বন্ধুবিচ্ছেদ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিক্রমাদিত্য প্রতিজ্ঞায় অটল ছিলেন। যা একবার বলেছেন তা কার্যকরী না করে ছাড়ার পাত্র তিনি নন। তাই প্রত্যেক বারের মতাে এবারও বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে গিয়ে গাছ থেকে শব নাবিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতাে নীরবে পথ চলতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, তুমি হয়তাে কোনাে বন্ধুকে খুশি করার জন্য এত কষ্ট করছ। কিন্তু মনে রেখাে কোন বন্ধুত্ব যে আজীবন টিকবে তা কেউ বলতে পারে না। তােমাকে এক বন্ধুবিচ্ছেদের কাহিনি বলব। শুনে তােমার পরিশ্রম কমবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল :

প্রাচীন কালে শংকর ও কেশব নামে দু-জন বন্ধু ছিল। ওরা তেমন ধনী ছিল না। ওরা যখন বড়াে হল তখন তাদের কাঁধে সংসারের দায়িত্বভার পড়ল। তখন দু-জনে ঠিক করল সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে ব্যাবসা করবে।

অল্পদিনের মধ্যেই তাদের ব্যাবসা বেশ জমে উঠেছিল। ওরা সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে ব্যাবসার প্রসার করতে লাগল। শংকরের ছিল এক ছেলে আর কেশবের ছিল এক মেয়ে। ওরা দুজনে একসঙ্গে খেলা করত। দু-জনে একে অন্যকে ভালােবাসত। একে অন্যের খেলার সাথী ছিল। এসব লক্ষ করে শংকর তার ছেলের সঙ্গে কেশবের মেয়ের বিয়ে দেবে ঠিক করল। কেশব এই প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হল। তারপর ওদের বিয়ের বয়স হওয়ায় বিয়ের দিনক্ষণ দেখবে ঠিক করছে এমন সময় সমুদ্রে শংকরের মাল বােঝাই জাহাজ ডুবে গেল। শংকরের যত জাহাজ ছিল সব ডুবে গেল।

এই খবর শুনে শংকর হতাশায় ভেঙে পড়ল। যারা তার কাছে যত টাকা পেত তারা সব টাকা তার কাছে থেকে চেয়ে নিল। ফলে শংকরের আর্থিক অবস্থা শােচনীয় হয়ে গেল। তার অবস্থা এত পড়ে গেল যে সেই গ্রামে আর মাথা উঁচু করে চলা তার পক্ষে সম্ভব হল না। শেষে সে একদিন স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে গ্রামের বাইরে চলে গেল।

ওর চলে যাওয়া লক্ষ করে কেশব তাকে বলল, 'কী হল? কথা ছিল তােমার ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে হবে। যাবে যখন ঠিক করেছ আমি বাধা দেব না, তবে ছেলে-মেয়ের বিয়ের শুভ কাজটা সেরে গেলেই পারতে।'

‘আমার এখন ধান ফেলতে ভাঙা কুলাে অবস্থা। আমার মনে হয় সম্পত্তির দিক থেকে তােমার সমকক্ষ পরিবারের ছেলের সঙ্গেই তােমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া উচিত।' বলল শংকর।

‘তা কেন? তােমার সম্পত্তি জলে ডুবে গেছে তাে হয়েছেটা কি? আমার তাে আছে! আমরা কি ধনী হিসেবে জন্মেছি। এখন আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভালােভাবে থাকলে তাতেই আমাদের আনন্দ।' কেশব বলল।

কিন্তু শংকর কোনােক্রমেই এই প্রস্তাবে রাজি হল না। শত অনুরােধ করলেও কোনাে মতেই শংকর রাজি হল না।

শংকর দক্ষিণ দেশের মাণিক্য নগরে পৌঁছাল। এক রত্ন ব্যবসায়ীর কাছে বাপ আর ছেলে চাকরি নিল। দুজনে ঐকান্তিকতার সঙ্গে তার অধীনে কাজ করতে লাগল। ব্যাবসার ক্ষেত্রে থাকার ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ভদ্র ব্যবহারের ফলে শংকর ও তার ছেলের পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুদিন পরে তারা দুজনে নিজেরাই একটা ব্যাবসা করতে শুরু করল। তাদের ব্যাবসা ভালাে জমে উঠল।

শংকর তার সমকক্ষ এক পরিবারের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিল। অল্প কয়েক মাস পরে নাতনির মুখও দেখল শংকর। নাতনির নাম রাখল মালতী। মালতী জন্মের পর শংকরের ব্যাবসা যেন আরও সমৃদ্ধ হতে লাগল। খুব তাড়াতাড়ি সে আগের মতাে ধনী হয়ে গেল।

শংকরের চলে যাওয়ার পর কেশব নিজের মেয়েকে অন্য এক ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিল। ওই ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর তাদের এক ছেলে হল। ছেলের নাম রাখল বসন্ত।

বসন্ত বড়াে হলে একবার বসন্তের বাবা কেশবকে বলল, 'শ্বশুর মশাই, আরব দেশে আমাদের এখানকার জিনিসের ভালাে দাম পাওয়া যায় শুনেছি। আর ফেরার সময় আরবের খেজুর ও শিলাজিত আনা যাবে। ওগুলাে ওখানে খুব সস্তা, এখানে অনেক দামে বিক্রি করে আমরা কোটিপতি হতে পারব।'

কেশব তাতে রাজি হল। প্রয়ােজনীয় উট জোগাড় করে আরবে বিক্রি করার যােগ্য জিনিসপত্র কিনে উটের পিঠে চাপাল কেশব ও বসন্তের বাবা। ওরা দু-জনে সপরিবারে রওনা হল আরব দেশের দিকে।

মরুযাত্রা কিছুদিন ধরে ভালােই চলল। একদিন গভীর রাত্রে একদল ডাকাত এসে তাদের মেরে উটসহ সমস্ত জিনিস নিয়ে পালিয়ে গেল। কেশবের নাতি বসন্ত ছাড়া বাকি সবাই ডাকাতদের আক্রমণের কবলে পড়ল। প্রত্যেকেই ডাকাতদের ছােরা আর তরবারির আঘাতে মারা গেল। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে কোনােরকমে বসন্ত মরুভূমির বাইরে এল। বসন্তের ইচ্ছে করল না দেশে ফিরে যেতে। সেখানে তার আপনজন কেউ নেই। সে আপন খেয়ালে যেখানে যা পেত খেত, যেখানে জায়গা পেত রাত্রে ঘুমােত। যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াত।

বসন্ত কয়েক বছর এইভাবে ভবঘুরের মতাে ঘুরে বেড়িয়ে শেষে সে মাণিক্য নগরে পৌঁছাল। সে শংকরের দোকানের সামনে এসে, 'বাবু, আপনার দোকানের কোনাে কাজ করতে দেবেন? একটা চাকরি দেবেন বাবু?’

না খেতে পাওয়া ওই রােগা দুর্বল শরীরের বসন্তকে কাছে ডেকে শংকর লক্ষ করল ছেলেটার আদলে কেশবের ছাপ আছে। সে বসন্তকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, তুমি কোত্থেকে এসেছ? তােমার বাবার নাম কী? কী হয়েছে তােমাদের?’ অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে শংকর বসন্তকে অনেকক্ষণ ধরে নানা প্রশ্ন করল।

বসন্ত তাদের সমস্ত ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলল।

সব কথা শুনে দুঃখে শংকর বিহ্বল হয়ে বলল, 'বাবা, তােমার দাদু আমার বন্ধু ছিল। আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তুমি আমার কাছেই থেকে যাও। তােমাকে ব্যাবসা শেখাব।'

বসন্তের কথা শুনে শংকর বুঝতে পারল ছেলেটি বেশ বুদ্ধিমান এবং চালাক চতুর। তার এবং কেশবের পরিবারের মধ্যে যুগ যুগ ধরে যাতে একটা সম্পর্ক থাকে তারজন্য বসন্তের সঙ্গে নিজের নাতনি মালতীর বিয়ে দিল। ওরা দুজনে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, শংকরের এ কোন বিচিত্র ব্যবহার। সে নিজে যখন নিঃস্ব ছিল তখন কেশবের মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দিল না অথচ কপর্দকহীন বসন্তের সঙ্গে নাতনির বিয়ে দিল! এ কী ধরনের ব্যাপার? কেশবের মেয়েকে বউমা করে বাড়িতে আনলে কেশবের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বন্ধন কি আরও দৃঢ় হত না? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও তুমি সমাধান না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।' জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, শংকর সবসময় কেশবকে গভীরভাবে ভালােবাসত। তবে শংকর ছিল খুব অভিমানী। তাই কেশবের প্রস্তাব তার কাছে মনে হল তার দয়া। বন্ধুত্বের মধ্যে আর্থিক সম্পর্কের কোনাে স্থান শংকরের পছন্দ নয়। এক পর্যায়ে থাকলে কেশবের মেয়েকে সে নিশ্চয়ই ঘরে বউমা করে আনত। কিন্তু তা হল না। কেশব যখন সব হারাল তখন তার নাতির সঙ্গে নিজের নাতনির বিয়ে দিয়ে হারানাে বন্ধুত্বের কিছুটা ফিরে পেল শংকর।'

রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খােলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%