ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে গেল। শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগল।
শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, কেন যে তুমি এত পরিশ্রম করছ ভেবে পাই না। গুণকীর্তির মতাে তুমিও একদিন হাতে পাওয়া জিনিস নিজের হাতেই ধ্বংস করে ফেলবে। গুণকীর্তির কাহিনি শুনলে তুমি তােমার এই পথ চলার পরিশ্রম ভুলে যাবে।'
বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীনকালে শােণাবতী নদী তীরে সদানন্দ নামে এক বীণাবাদক থাকত। লােকে তাকে নতুন সরস্বতী এবং অভিনব নারদ নাম রেখেছিল। বহু রাজা তাকে নিজের দরবারে নিমন্ত্রণ করত।
কিন্তু সদানন্দের মনে ধন অথবা যশ লাভের কোনাে ইচ্ছা ছিল না। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল অধিক সংখ্যক শিষ্যকে নিজের বিদ্যা দান করা। তাই হাজার হাজার শিষ্য তার কাছে থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে। ফলে সদানন্দের অযাচিত ভাবেই রাজ আশ্রয় এবং যশ লাভ হল।
ক্রমে ক্রমে সদানন্দের বয়স হতে থাকে, বৃদ্ধ হয়। যারা বৃদ্ধ সদানন্দের কাছে থেকে শিখতে আসত সদানন্দ তাদের পুরােনাে শিষ্যদের কাছে পাঠিয়ে দিত। সেইসময় যুবক গুণকীর্তি তার কাছে এল। সদানন্দকে বীণাবাদন শেখাতে বলল।
‘বাবা আমি বৃদ্ধ হয়েছি। আমার অনেক শিষ্য আছে। তাদের একজনের কাছে শিখে নাও।' সদানন্দ গুণকীর্তিকে বলল।
‘আজ্ঞে, আপনার শিষ্যদের মধ্যে একজনও পরিপূর্ণ বিদ্যা অর্জন করতে পারেনি। আমি পূর্ণ বিদ্যা অর্জন করার জন্য আপনার কাছে এসেছি। আপনি আমাকে শেখালে আমি বীণা বাজানাের চর্চা করব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনার যশ অক্ষুন্ন রাখতে পারব।'
'বাবা, তােমার উৎসাহ প্রশংসনীয়। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে তােমাকে পূর্ণ শিক্ষা দিয়ে যেতে পারব কি না। যাই হােক তােমার এই গভীর আগ্রহ এবং দৃঢ় বিশ্বাস দেখে আমারও ইচ্ছে করছে তােমাকে শেখানাের।' সদানন্দ গুণকীর্তিকে শিষ্য করে নিল।
গুণকীর্তি গুরুর সেবা করে, যথেষ্ট পরিশ্রম করে, বীণাবাদন শিখতে লাগল।
তা সত্ত্বেও সদানন্দ যা ভেবেছিল তাই হল। গুণকীর্তির শিক্ষালাভ অর্ধেক হতে-না-হতেই সদানন্দ অসুখে পড়ে গেল। একদিন গুণকীর্তিকে কাছে ডেকে সদানন্দ বুঝিয়ে বলল, 'বাবা, আমার অন্তিম সময় এসে গেছে। তােমাকে পরিপূর্ণ রূপে শেখানাে আর আমার জীবনে হয়ে উঠল না। আর চার-পাঁচ বছর আগে যদি তুমি আমার কাছে আসতে তাহলে আমার চেয়ে অনেক বড়াে বীণাবাদক তােমাকে করতে পারতাম। কিন্তু সে সৌভাগ্য আমাদের দু-জনের কারাের ছিল না। আমাদের বংশে চিরকাল একটি বিচিত্র বীণা আছে। তাতে প্রত্যেক স্বর তিনটি স্থানেই ধ্বনিত হয়। যেকোনাে বীনাবাদক সেই বীণা বাজালে তার আওয়াজ শুনে শ্রোতা মুগ্ধ হবে। সে বীণা বাজিয়ে তুমি বড়াে বড়াে রাজাদের খুশি করতে পারবে। শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে তুমি যশ পাবে।' এই কথা বলে সেই বীণা গুণকীর্তিকে দিয়ে সদানন্দ মারা গেল।
গুণকীর্তি ভক্তি সহকারে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্ম করল।
তারপর একদিন সেই বীণা নিয়ে রাজ দরবারে হাজির হয়ে বলল, “মহারাজ আপনি আমাকে আপনার দরবারে বীণাবাদক করে নিন।'
রাজা দরবারে বীণা বাজানাের অনুমতি গুণকীর্তিকে দিলেন। গুণকীর্তি নিজের পূর্ব পরিচিত সংগীত ওই বিচিত্র বীণার মাধ্যমে শােনাল। শুনে দরবারের সবাই মুগ্ধ হল। দরবারের কেউ কোনাে দিন এত ভালাে বীণাবাদন অতীতে শােনেনি।
রাজা তৎক্ষণাৎ তাকে নিজের দরবারের বীণাবাদক পদে নিযুক্ত করলেন। সম্মানীও ভালােই দিলেন। তার ফলে গুণকীর্তির যশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
তারপর বহু নাম করা বীণাবাদক গুণকীর্তির বীণাবাদন শুনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল।
নানান দেশ থেকে যুবকরা এসে গুণকীর্তির শিষ্য হতে চাইল। কিন্তু গুণকীর্তি ভিন্ন ভিন্ন অজুহাতে ওদের কাউকে শিষ্য করল না।
বিশ্বের চোখে গুণকীর্তি মস্তবড়াে প্রতিভাবান যশস্বী বীণাবাদক হলেও মনে মনে তার কিন্তু শান্তি ছিল না।

গুণকীর্তির মনের অবস্থা যখন এতখানি অশান্ত সেইসময় রাজা গুণকীর্তিকে ডেকে বললেন, 'আমার মেয়ে কলাবতীকে বীণাবাদন শেখাতে হবে। আমার মেয়ে তােমাকেই মনে মনে ভাবী স্বামী হিসেবে বরণ করেছে।'
রাজার কথা শুনে গুণকীর্তির মনের অশান্তি যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। মানসিক যন্ত্রণায় সে ছটফট করতে লাগল।
শেষে একদিন গভীর রাত্রে গুণকীর্তি সেই বিচিত্র বীণা নিয়ে গােপনে পালিয়ে গেল। এক নদীর তীরে গিয়ে সেই বীণাটিকে পাথর দিয়ে ভেঙে ফেলে। তারপর সােজা গুরুর আশ্রমে গিয়ে নিজের আগেকার বীণা নিয়ে নতুন করে সাধনা শুরু করল। বহু দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একদিন গুরু ছাড়াই তার সেই সাধনা সিদ্ধ হল।
নিজের সিদ্ধি লাভের পর গুণকীর্তি একদিন ওই রাজদরবারে গিয়ে সবাইকে বীণাবাদন শুনিয়ে দেয়।
একদিন বিচিত্র বীণায় যে বাদন শ্রোতারা শুনেছিল গুণকীর্তি সেই বাদন তাদের শােনাল।
তারপর গুণকীর্তি কলাবতীকে বীণাবাদন শেখাল। আরও বহু শিষ্য তার কাছে শিখতে এলে সে তাদের একইভাবে সানন্দে সাগ্রহে শেখাতে লাগল। তারপর এক শুভ দিনে গুণকীর্তির সাথে কলাবতীর বিয়ে হল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ গুণকীর্তি কী ধরনের লােক? বিচিত্র বীণা ভেঙে ফেলা পাগলামি নয়? সাধনায় সিদ্ধিলাভ না করলে তার কতখানি ক্ষতি হত? গুণকীর্তি এরকম করল কেন? আমার এসব প্রশ্নের জবাব তুমি জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এ-কথা শুনে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘গুণকীর্তি বােকা নয়, পাগলও নয়। তার জীবনে নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্য ছিল। সদানন্দের হঠাৎ মৃত্যু ঘটায় তার সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা পড়ল। গুরুর কাছে সে চাইল পাণ্ডিত্য কিন্তু সে পেল বিচিত্র বীণা। প্রতিভাশালীর কাছে সাধনার মহত্ব নেই। কিন্তু যে সাধনা করে প্রতিভার মহত্ব অর্জন করতে চায় সে তা না করতে পারলেই অশান্তি ভােগ করে। তাই একদিন গুণকীর্তিকে নিজের হাতে সেই বিচিত্র বীণা ভেঙে চুরমার করতে হয়েছে। গুণকীর্তির মধ্যে আত্মবিশ্বাস পুরােমাত্রায় ছিল। এবং ছিল বলেই একলব্যের মতাে গুরুকে স্মরণে রেখে সাধনা করে একদিন সে সিদ্ধিলাভ করল। সিদ্ধিলাভ না করলেও তার মনে অশান্তি থাকত না।'
রাজা এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ করার সাথে সাথে বেতাল শব নিয়ে সেই গাছে উঠে পড়ল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন