ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি রাজা হয়েও ঠিক অন্য রাজাদের মতো হয়ে ওঠোনি। কোনো রাজা তোমার মতো কোনো কিছুকে এতটা আঁকড়ে থাকে না। রাজারা এক-এক সময় এক-একরকম চিন্তা করে। এক-এক সময় এক-একটাকে ধরে আবার অন্য সময়ে ঝট করে তা ছেড়ে দেয়। ওদের কোনো কিছু ধরা বা ছাড়ার পেছনে তেমন কোনো যুক্তিও থাকে না। আমার বক্তব্যের সমর্থনে আমি তোমাকে মহেন্দ্রপুরের রাজার কাহিনি বলছি। শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল
মহেন্দ্রপুরের রাজা ধীরেন্দ্রসিংহ মরার আগে একমাত্র ছেলে মহেন্দ্রকে কাছে ডেকে বলল, 'বাবা, তোমার বোন স্বয়ংপ্রভার বিয়ে দেওয়ার ভার তোমার উপর রইল। বিয়ের পর জামাইকে তুমি অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দেবে।' মহেন্দ্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বীরেন্দ্রসিংহ মারা গেল। সিংহাসনে বসল মহেন্দ্র।
একবার মহেন্দ্র শিকার করতে গেল। নদীর তীরে এক ভিল যুবক ভিল রমণীকে ডাকছিল। সে গাছ থেকে ফুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, 'যাচ্ছি।'
ভিল যুবক পথের উপর দাঁড়িয়ে রমণীকে ডাকছিল। রাজা মহেন্দ্র পেছন দিক দিয়ে এসে ওই যুবকের গায়ে তরবারি ঠেকিয়ে রাস্তা থেকে সরতে বলল।
ভিল যুবক পেছন ফিরে রেগে গিয়ে রাজার হাত থেকে তরবারি কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর, 'তোমার সাহস তো কম নয়? আমার গায়ে তরবারি ঠেকাচ্ছ। দাঁড়াও এখনই তোমায় শেষ করে ফেলছি।' বলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু-জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হল। একসময় রাজা মহেন্দ্রকে নীচে ফেলে সে তাকে মেরে ফেলতে যেতেই ভিল রমণী সেখানে ছুটে এসে চিৎকার করে উঠল, 'মেরো না, মেরো না! একে রাজার মতো দেখাচ্ছে।'
তখন ভিল যুবক রাজাকে ছেড়ে দিয়ে সদম্ভে দাঁড়িয়ে তাকে বলল, 'এখন বুঝতে পারছ কার গায়ে তরবারি ঠেকিয়েছিলে?'
ঠিক সেইসময় রাজার লোকজন সেখানে পৌঁছে গেল। অপমানের জ্বালা সহ্য করে রাজা মহেন্দ্র ফিরে গেল।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে রাজার সেনাবাহিনী ওই অরণ্যে ঢুকে খুঁজে খুঁজে সেই যুবককে ধরে নিয়ে গেল। রাজধানীতে নিয়ে গিয়ে ওই ভিল যুবককে কারাগারে পুরে দেওয়া হল।
রাজা মহেন্দ্র ঠিক করল ওই ভিল যুবককে রাজদ্রোহী হিসাবে ঘোষণা করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে। কিন্তু মন্ত্রীরা তা না করার পরামর্শ দিল। তাদের মতে, হঠাৎ এক ভিল যুবককে অরণ্য থেকে তুলে এনে মৃত্যুদণ্ড দিলে লোকের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন জাগবে। আবার তাকে প্রকাশ্যে বিচার করলে তারও কিছু বলার অধিকার থাকবে। তখন সে যদি যা যা ঘটেছে তা ভরা রাজসভায় প্রকাশ করে, রাজার গৌরব, মর্যাদা কমে যাবে। লোকের মুখে মুখে নানা কথা ছড়াবে। কিছু না করে শুধু যদি তাকে কারাগারে রেখে দেওয়া হয় তাহলে লোকের মনে তেমন কোনো প্রশ্ন জাগবে না।'
রাজা মন্ত্রীদের পরামর্শ গ্রহণ করে ভিল যুবককে কারাগারেই রেখে দিল।
কিছুদিন পরে, না জানি বিধাতার মনে কী ছিল, ওই ভিল যুবক রাজার বোন স্বয়ংপ্রভার নজরে পড়ে গেল। তাকে দেখার পরেই স্বয়ংপ্রভার মনে তার প্রতি দরদ জাগল। তাকে তার ভালো লেগে গেল। তারপর থেকে স্বয়ংপ্রভা গোপনে ভালো ভালো খাবার তার কাছে পাঠাত। সে যাতে কারাগারে ভালোভাবে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা সে করেছিল।
স্বয়ংপ্রভার সঙ্গে ভিল যুবকের প্রত্যেক দিন দেখা হত। ভিল যুবকেরও স্বয়ংপ্রভাকে ভালো লেগেছিল। সে একদিন তাকে বলল, 'তুমি যেমন আমায় ভালোবাস, আমিও তোমায় তেমনি ভালোবাসি। আর আমার এই কারাগারে থাকতে ইচ্ছে করছে না। চল আমরা দু-জনে পালিয়ে যাই। তোমাকে নিয়ে অরণ্যে যেতে চাই। সেখানে মহানন্দে থাকতে পারবে।'
এই কথার জবাবে স্বয়ংপ্রভা কোনো কথা বলল না। তারপর থেকে সে আর কোনোদিন ভিল যুবককে দেখতে এল না। কিছুদিন পরেই ভিল যুবক মুক্তি পেল।
এই কাহিনি শুনিয়ে বেতাল বলল, 'রাজা, যে মহেন্দ্র একদিন প্রতিশোধ নেবার জন্য ভিল যুবককে কারাগারে পুরেছিল, তাকে হত্যা করার কথা ভেবেছিল, তাকে হঠাৎ সে মুক্তি দিল কেন? রাজা মহেন্দ্র কি ভিল যুবকের অপমানের জ্বালা ভুলে গিয়েছিল? আর তার বোন স্বয়ংপ্রভা ওই ধরনের ব্যবহার করল কেন? ভালো খেতে দিল, ভালো থাকতে দিল আবার তার সঙ্গে অরণ্যে পালাতে বললে কথা বন্ধ করে দিল! আসা-যাওয়ার পাট চুকিয়ে দিল। কেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রাজা মহেন্দ্র যা করলেন তার সঙ্গে তার বোন স্বয়ংপ্রভার কাজের মিল আছে। রাজা ভিল যুবককে অরণ্য থেকে ধরে আনার পেছনে প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা নাও থাকতে পারে। হয়তো ইচ্ছাই ছিল না। ওই যুবকের পৌরুষ ও পরাক্রম দেখে স্বয়ং রাজা অবাক হয়েছিলেন। যে ভিল যুবক রাজাকে গ্রাহ্য করে না সেই যুবক ইচ্ছা করলে বহু যুবক নিয়ে বাহিনী গঠন করে অতর্কিতে রাজাকে আক্রমণ করতে পারে। রাজাকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দিতে পারে। সেইজন্যই ভিল যুবককে তিনি কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন। আর এই ধরনের কোনো ভয়ের কারণ আছে কি না পরীক্ষা করার জন্যই তার বোন স্বয়ংপ্রভা ভিল যুবককে যাচাই করেছিল। তাকে বিয়ে করলে অর্ধেক রাজত্ব পাওয়ার কথা শুনেও ভিল যুবক রাজি না হয়ে অরণ্যে ফিরে যেতে চাইল। যে ভিল যুবক বিনা পরিশ্রমে পাওয়া অর্ধেক রাজত্ব নিতে চায় না সে কোনোদিন রাজ্য জয় করার জন্য রাজাকে আক্রমণ করবে বলে রাজার মনে হয়নি। তাই রাজা তাকে মুক্তি দিলেন।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন