চোখের ফাঁড়া

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছে উঠে শবদেহ নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা এই জগতে যে যতই শক্তিমান হোক না কেন ফাঁদে পড়ার অবকাশ থেকেই যায়। প্রমাণ স্বরূপ আমি বিষ্ণুশাস্ত্রীর কাহিনি শোনাচ্ছি। শুনলে পথ চলার পরিশ্রম কমে যাবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে বঙ্গদেশে চন্দ্রবর্মা নামে এক রাজা ছিলেন। রাজার বয়স ছিল অল্প। বলতে গেলে যুবক ছিলেন। বয়স কম হলে কী হবে, দেশ শাসনের কাজে তিনি ছিলেন খুব দক্ষ। তবে তাঁর একটা মস্তবড়ো দুর্বলতা ছিল। সেটি হল ভবিষ্যৎ গণনা। কোনো জ্যোতিষী এলেই সব কাজ ফেলে ঠিকুজি এনে দেখতে বলতেন।

একবার বিষ্ণুশাস্ত্রী নামে এক জ্যোতিষী তাঁর কাছে এল। চন্দ্রবর্মা তাকে আদর আপ্যায়ন করে ডেকে বসিয়ে যথারীতি ঠিকুজি এনে দেখালেন।

'এর থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই? যদি থাকে অনুগ্রহ করে বলুন।' রাজা বললেন।

বিষ্ণুশাস্ত্রী অনেকক্ষণ হিসেব করে বলল, 'মহারাজ, উপায় যে নেই তা নয়। আছে। তবে আপনি অন্য কাউকে সে-কথা জানাতে পারবেন না। সেটি হল বিচিত্র আকারের এক ওঝা ঠিক সময়ে আসতে পারে। তাকে ধরতে পারলে, তার মন্ত্রশক্তিবলে আপনার দৃষ্টিশক্তি ঠিক থাকবে। এর বেশি আমি আর কোনো উপায় বলতে পারছি না।'

তারপর বিষ্ণুশাস্ত্রীকে পুরস্কার দিয়ে বিদায় দিলেন।

আঠারো বছর হয়ে এল। বিষ্ণুশাস্ত্রীর কথামতোই দেশে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিল। চারদিকে অভাব অনটন আর হাহাকার। তবে রাজা যেহেতু আগে থেকেই জানতেন সেইহেতু সমস্ত ব্যবস্থা আগেভাগেই করে রেখেছিলেন। তাই বহু প্রজাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন। পরের বছর ঠিক সময়ে বৃষ্টি হল। ফসল হল। আকাল দূর হল। রাজা যে আগে থেকে ব্যবস্থা করে বহু প্রজাকে বাঁচাতে পেরেছিলেন তারজন্য রাজার প্রতি প্রজাদের শ্রদ্ধা বেড়েছিল।

ফসল বেশি হওয়ায় প্রজারা আনন্দ করল, উৎসব করল। কিন্তু রাজার মনে দুশ্চিন্তা ঢুকল। বিষ্ণুশাস্ত্রীর কথামতো আকাল হয়েছে। চোখও নিশ্চয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে! তারপর থেকে রাজা সেই বিচিত্র রূপধারী ওঝার অপেক্ষায় দিন কাটাতে লাগলেন।

ঠিক এমন সময় রাজা চন্দ্রবর্মা একই ধরনের খবর দু-জন রাজার কাছ থেকে পেলেন। কলিঙ্গ রাজা এবং কাশ্মীর রাজা। ওই দু-জন রাজারই নাকি মৃত্যুর ফাঁড়া ছিল। দু-জনেই এক বিচিত্র রূপধারী ওঝার চেষ্টায় বেঁচে গেল। ওঝা নাকি ওই দুই রাজাকে কঙ্কন পরিয়ে চলে গেছে। ফলে এখন ওরা ভালো আছে। তাদের জীবনে আর কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।

কলিঙ্গরাজের চিঠিতে আরও ছিল

ওঝার নাম বরুণশাস্ত্রী। রাজপ্রাসাদেই থেকে যেতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু উনি থাকতে রাজি হননি। এমনকী কোন দেশে কোথায় যে উনি থাকেন তাও জানাতে চাইলেন না। তবে গোপনে খবর নিয়ে জানতে পেরেছি বরুণশাস্ত্রী আপনার দেশের দিকেই গেছেন।

এই চিঠি পাওয়ার পর থেকে চন্দ্রবর্মা সেই তান্ত্রিকের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন কাটাতে লাগলেন।

তাঁর অপেক্ষা বৃথা যায়নি। সাত দিনের মধ্যেই তিনি সেই তান্ত্রিকের দেখা পেলেন। লোকটাকে দেখতে সত্যিই অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। বয়স নাকি মাত্র পঁচিশ বছর। তবে শরীরটা বিরাটকায়। রং কালো। চোখ ট্যারা। দাঁত বড়ো বড়ো।

চন্দ্রবর্মা অধীর আগ্রহে ওই তান্ত্রিককে স্বাগত জানালেন। তিনি নিজের ঠিকুজি তাকে দেখালেন। তান্ত্রিক ঠিকুজি দেখে বলল, 'মহারাজ, আপনাকে অবিলম্বে সূর্য উপাসনা করতে হবে। জপতপে মন দিতে হবে। তা না হলে আপনার চোখের আলো নিকিয়ে যাবে। আপনি কালমাত্র বিলম্ব করবেন না।'

বরুণশাস্ত্রীর নির্দেশমতো রাজা চন্দ্রবর্মা প্রত্যেকটি কাজ করে যেতে লাগলেন। উপাসনা, জপতপ সব চলল। শেষে একদিন বরুণশাস্ত্রী বলল, 'মহারাজ, আর আপনার ভয় নেই। এখন আমাকে বিদায় দিন।'

চন্দ্রবর্মা প্রচুর পরিমাণে উপহার দিয়ে বরুণশাস্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার বাবা কোথায় থাকেন? কী করেন?'

'বাবা কিছুই করেন না। কারণ তিনি ইহজগতে আর নেই। আমার বাচ্চা বয়সেই তিনি মারা গেছেন।' বলল বরুণশাস্ত্রী।

'তাই নাকি? আপনার মতো মহাত্মা পুরুষের পিতা যে কত বড়ো মহাপুরুষ ছিলেন তা সহজেই কল্পনা করতে পারি। আপনি এক কাজ করুন ওনার মৃত্যুদিনে এবার আপনি এখানেই ঘটা করে ওই দিবস পালন করুন। তাঁর মৃত্যুদিবস পালনের পর আমি আপনাকে উপযুক্ত পুরস্কার দান করে বিদায় দেব।'

বরুণশাস্ত্রী তৎক্ষণাৎ বলল, 'আমার বাবার মৃত্যুদিবস আগামী পরশু। সেইজন্যই আমি তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে চাইছি।'

'তাই যদি হয় তাহলে ফিরে যাওয়ার দরকার কি? থেকেই যান না। পরশুদিন বহু ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করে আপনার বাবাকে স্মরণ করা যাবে! ভালো কথা, আপনিও আপনার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাইকে আসতে বলবেন।' রাজা চন্দ্রবর্মা বললেন।

রাজা চন্দ্রবর্মা লক্ষ করলেন, বিষ্ণুশাস্ত্রীর মুখ যেন রক্তশূন্য হয়ে আসছিল। নির্বিকার ভাবে বিষ্ণুশাস্ত্রী দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে রাজা লক্ষ করলেন, সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ। পরে যখন বরুণশাস্ত্রী তার বাবার উদ্দেশ্যে সকলের সামনে পিণ্ডদান করতে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে বিষ্ণুশাস্ত্রীর মুখ দিয়ে হঠাৎ সোচ্চারে বেরিয়ে গেল, 'থামাও!'

চন্দ্রবর্মা তৎক্ষণাৎ সমস্ত কাজ থামিয়ে অনুচরদের বললেন, 'এই কে আছ, এই বরুণশাস্ত্রীকে এক মাসের জন্য কারাগারে ফেলে রাখ। আর এই জ্যোতিষী বিষ্ণুশাস্ত্রী যেন কোনোদিন আর জ্যোতিষীগিরি করতে না পারে। এই মুহূর্তে লোক পাঠিয়ে চারদিকে ঘোষণা করে দাও। কেউ যেন এই জ্যোতিষীর কথা আর বিশ্বাস না করে। বিভিন্ন দেশে আমাদের বন্ধু রাজাদের কাছেও খবরটা পাঠিয়ে দেবে।'

সেদিন সন্ধ্যায় রাজা চন্দ্রবর্মা বিষ্ণুশাস্ত্রীকে এক হাজার মুদ্রা দিয়ে বিদায় দিলেন। ফেরা পথে বিষ্ণুশাস্ত্রী মনে মনে চন্দ্রবর্মার সূক্ষ্মবুদ্ধি ও দয়ালু মনের জন্য তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, বিষ্ণুশাস্ত্রী থামাও বলে চিৎকার করে উঠল কেন? চন্দ্রবর্মা বিষ্ণুশাস্ত্রীর জ্যোতিষীর খেতাব কেড়ে নিলেন কেন? যে বরুণশাস্ত্রী তাঁর চোখ দুটো রক্ষা করল সেই বরুণশাস্ত্রীকে কারাগারে পাঠালেন কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তবে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'বরুণশাস্ত্রী যে বিষ্ণুশাস্ত্রীর ছেলে তা সহজেই চন্দ্রবর্মার কাছে ধরা পড়েছিল। কিন্তু তা সঠিক প্রমাণ পাওয়ার জন্য তিনি মৃত্যুদিবস পালন করতে বরুণশাস্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর সন্দেহের সূত্রপাত হয় কলিঙ্গ ও কাশ্মীর রাজাদের চিঠি পড়ে। তাঁর চোখের ব্যাপার ওরা জানলেন কী করে? নিশ্চয় বরুণশাস্ত্রী ওদের কাছে গল্প করেছে। আবার বরুণশাস্ত্রী ঠিকুজি না দেখে চোখের ব্যাপার জানল কী করে? নিশ্চয়ই বাপের কাছে শুনেছিল? তা ছাড়া অত বড়ো শক্তিমান তান্ত্রিক হলে রাজার এককথায় থেকে যেত না। তাই বলে বিষ্ণুশাস্ত্রী যে জ্যোতিষী হিসাবে অপদার্থ ছিল তা নয়। দুর্ভিক্ষের ব্যাপার তাহলে জানা যেত না। তবে বিষ্ণুশাস্ত্রী বুঝেছিল যে তার ছেলে একটি অপদার্থ হবে। তাই তাকে তুলে ধরার জন্য সে সব রকমের চেষ্টাই করে ছিল। এত বড়ো অপরাধ করা সত্ত্বেও কিছুটা সত্যবাদী জ্যোতিষী হিসেবে রাজার কাছ থেকে এক হাজারটি মুদ্রা উপহার পেয়েছিল। চন্দ্রবর্মা ছেলেকে কম শাস্তি দেওয়ায় বিষ্ণুশাস্ত্রী মনে মনে খুশি হয়েছিল।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%