মণির ফল

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যখন সফল হবে তখন হয়তো দেখা যাবে তোমার সেই সাফল্যের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে একটি কাহিনি শোনাব। বিজয়বর্মা নামে এক রাজার কাহিনি। শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল

প্রাচীন কালে কলিঙ্গ দেশের রাজা ছিল বিজয়বর্মা। অল্পবয়সে সে সিংহাসনে বসার কিছুকাল পরে সুনন্দিনী নামে এক রাজকুমারীকে বিয়ে করল।

বিয়ের কিছুদিন পরে সুনন্দিনীর অসুখ করে। অসুখটা যে মানসিক রোগ নয় সে ব্যাপারেও বৈদ্যরা নিশ্চিত ছিল। অবশেষে রাজবৈদ্য জানাল যে একমাত্র নাগমণি ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ দিয়ে তার অসুখ সারানো যাবে না। মানুষের চোখে না পড়া একটি নাগ বিন্ধ্যারণ্যে আছে। তার মাথার মণি জোগাড় করতে পারলে সুনন্দিনীর অসুখ সম্পূর্ণরূপে সেরে যাবে।

বিজয়বর্মা এই কথা শোনার পর শাসনভার মন্ত্রীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে খোঁজ করতে লাগল। কিছুদিন খোঁজ করার পর একদিন গভীর রাত্রে দেখতে পেল সেই নাগ। নাগের মাথায় মণি জ্বলজ্বল করছিল।

এই কথা ভেবে বিজয়বর্মা সাপের অতি কাছের একটি ডালে তির মারল। সঙ্গেসঙ্গে সাপ ফণা মেলে ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে লাগল। তৎক্ষণাৎ বিজয়বর্মা ওই মেলা ফণাতে তির মারল।

সেই তিরে বিদ্ধ হয়ে ওই সাপ মারা গেল। বিজয়বর্মা গাছ থেকে নেমে সাপের মাথা থেকে মণি তুলে নিল। সেই সাপের মণি নিয়ে অরণ্যপথে যাওয়ার সময় ভোর বেলায় মানুষের কোলাহল শুনতে পেল। বিজয়বর্মা ভাবল, এই অরণ্যে মানুষ আসবে কোথা থেকে? যারা আসছে তারা চোর অথবা ডাকাত।

কিছুক্ষণ পরে ওই বনের অধিবাসীরা এসে বিজয়বর্মাকে ঘিরে ফেলল। ওদের কথাবার্তা শুনে বিজয়বর্মা বুঝল ওরা তাকে ওদের দেবীর সামনে বলি দেবে। ওদের হাত থেকে কীভাবে নিজেকে মুক্ত করা যায় তা সে ভাবতে লাগল।

ওই বনের অধিবাসীরা শিকারি ছিল। ওদের নেতার একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটি সুন্দরী। বিজয়বর্মাকে দেখেই মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে যায়। সে তার বাবাকে বলে, 'বাবা, ওকে আমি বিয়ে করব। আর বিয়ে যদি না দাও, ওকে যদি বলি দিতে চাও তাহলে আমাকেও বলি দাও।'

'সে কী মা? বাইরের লোককে, বিশেষ করে নগরবাসীকে, আমরা হাতের মুঠোয় পেলেই তো বলি দিয়ে থাকি। তবে একটা উপায় আছে, আমি ওই যুবকের সঙ্গে লড়াই করব। ও যদি জিতে যায় ওকে বীর হিসাবে ছেড়ে দিতে পারি। তারপর যদি সম্ভব হয় তুমি ওকে বিয়ে করবে।' বলল শিকারিদের নায়ক তার মেয়ে চিত্রলেখাকে।

তারপর শুরু হল বিজয়বর্মা ও চিত্রলেখার বাবার মধ্যে লড়াই। অনেকক্ষণ ধরে ওদের লড়াই চলল। শেষপর্যন্ত বিজয়বর্মা জিতে গেল।

তারপর বিজয়বর্মার সামনে হাজির হল চিত্রলেখা। চিত্রলেখাকে দেখে বিজয়বর্মা চোখ ফেরাতে পারল না। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই নিজের পরিচয় দিল এবং তার সঙ্গে চিত্রলেখাকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য তার বাবার কাছে অনুরোধ করল। প্রসঙ্গত তাকে কেন ওই অরণ্যে আসতে হয়েছিল এবং তাকে যে নাগমণি নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে তাও জানাল।

সব কথা শুনে চিত্রলেখার বাবা বলল, 'আমরা বহুকাল ধরে ওই নাগমণি খুঁজছি, ওই নাগমণি আমাকে দিয়ে তুমি চিত্রলেখাকে নিয়ে যেতে পার।'

বাপের কথায় সায় দিয়ে চিত্রলেখাও বলল, 'সত্যি আমার বাবা অনেককাল থেকে ওই নাগমণি খুঁজছেন। তাঁকে ওটা দিয়ে দিলে আমি তোমার সঙ্গে যেতে রাজি আছি।' কিছুক্ষণ ভেবে বিজয়বর্মা বলল, 'চিত্রলেখা আমি তো নাগমণি দিতে পারব না। তুমি যদি নাগমণির পরিবর্তে আমাকে বিয়ে করতে চাও তাহলে সে বিয়েতে আমি রাজি নই। চললাম।' বলে বিজয়বর্মা সেই মুহূর্তে এগিয়ে যেতে লাগল।

তৎক্ষণাৎ চিত্রলেখার বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, 'দাঁড়াও নাগমণি আমার দরকার নেই। নাগমণি আমাকে দিলে তুমি চিত্রলেখাকে পেতে না। তুমি একে নিয়ে যাও।'

বিজয়বর্মা নাগমণি ও চিত্রলেখাকে নিয়ে নিজের দেশের দিকে পাড়ি দিল। তারপর নাগমণি প্রয়োগ করার ফলে সুনন্দিনীর অসুখ সেরে গেল। দুই স্ত্রীকে নিয়ে বিজয়বর্মা দিন কাটাতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'বিজয়বর্মা ওই মণি দিতে চাইল না কেন? চিত্রলেখার চেয়ে সুনন্দিনীকে কি বিজয়বর্মা বেশি ভালোবেসেছিল। মণি না পেলে মেয়েকে ছাড়ব না বলেছিল চিত্রলেখার বাবা। পরে মণি না পেয়েও ছাড়ল কেন? মণি দিলে চিত্রলেখাকে পেত না কেন? আমার এই প্রশ্নগুলোর সমাধান জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'বিজয়বর্মা মণি পাওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছে। চিত্রলেখার পরিবর্তে সে ওই মণি হারাতে চায়নি। মণি খোঁজার পেছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল। রাজা বিজয়বর্মা কখনোই সেই উদ্দেশ্যের কথা ভুলে যাননি। চিত্রলেখাকে তার ভালো লেগেছিল। কিন্তু সুনন্দিনীকে সারিয়ে তোলার কথা সে ভুলে যায়নি। এটাই হয়তো চিত্রলেখার বাবা পরীক্ষা করেছিল। আজ দ্বিতীয় স্ত্রীকে পেয়ে যদি প্রথম বউকে অবহেলা করে, কাল তৃতীয়কে পেয়ে দ্বিতীয়কে অবহেলা করতে পারে। সেইজন্যই বিজয়বর্মা মণি দিলে সে মেয়েকে তার সঙ্গে পাঠাত না।'

রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছের কাছে।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%