পরিশ্রমের ফল

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে গাছের উপর উঠে সেখান থেকে শব নিয়ে গাছ থেকে নেমে সােজা শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, তুমি এত পরিশ্রম করছ যে বলার নয়। কিন্তু হয়তাে জানাে না, এই জগতে পরিশ্রম করে একজন তার ফল ভােগ করে অন্য জন। এই প্রসঙ্গে তােমাকে একটি কাহিনি বলছি, শােন। এতে তােমার পরিশ্রম লাঘব হতে পারে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে এক দেশে এক রাজা ছিলেন। বহু বছর পরে তার একটি মেয়ে হল। রাজার একমাত্র মেয়ে আদরে লালিতপালিত হল। সবরকমের শিক্ষা যাতে তার হয় সে-বিষয়ে রাজার চেষ্টার অন্ত ছিল না। রাজকন্যা যথাসময়ে বড়াে হলে রাজার মনে তার বিয়ের চিন্তা ঢুকল।

রাজা তার মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্রের খোঁজ করতে শুরু করবেন এমন সময় রাজকুমারীর এক বিচিত্র রােগ ধরল। খেত না, ঘুমােত না। সবসময় বিড়বিড় করে কী যে বকত তা সে নিজেই জানে না। কত বৈদ্য এল কত ওষুধ দেওয়া হল কিন্তু রাজকুমারীর রােগ সারল না। রাজার অশান্তি দিনের পর দিন বেড়ে যেতে লাগল। তারও ঘুম খাওয়া ডকে উঠল।

কিছুতেই যখন রাজকুমারীকে সারানাে গেল না তখন রাজা নিজের দেশে এবং অন্য দেশে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করল। যে তার মেয়ের রােগ সারিয়ে দেবে সে রাজকুমারীকে বিয়ে করতে পারবে এবং তার পরে ওই দেশের রাজা হতে পারবে।

এই ঘােষণা শুনে দেশ-বিদেশ থেকে কত বৈদ্য এল কিন্তু কেউ রাজকুমারীর রােগ ধরতেই পারল না, সারানাে তাে দূরের কথা।

এমন সময়ে দেশের শেষ প্রান্তের এক মন্দিরে এক সন্ন্যাসী এসে আস্তানা গাড়ল। ওই সন্ন্যাসী দেশের বিভিন্ন লােকের নানান ধরনের রােগ সারাতে লাগল। এই কথা খুব তাড়াতাড়ি রাজার কানে গেল। রাজা জানতে পারল যে ওই সন্ন্যাসী ওই মন্দির ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চায় না। তাকে অন্য কোনাে জায়গায় কেউ নিয়ে যেতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে রাজা সপরিবারে ওই সন্ন্যাসীর কাছে গেল।

সন্ন্যাসী রাজকুমারীকে দেখে বলল যে তার কোনাে অসুখ নেই। শুধু এক ব্রহ্মরাক্ষসী তাকে জ্বালাচ্ছে। সেই তার উপর ভর করে রাজকুমারীকে দিনের পর দিন কষ্ট দিচ্ছে এবং ভীষণ ভােগাচ্ছে।

‘ওই ব্রহ্মরাক্ষসীর হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায় কী?’ রাজা সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞেস করল।

‘মহারাজ, কাল থেকে আপনার মেয়ের হাত দিয়ে ব্রাহ্মণদের দানধর্ম করান। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ব্রাহ্মণরা যা চাইবে তাই মেয়ের হাত দিয়ে দান করুন। সে যে ব্রাহ্মণকে দান করতে রাজি হবে না সেই ব্রহ্মরাক্ষসীকে তাড়াতে পারবে।' সন্ন্যাসী বুঝিয়ে বলল।

রাজা তার পরের দিন মেয়ের হাত দিয়ে দানধর্ম আরম্ভ করালেন। কাতারে কাতারে ব্রাহ্মণ আসতে লাগল। রাজকুমারী কোনাে ব্রাহ্মণকেই দান করতে গররাজি হল না। প্রত্যেক ব্রাহ্মণ অনেক দান নিয়ে ফিরতে লাগল।

এ ভাবে এক বছর কেটে গেল। একদিন এক ব্রাহ্মণ দান নেবার আশায়। এল। তাকে অনেক দূর থেকে দেখতে পেয়েই রাজকুমারী চিৎকার করে বলল ‘ওকে যেতে বল, ওকে আমি দেব না। যেতে বল।' বলতে বলতে রাজকুমারী অন্দরমহলে চলে গেল।

রাজা ওই ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ব্রাহ্মণ, আপনি কি মন্ত্র জানেন? আমার মেয়েকে এক ব্রহ্মরাক্ষসী বহু বছর ধরে জ্বালাচ্ছে। আপনি কি তাকে ছাড়াতে পারেন?’

ওই ব্রাহ্মণ রাজকুমারীর ঘাড় থেকে ব্রহ্মরাক্ষসীকে নাবাল। রাজকুমারী সেরে উঠল। রাজা ভাবল ওই ব্রাহ্মণের সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে দেবে। ঠিক সেইসময় ওই সন্ন্যাসী এসে রাজাকে বলল, ‘রাজা, আপনার মেয়ের সঙ্গে আমারই বিয়ে দেওয়া উচিত। ন্যায় বিচারে আপনার পরে আমারই এই দেশের রাজা হওয়া উচিত।'

রাজা ওই সন্ন্যাসীর সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে দিল এবং ওই ব্রাহ্মণকে হাজার মুদ্রা দিয়ে বিদেয় করল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, ওই রাজা এত বড়াে অন্যায় কাজ করল কেন? ঘােষণা মতাে কাজ করল না কেন? ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে না দিয়ে ওই সন্ন্যাসীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিল কেন? রাজা কি সন্ন্যাসী অভিশাপ দিতে পারে ভাবল? সন্ন্যাসীকে জামাই বানাতে রাজার ভালাে লাগল ? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বেতালের কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘ঘােষণা অনুযায়ী রাজা ব্রাহ্মণের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দিত। কিন্তু সন্ন্যাসী এসে তার ভুল ভেঙে দিল। ঘােষণার মর্মার্থ রাজা বুঝতে পারল। রাজকুমারীর ঘাড় থেকে যে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মরাক্ষসীকে নাবাল সে কিন্তু রাজকুমারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে আসেনি। দান নিতে এসেছিল। কিন্তু সন্ন্যাসীর ব্যাপার আলাদা। সেই জানিয়েছিল কীভাবে কী করলে রাজকুমারী সেরে উঠবে। টানা একবছর ধরে রাজকুমারীকে বিয়ে করার আশায় অপেক্ষা করেছিল সন্ন্যাসী। এবং ঠিক সময়ে হাজির হয়ে রাজাকে নিজের মত জানাল। রাজা বুঝল যে রাজকুমারীর রােগ সেরে ওঠার ক্ষেত্রে সন্ন্যাসীরই অবদান বেশি আছে। ব্রাহ্মণ নিমিত্ত মাত্র।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে গায়েব হয়ে আবার সেই গাছে উঠে পড়ল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%