইরের কোনাে শত্রুকে আক্রমণ করার মতাে শক্তি তাদের ছিল না। আক্রমণ করার শক্তি না থাকলেও আত্মরক্ষা করার শক্তি না থাকলে কোনাে দুর্গই বেশিদিন রক্ষা করা যায় না।
আক্রমণ না করলে নিজেদের কবলিত অঞ্চল বাড়ানাে যায় না। তাই আক্রমণ করার মতাে বাহিনী গঠনের দিকে প্রথম নজর দিতে হল শৃঙ্গকে।
শৃঙ্গ নিজের জাতের লােককে ভালােভাবে যুদ্ধকৌশল শিখিয়ে মায়াব লােকের দুর্গের উপর আক্রমণ করল। মায়াবরা জাদুর সাহায্যে শৃঙ্গকে রােখার চেষ্টা করল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হল। শৃঙ্গ ওদের দুর্গ দখল করে নিল। মায়াব জাতির বিভিন্ন শিল্পীদের দিয়ে মনের মতাে দুর্গ ও একটি নগর তৈরি করে নিল শৃঙ্গ। ওই লুণ্ঠিত জিনিস দিয়ে সেই নগর সাজাল।
যারা বনে বাস করত, সেই যৌধেয় জাতের মানুষ নগরে বাস করার সুযােগ পেল শৃঙ্গের জন্য। নগরে বাস করতে করতে ওরা নানা ধরনের পেশা শিখে নিল। চাষ-আবাদ থেকে ব্যাবসাবাণিজ্য পর্যন্ত সব কিছুই যৌধেয় লােকের শেখা হয়ে গেল।
শৃঙ্গকে ওরা রাজা করে নিল।
কিন্তু শৃঙ্গ লক্ষ করল তার জাতের লােক অনেক দূর এগিয়ে গেলেও তারা অনেকগুলাে কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস নিয়েই আছে। কুসংস্কারের হাত থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য শৃঙ্গ ভাবতে লাগল। শেষে একটি পরিকল্পনা কার্যকরী করার জন্য যৌধেয় জাতের প্রত্যেককে একদিন মাঠে জমায়েত হতে বলল। যৌধেয় জাতের লােক শৃঙ্গকে দেবতার মতাে ভক্তি করত। তাই তার আদেশ পাওয়া মাত্র ওরা বিরাট এক মাঠে হাজির হল। সেই মাঠের সামনে ছিল রাজমহল, পিছনে ছিল পাহাড়।
শৃঙ্গ তার রাজমহলের উপরে উঠে তার প্রজাদের দেখল। তাকে দেখেতে পেয়ে প্রজারা তার জয়ধ্বনি করল। শৃঙ্গ তাদের উদ্দেশে বলল, 'আমি তােমাদের প্রথমেই একটি প্রশ্ন করতে চাই। তােমরা যখন বনে থাকতে যেরকম ছিলে, যতটা কষ্ট সহ্য করেছিলে তার চেয়ে এখন অনেক ভালাে আছ কি না? তােমাদের কষ্ট অনেক কমে গেছে কি না? এখন তােমরা বল এর কারণ কী? এর আগে যদি না ভেবে থাক তবে এখন ভেবে বল।'
‘সবই ভগবানের দয়া।' প্রজারা একবাক্যে বলল।
ওদের কথা শুনে শৃঙ্গের বিরক্তি জাগল। সে প্রজাদের বলল, 'এতে ভগবানের দয়ার কী আছে? তােমরা পরিশ্রম করে যুদ্ধকৌশল শিখলে, দুর্গ দখল করলে, নগর গড়ে তুললে, চাষ-আবাদ করছ, ব্যাবসাবাণিজ্য করছ, আর বলছ কিনা ভগবানের দয়া!’
পরক্ষণেই সমস্ত আকাশ কালাে মেঘে ঢেকে গেল। ভয়ংকর ঝড় উঠল।
ভূমিকম্প হল। রাজমহলের পাহাড়ের চূড়া থেকে লাভা বেরুল। জমির ভিতর থেকে হাজার হাজার সাপ বেরুল। চাষ-আবাদ সব আশা মাটিতে মিশে গেল। ফলে বহু প্রজা মারা গেল। এমনকী শৃঙ্গের পােশাকের রং-ও বদলে গেল।
প্রজারা খুব ভয় পেয়ে যে যেদিকে পারল পালাল। তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেল না। কারণ ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি সব ভেঙে পড়েছিল।
যৌধেয় জাতির যে গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা শৃঙ্গের উপর ছিল তা চোখের পলকে উবে গেল। ওদের দৃঢ়বদ্ধ ধারণা হল শৃঙ্গ ভগবানকে নিন্দে করেছে। বলেই এসব হয়েছে।
প্রজাদের এই মনােভাবের কথা উত্তরাঞ্চলের রাজা রাবল জানতে পেরে সেনাবাহিনী নিয়ে শৃঙ্গের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করল।
শৃঙ্গ প্রজাদের উত্তেজিত করে রাবল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করানাের অনেক রকমের চেষ্টা করল।
কিন্তু প্রজাদের মন ভেঙে গিয়েছিল, শৃঙ্গের উপর আস্থা ছিল না। ফলে তারা যুদ্ধ করতে এগােল না। তখন নিরুপায় হয়ে শৃঙ্গ রাবল রাজার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য গােপন পথে পালিয়ে গেল। মায়াব, যবন ও অন্য বনবাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে বাধ্য হয়েছিল পুব দিকের পথ ধরে পালাতে।
অনেক কষ্টে সে রেগিস্তান পার হয়েছিল। কুড়ি দিন কষ্ট করে ইন্দ্রপ্রস্থ নামক রাজ্যে শৃঙ্গ পৌঁছাল।
শৃঙ্গ ইন্দ্রপ্রস্থের একটি উদ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখল। সেইসময় রাজকুমারী কেশিনি উদ্যানে বেড়াচ্ছিল। শৃঙ্গ উদ্যানের ভিতরে ঢােকার চেষ্টা করে বাধা পেল। পাহারায় যে ছিল সে তাকে বাধা দিল।
তখন উদ্যানের বাইরে একটি গাছের নীচে সে শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে রাজকুমারীর পরিচারিকা উদ্যানের বাইরে এসে শৃঙ্গের চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে ছুটে গিয়ে রাজকুমারীকে জানাল। রাজকুমারী কেশিনি ওই যুবককে ডেকে পাঠিয়ে তার ক্লান্ত দেহ দেখে তাকে কিছু ফল খেতে দিল। ওইটুকু সময়ের মধ্যে কেশিনি বুঝতে পারল যে ওই যুবক সাধারণ যুবক নয়। তাই তাকে সহানুভূতির সঙ্গে প্রশ্ন করল, আপনি কে? কোত্থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?’
কেশিনি ছিল অপূর্ব সুন্দরী। প্রথম দর্শনেই শৃঙ্গ তার রূপে মুগ্ধ হল। শৃঙ্গ থেমে থেমে গম্ভীর গলায় বলল, 'এখন আমার আর কোনাে পরিচয় নেই। তবে একসময় পরিচয় ছিল।'
কেশিনি ওই যুবককে রাজমহলে নিয়ে গিয়ে রাজার কাছে তার ইচ্ছা প্রকাশ করল।

কেশিনি তখন শৃঙ্গের দিকে ঘুরে তাকে বলল, 'আপনাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে আপনি রাজকুমার। আপনি আপনার সত্য পরিচয় দিলে আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হতে পারে। বাবার মত পাব।'
শৃঙ্গ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'আমি এখন অসহায়। আমার ভাগ্য এখন বিড়ম্বিত। এই অবস্থায় আমি আমার পরিচয় কী করে দিতে পারি!' বলে শৃঙ্গ নিজের সমস্ত কাহিনি বলল। কেশিনি যখন জানতে পারল যে ওই যুবকই যৌধের শৃঙ্গ তখন তার খুব আনন্দ হল। কারণ এই ঘটনার কয়েক দিন আগেই সে শৃঙ্গের নাম শুনেছিল। তার বীরত্বের কাহিনিও শুনেছিল। তাই কেশিনি শৃঙ্গকে বলল, 'আপনার দুশ্চিন্তার কোনাে কারণ নেই। আমাকে বিয়ে করার পর আপনি এই ইন্দ্রপ্রস্থ রাজ্য পাবেন। যে রাজ্য হারিয়েছেন তার জন্য দুঃখ করার আর কোনাে প্রয়ােজন নেই। আমাদের বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার দুর্ভাগ্যের দিনও শেষ হয়ে গেছে ধরে নেবেন।' তারপর কেশিনি বাবার অনুমতি চাইল।
সব কথা শুনে রাজা ঠিক করতে পারল না কী করবে। তখন রাজা মন্ত্রীদের নিয়ে মন্ত্রণা কক্ষে গেল। রাজকুমারী কেশিনি ওদের মন্ত্রণা কক্ষে যেতে দেখে তাড়াতাড়ি সে নিজেও ওই কক্ষে ঢুকে পর্দার আড়ালে দাঁড়াল। ওদের সমস্ত কথাবার্তা শুনল।
শুরুতে রাজা শৃঙ্গের সমস্ত কাহিনি শুনিয়ে মন্ত্রীদের বলল, ‘শৃঙ্গ এখন আমাদের অতিথি সে কথা আমরা যেন ভুলে না যাই।'
তৎক্ষণাৎ একজন মন্ত্রী বলল, 'মহারাজ, রাবল এক শক্তিশালী রাজা। এই সুযােগে আমরা যদি শৃঙ্গকে বন্দি করি, রাবল রাজার হাতে তাকে তুলে দি তাহলে রাবল রাজার সঙ্গে আমাদের মৈত্রী অনন্তকাল ধরে অটুট থাকবে।'
‘অতিথিকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত অন্যায়। নীতি বিরুদ্ধ কাজ। রাবল রাজা যদি ইতিমধ্যে টের পেয়ে থাকে যে, শৃঙ্গ আমাদের অতিথি হয়ে আছে তাহলে ওই রাজা আমাদের উপর আক্রমণ করবে।' অন্য এক মন্ত্রী বলল।
এইসব কথা শুনে আর এক মন্ত্রী বলল, 'মহারাজ, রাজকুমারীর ইচ্ছাপূরণের মাত্র একটি উপায় আছে। এই সুযােগে আমরাও তাে প্রতিবেশী রাজ্যদের সাহায্য নিয়ে রাবল রাজাকে আক্রমণ করতে পারি। ওর উপর বহু রাজা চটে আছে। রাবল প্রত্যেক রাজার সঙ্গে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করে। এর ফলে শৃঙ্গও নিজের বদলা নিতে পারবে। আর রাজকুমারীর ইচ্ছাও পূরণ হবে।'
এই প্রস্তাব উপস্থিত সকলের কাছে ভালাে লাগে। বহু ছােটো ছােটো দেশের রাজা রাবলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি হল। রাবলের বিরুদ্ধে বিরাট এক সেনাবাহিনী গঠিত হল। শৃঙ্গ ওই বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে যােগদান করল। যুদ্ধক্ষেত্রে রাবলের বিরুদ্ধে স্বয়ং শৃঙ্গ এগিয়ে এল। রাবলকে শৃঙ্গ বধ করল।
তারপর শৃঙ্গ নিজের জাতির লােককে খোঁজ করে জানতে পারল যে ওদের অনেকে বনে ফিরে গেছে। আর বাকি লােকগুলাে যবন মায়াবদের গােলাম হয়ে গেছে।
শৃঙ্গ নিজের জাতের সবাইকে আবার জড় করে নিজের হারানাে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কেশিনিকে বিয়ে করে। বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, দেবতারা যখন শৃঙ্গের উপর চটে গেল, তখন আবার তারা রাজ্য পাইয়ে দিলেন কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘শৃঙ্গ যে দেবতাদের বিশ্বাস করে না এই ভুল ধারণা ছিল তার জাতির লােকের। অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ছিল বলেই শৃঙ্গকে ওরা ভুল বুঝেছিল। স্বাভাবিক কারণে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হল, তারজন্য ওরা শৃঙ্গই অপরাধী ভেবেছিল। আবার যখন শৃঙ্গ রাজ্য ফিরে পেল, তখন ওরা ভাবল যে ভগবান আর তার উপর চটে নেই।'
এইভাবে রাজা বিক্রমাদিত্য মৌনভাব ভঙ্গ করার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন