প্রদর্শনী

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে এলেন।

গাছ থেকে মড়া নামিয়ে কাঁধে ফেলে শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন তিনি।

শবেস্থিত বেতাল বলল, 'মহারাজ, কী পরিশ্রম না করছ! তুমি যে এ কাজের ভার কাকে দিয়ে যাবে ভেবে পাচ্ছি না। প্রাচীনকালে মহারাজ চতুরসেন হাজার খুঁজেও নিজের জন্য একজন অঙ্গরক্ষক পেল না। তার কাহিনি বলছি, শুনলে এই মাঝরাতে তুমি যে পরিশ্রম করছ তা লাঘব হবে।'

বেতাল শুরু করল :

সেকালে মহারাজা চতুরসেন চতুরঙ্গপুরে শাসন করত। তার আনন্দ নামে এক অঙ্গরক্ষক ছিল। সে রাজাকে বহু বার নানাবিধ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

হাজার চোখে যেন সে রাজাকে পাহারা দিত। একবার আনন্দের কঠিন অসুখ করার ফলে তার হাত খসে পড়ল। বহু বদ্যি চেষ্টা করেও তাকে সারাতে পারেনি। সারাজীবন তাকে হাত হারিয়ে কাটাতে হয়েছে।

একদিন আনন্দ রাজাকে বলল, 'মহারাজ যতদিন আমি আপনার পাশে ছিলাম ততদিন আমি আমার জীবন দিয়ে আপনাকে রক্ষা করেছিলাম। কিন্তু এখন যতদিন না আপনার জন্য একজন উপযুক্ত অঙ্গরক্ষকের সন্ধান পাচ্ছি ততদিন আমি শান্তি পাব না।'

চতুরসেন আনন্দের রাজভক্তি যে কত বেশি তা জানত।

আর আনন্দের মতাে একজন অঙ্গরক্ষক রাজার না থাকলে চলে না।

সুধন্যকে ডেকে পাঠানাে হল। সুধন্য ধনুর্বিদ্যার নানা কৌশল রাজাকে দেখাল। তার আগে সে রাজাকে সবিনয়ে বলল, 'মহারাজ, আমার বয়স বেড়েছে, হয়তাে আমার কলাকৌশল আপনার ততটা ভালাে লাগবে না।' তারপর সে দেখাল নানান ধরনের মজার খেলা।

ওই খেলা দেখে রাজসভার প্রত্যেকে স্তব্ধ হয়ে গেল।

হঠাৎ একসময় সুধন্য বলল, 'যেকোনাে একজন মাথায় ফল রেখে এখান থেকে এক-শাে গজ দূরে দাঁড়ান, আমি সেই ফল ফেলে দেব। যারা ভীরু, যাদের প্রাণের ভয় আছে তারা এখানে আসবেন না। কই এবার কার সাহস আছে এগিয়ে আসুন।'

সুধন্যের ক্ষমতা সম্পর্কে উপস্থিত লােকের ধারণা ছিল।

তাই দশ বারাে জন যুবক এগিয়ে এল। তখন সুধন্য বলল, 'আমি বুঝলাম যে এই দশ বারাে জনের আমার ক্ষমতার উপর বিশ্বাস আছে। তবে তােমরা হয়তাে কোনােদিন দেখনি আমার তির ছােড়া। হয়তাে লােকমুখে শুনেছ। আমারও অনেক দিন অভ্যেস নেই। তবু দু-একবার অন্য কিছু লক্ষ্যভেদ করে তারপর মাথার ফল ফেলব।'

সুধন্যের চাহিদা অনুসারে রাজা একটি থালা ও একটি সােনার কৌটো এবং একটি রুপাের কৌটো আনিয়ে তাকে দিলেন।

সুধন্য অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ওই থালে রাখা কৌটোগুলাের দিকে দেখিয়ে বলল, 'আমি রুপাের কৌটোর ঢাকনা ফেলে দেবার চেষ্টা করব।'

পরমুহূর্তেই সুধন্যের হাত থেকে তির ছুটে বেরিয়ে গেল। সােনার কৌটোর ঢাকনা ছিটকে বেরিয়ে গেল দূরে। সুধন্যের মুখ ঝুলে গেল। দর্শক সবাই সুধন্যর এই ব্যর্থতায় অবাক হয়ে গেল।

তারপর সুধন্য আর একবার চেষ্টা করল।

দুটো হাঁড়ি আনাল।

তির সােজা গিয়ে জলের হাঁড়ি ফুটো করল।

পরক্ষণেই সুধন্য বলল, 'এখন আমি ওই ফুটো বন্ধ করে দিচ্ছি।' বলে একটি তির ছুড়ল।

তির গিয়ে ফুটোর মুখ বন্ধ করে দিল।

তখন সুধন্য যুবকদের বলল, তােমরা লক্ষ করেছ আমার মন একটু অশান্ত।

আমি ঠিক লক্ষ্যভেদ করতে পারছি না। এখন তােমরা আবার ভেবে বল তােমাদের মধ্যে কে মাথায় ফল নিয়ে আমার সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুত আছ।'

এ-কথা শুনে মাত্র একজন যুবক এগিয়ে এসে বলল, 'আমি প্রস্তুত আছি।'

ওই সময় আনন্দ রাজার কাছে গিয়ে কানে কানে বলল, 'মহারাজ, একেই আপনার অঙ্গরক্ষক হিসেবে নির্বাচন করতে যাচ্ছি।'

তারপর যুবক মাথায় একটি ফল রেখে দাঁড়ানাের জন্য দূরে গেল সেখানে মাথায় ফল রেখে প্রস্তুত হল।

সুধন্য ধনুকে তির জুড়ে দাঁড়ানাের পরেও ওই যুবকের চোখে-মুখে ভয়ের কোনাে চিহ্ন ছিল না। দর্শকদের মধ্যে প্রচণ্ড ভয়ের সঞ্চার হল।

সুধন্য যুবকের কাছ থেকে এক-শাে গজ দূরে দাঁড়িয়ে তির ছুড়ল।

মুহূর্তে যুবকের মাথার উপর থেকে ফল উড়ে গেল।

যুবক একটুও বিচলিত হয়নি। সঙ্গেসঙ্গে মহারাজ আসন থেকে উঠে যুবককে অভিনন্দন জানিয়ে তাকে নিজের অঙ্গরক্ষক করে নিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, আমার মনে একটা সন্দেহ জেগেছে। রাজার জন্য দরকার ছিল একজন অঙ্গরক্ষক।'

'তাহলে আনন্দ ধনুর্বিদ্যা প্রদর্শনের আয়ােজন রাজাকে করাল কেন? রাজাই বা তাতে রাজি হল কেন? সুধন্য যখন জানত যে সে লক্ষ্যভেদ করতে পারছে না তখন সে কেন ওই প্রদর্শনের নামে যুবকদের বিব্রত করল?’

‘সবাই যখন পেছিয়ে গেল তখন একজন যুবকই-বা এগিয়ে এল কোন ভরসায়?’

‘আনন্দই বা রাজাকে পরামর্শ দিল কেন ওই যুবককে অঙ্গরক্ষক হিসেবে নিয়ােগ করতে?’

‘আমার এইসব প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না বল তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এ-কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘অঙ্গরক্ষকের নির্বাচন বা পরীক্ষা করে নিয়ােগের ব্যাপারে রাজার যত না চিন্তা ছিল তার চেয়েও বহুগুণ বেশি চিন্তা ছিল আনন্দের।'

‘আনন্দের কথামতােই রাজা ধনুর্বিদ্যা প্রদর্শনের আয়ােজন করলেন।'

'কারণ আনন্দের প্রত্যেকটি কথা রাজা রাখতেন। সুধন্যের লক্ষ্যভ্রষ্টের মূলে ছিল সাহসী যুবক নির্বাচনের চেষ্টা। সুধন্য ভালােভাবেই জানত যে তার তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার নয়।'

‘এবং তা জানত বলেই প্রদর্শনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল ।'

‘যুবকদের মধ্যে যারা ছিল ভীরু যাদের বুদ্ধি ছিল কম, তারাই পেছিয়ে গেল।'

‘সুধন্যের প্রস্তাবে রাজি হয়ে নির্ভয়ে যে যুবক এগিয়ে গেল একমাত্র সেই যুবকই বুঝতে পেরেছিল যে সুধন্যের লক্ষ্য অভ্রান্ত। এবং বুঝেছিল বলেই সে সাহস করে এগিয়ে এসেছিল। গােটা ব্যাপারটাই ছিল আনন্দের পূর্ব পরিকল্পিত। আনন্দ তার দুরাত্মীয়কে দিয়ে এই কাজ করিয়েছিল বলেই পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে রাজাকে পরামর্শ দিয়েছিল।

আর তার পরামর্শ অনুসারেই ওই যুবককে রাজা নিজের অঙ্গরক্ষক হিসেবে নিয়ােগ করলেন।'

রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ করার সাথে সাথে বেতাল শব থেকে বেরিয়ে আবার গিয়ে বৃক্ষলগ্ন হল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%