গীতার কথা

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতোই শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল তাঁকে বলল, 'রাজা, তোমার মতো মহান ব্যক্তির এই ধরনের ক্ষুদ্র কাজ করা উচিত নয়। ক্ষুদ্র কাজ করলে মানুষের পতন হয়। রঘুর কথা বললে তুমি বুঝতে পারবে আমার কথা কতখানি সত্য। রঘুর কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রমও কমবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে রঙ্গ নগরীর কাছে এক ঘন বন ছিল। ওই বনকে অরণ্যও বলা চলে। সেখানে এক নামকরা ডাকাত থাকত। সপরিবারে সদলবলে সে ওই অরণ্যে দীর্ঘকাল ছিল। তার মারা যাওয়ার পর তার ছেলে রঘু বাপের কাজ কাঁধে তুলে নিল। সেও চুরি-ডাকাতি করত। বাচ্চা বয়স থেকেই বাপের কাছে চুরি বিদ্যা শিখেছিল। তাই বাপ মারা যাওয়ার পর চুরি-ডাকাতি করতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি। বাচ্চা বয়সে বাপের সঙ্গে রঙ্গ নগরীর উৎসব ও মেলা দেখতে যেত।

একবার সে রঙ্গ নগরীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। সেখানে গীতাপাঠ হচ্ছিল। সেখানে যা শুনল, যা বুঝল তাতে তার ধারণা হল যে জগতে যা কিছু ঘটছে তা ভগবানের ইচ্ছেতেই ঘটছে। মানুষকে ভগবান যেভাবে চালাতে চান সেইভাবেই চালান। ভগবানের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চললে মোক্ষলাভ হয়।

বাপের মারা যাওয়ার পর তাকেই চুরি-ডাকাতির নেতৃত্ব করতে হল। নতুন উৎসাহে অনেক জায়গায় চুরি-ডাকাতি করে সে অল্পদিনের মধ্যেই অনেক টাকাপয়সা করে ফেলেছিল। রঘু নিজে করলেও সে ভাবছে না যে সে নিজে করছে। নিজের ইচ্ছায় করছে। নিজের তা করার ক্ষমতা আছে। নিজে তা করতে পারে। সবসময় মনে-প্রাণে সে ভাবছে ভগবান করিয়ে নিচ্ছে। সে মাধ্যম মাত্র। তার ধারণা ছিল ভগবান তাকে দিয়ে চুরি-ডাকাতিও করিয়ে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে রাজার সেনারা ওই অরণ্যে হানা দিয়ে চোর-ডাকাতদের আক্রমণ করে তাদের বন্দি করত। কেউ হঠাৎ ধরা পড়ত, কেউ পালিয়ে বাঁচত। রাজার সেনারা আসছে শুনে রঘুও ঘোড়ায় চড়ে পালাল।

অনেক দূর যাওয়ার পর রঘুর তৃষ্ণা পেল। চারদিক তাকিয়ে, ছোটাছুটি করে সে একটি গাছের নীচে এক মুনিকে তপস্যা করতে দেখল। অনেকক্ষণ সামনে দাঁড়ালেও মুনি তার দিকে তাকাল না। তার পাশেই ছিল কুমণ্ডুলু। রঘু দেখল তাতে জল নেই।

রঘুর মেজাজ গরম হয়ে গেল। কারণ ক্ষুধা, তৃষ্ণা মানুষকে অকেজো করে দেয়।

তখন রঘু মুনির গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, 'জল কোথায়? একটু জল চাই। ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে।' মুনি চোখ খুলে অগ্নিদৃষ্টিতে রঘুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'মুর্খ পাষণ্ড কোথাকার! দিলে তো আমার তপস্যা ভঙ্গ করে! তুমি এই মুহূর্তে পাথর হয়ে যাও।'

তখন রঘু বলল, 'পাথর করবেন পরে, আগে জল দিন তো! তেষ্টা মেটাই।'

মুনি অবাক হয়ে গেল। কারণ তার অভিশাপ রঘুর লাগেনি। তখন মুনি ভাবল, 'এ হয়তো আমার চেয়ে শক্তিশালী কেউ।' এ-কথা ভেবে মুনি মন্ত্রবলে কমণ্ডুলুতে জল আনিয়ে রঘুকে দিল। রঘু ওই জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটাল। তারপর ঘোড়ায় চড়ে সে চলে গেল।

রঘুর এক ছেলে ছিল। ছেলে বড়ো হলে রঘু অনেক টাকা খরচ করে তার বিয়ে দিল। গুপ্তচরদের কাছ থেকে খবর পেয়ে রাজা অরণ্যের যে অঞ্চলে রঘু ছিল, যেখানে বিয়ে হচ্ছিল, সেখানে অনেক সৈনিক পাঠাল। মাঝরাত্রে রাজার অসংখ্য সৈনিক এসে অরণ্যের ওই অঞ্চল ঘিরে ফেলে রঘুর ছেলে, ছেলের বউ সহ তার দলের সবাইকে বন্দি করল। একা রঘু পালাতে পারল।

রাজা রঘু ধরা পড়েনি দেখে খুব রেগে গেল। সে তার লোকদের চারদিকে ঘোষণা করে দিতে বলল, 'এক সপ্তাহের মধ্যে রঘু ধরা না পড়লে রঘুর ছেলে, ছেলের বউ সহ তার দলের সবাইকে একসঙ্গে মেরে ফেলা হবে।'

এদিকে রঘুর দলের সবাই ধরা পড়ায় রাজার ঘোষণা কানে যায়নি। এই ঘটনার পরে, এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর, মুখে মুখে খবরটা তার কাছে পৌঁছোতেই সে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে সোজা রাজপ্রাসাদে এসে হাজির হল। এসেই দেখতে পেল ছেলে এবং ছেলের বউয়ের মুণ্ডু রাজপ্রাসাদের গেটের সামনে ঝুলছে। এই দৃশ্য দেখে তার মাথায় রক্ত উঠে গেল। রেগে গিয়ে সে বলল, 'পাষণ্ড রাজা, দুটো নিরপরাধীকে মেরে ফেলল?' মুখ দিয়ে এই কথা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে রঘু সেখানেই পাথরের মূর্তি হয়ে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, যে রঘু মুনির অভিশাপে পাথর হল না সেই রঘু বিনা অভিশাপে পাথর হয়ে গেল কী করে? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'মুনির অভিশাপে রঘুর কিছু না হবার কারণ ভগবানের প্রতি তার গভীর দৃঢ় বিশ্বাস। রঘু ভাবত জগতে যা কিছু ঘটছে ভগবানের নির্দেশেই ঘটছে। কিন্তু যে মুহূর্তে নিজের ছেলের এবং ছেলের বউয়ের কাটা মুণ্ডু দেখল, সেই মুহূর্তে তার ভগবানের নির্দেশের কথা মনে ছিল না। সে মনে করল, ওটা রাজাই করেছে। ফলে সে পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। মুনির অভিশাপের ফল যেন এতদিনে ফলল।

রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%