ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে গেলেন সেই বৃক্ষের কাছে। সেখান থেকে শব নাবিয়ে কঁাধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, ‘রাজা তুমি কাউকে কথা দিয়ে বসে আছ কি না জানি না। আমি এও জানি না যে পাছে কথা রাখতে পারবে না সেই ভয়ে তুমি এই গভীর রাতে পরিশ্রম করছ কিনা। তবে একটা কথা জেনে রেখাে, যখন কোনােক্রমেই কথা রাখতে পারবে না তখন কথা না রাখলেও পার। বীরসিংহের মতাে রাজাও কথা দিয়েছিল কিন্তু নিরুপায় হয়ে কথা সে রাখতে পারেনি। আচ্ছা, তােমাকে শােনাচ্ছি সেই কাহিনি। এতে তােমার পরিশ্রম কমবে, ভালােও লাগবে।'
বেতাল বীরসিংহের কাহিনি শুরু করল : বীরসিংহ যখন যুবরাজ ছিল তখন সে যখন-তখন শিকার করতে বনে যেত। সে ছিল খুব সাহসী। একদিন শিকার করতে করতে ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে জল খেতে একটা পুকুরের কাছে গিয়ে দেখল এক বনবাসী যুবতীকে স্নান করতে। সেই রূপলাবণ্যময়ী যুবতীকে দেখে রাজার চোখের পলক পড়ল না। সে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। বীরসিংহ সেই যুবতীর কাছে গিয়ে বলল, 'তুমি এত সুন্দরী যে তােমাকে এই বনে-বাদাড়ে রাখা কোনােক্রমেই উচিত নয়। তুমি চল আমার সঙ্গে। আমাকে বিয়ে করে জগতের সমস্ত রকমের সুখ আনন্দ ভােগ কর।'
‘আমার গর্ভের সন্তানকে যদি আপনি রাজা করে সিংহাসনে বসান তবে আমি বিয়ে করব।' যুবতী বলল। বীরসিংহ তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তাকে বিয়ে করে সুখে জীবনযাপন করতে লাগল।

দ্বিতীয় বনবাসী যুবতীও প্রথম যুবতীর মতাে শর্ত রাখল। তার গর্ভজাত সন্তান রাজা হওয়ার অধিকার পেলে সে বিয়ে করবে। বীরসিংহ এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাকেও বিয়ে করে নিয়ে গেল রাজমহলে।
আবার কয়েক মাস পরে বীরসিংহ শিকার করে ফেরার পথে ওই পুকুরের কাছে জল পান করতে এসে যা দেখল তাতে তার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে গেল। এমন এক পরমাসুন্দরী যে ওই ধরনের বনে থাকতে পারে তা সে কোনােদিন কল্পনাও করতে পারেনি। বীরসিংহ তাকেও বিয়ে করতে চাইল। তৃতীয় যুবতীও প্রথম ও দ্বিতীয় যুবতীর মতাে শর্ত রাখল বীরসিংহের কাছে। বীরসিংহ সেই অপরূপা যুবতীর প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল। এভাবে বীরসিংহ পর পর তিন জন বনবাসী যুবতীকে একই রকমের কথা দিয়ে, একই ধরনের শর্তে রাজি হয়ে বিয়ে করেছিল। যাই হােক, বীরসিংহ তৃতীয় যুবতীকে বিয়ে করে রাজমহলে ঢুকল।
কিছুদিন পরে আবার বীরসিংহ শিকারে গেল। শিকার সেরে সেই পুকুরের ধারে জল খেতে এসে তার নজরে পড়ল এক বনবাসী যুবতী। তবে আগের যুবতীদের মতাে তার রূপ নেই। সাধারণ এক যুবতী।
বীরসিংহের মনে এই সাধারণ মেয়ের প্রতিও দুর্বলতা জাগল। সারল্যের আকর্ষণে আকৃষ্ট হয়ে তার কাছে গিয়ে বলল, 'তুমি এত চিন্তিত কেন? কী তােমার পরিচয়? এখানে গালে হাত দিয়ে বসে আছ কেন?’
‘আমার তিন বােন আমাকে কিছু না বলে কোথায় যেন চলে গেছে। আমি এখন একা এখানে পড়ে আছি। আমি ভেবে পাচ্ছি না কী করব!’ যুবতী বলল।
বীরসিংহ বুঝতে পারল যে তার বউরাই এই যুবতীর তিন বােন। তখন সে ওই যুবতীকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করল। একে নিয়ে বীরসিংহের চার স্ত্রী হল।
কিছুকাল পর বীরসিংহ রাজা হল। তার কিছুদিন পর চার বউয়ের চার ছেলে হল। চার ছেলের মধ্যে চতুর্থ স্ত্রীর পুত্র অন্য ছেলেদের মতাে ছিল না । সে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। বাপের কাছে বেশি ঘেষত না। আপন মনে নিজের কাজে জড়িয়ে থাকত। বড়াে ভাইদের সঙ্গেও মিশত না। সে সুযােগ পেলেই বনে গিয়ে বনের অধিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করত। আর বাকি তিন ছেলে বাপের কথামতাে চলত। মন্ত্রীরও ধারণা ছিল রাজা ওই তিন জনের মধ্যেই একজনকে সিংহাসনে বসাবে। রাজা চতুর্থ রাজকুমারকে কোনাে কাজের ভার দিলে নিজে তা না করে অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিত।
চতুর্থ রাজকুমারকে বনের অধিবাসীরা নেতা হিসেবে নির্বাচন করল।
এদিকে রাজা বীরসিংহের বয়স বাড়তে লাগল। রাজার পরে কে সিংহাসনে বসবে তা ঠিক করে দেবার জন্য মন্ত্রী রাজাকে জিজ্ঞেস করল। মন্ত্রীর কথা শুনে রাজা বনে গিয়ে চতুর্থ রাজকুমারকে সঙ্গে নিয়ে রাজপ্রাসাদে এসে তাকেই রাজা করে দিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, এখন তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও। বীরসিংহ কেন চতুর্থ রাজকুমারকে রাজা করল? এর ফলে বাকি তিন বউকে যে কথা দিয়েছিল তার ভঙ্গ হয়নি কি? এইভাবে রাজার কথা না রাখা কি উচিত? এটা কি ছােটোর প্রতি পক্ষপাতিত্ব নয়? অন্য রাজকুমারদের প্রতি উপেক্ষা নয়? এই সমস্ত প্রশ্নের সমাধান জেনেও যদি না জানাও তবে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথা শুনে বিক্রমাদিত্য জবাব দিলেন, ‘রাজা বীরসিংহ চতুর্থ ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে কোনাে শর্ত ভঙ্গ করেননি বরং তিনি দূরদর্শিতারই পরিচয় দিয়েছেন। রাজা যখন দ্বিতীয় রানিকে কথা দিলেন তখনই প্রথম রানির শর্ত নষ্ট হয়ে গেল। এইভাবে চতুর্থ রানিকে কথা দেওয়ার সাথে সাথে আগের তিন রানিকে যে কথা দিয়েছিলেন তার কোনাে দাম রইল না। বনবাসী যুবতীদের শর্ত আরােপের মধ্যে যত না যােগ্যতা ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল মােহ। কিছু না ভেবেই ওরা শর্ত করেছিল। বড়াে তিন রানির ছেলেদের ছিল গােলামির মনােভাব। তাদের যা করতে বলা হত তাই করত। কিন্তু ছােটো রাজকুমার তা করত না। তার রাজা হওয়ার যােগ্যতা আছে কি না তা প্রথম বুঝেছিল বনের অধিবাসীরা। তাই রাজা যােগ্য রাজকুমারকেই রাজা করেছিলেন। তিনি কোনাে ভুল বা শর্ত ভঙ্গ করেননি।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন