প্রাণদান

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার সেই গাছের কাছে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতােই নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, ‘রাজা, বহু বছর আগে মাধব নামে একজন। বহু লােককে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আপনজনকে কোনােরকম সাহায্য করেনি। তােমারও দেখছি সেই অবস্থা হচ্ছে। শুধু পরের জন্য খেটে মরছ। মাধবের কাহিনি একটু খুলে বলছি, তাতে তােমার খাটুনিও কমবে।'

বেতাল মাধবের কাহিনি শুরু করল : পিনাকিনী নদীর ধারে সম্পন্ন পরিবারে মাধব নামে এক যুবক ছিল। তার শৈশব, কৈশাের কেটেছে খুব বেশি আদরযত্নে। বিপদ-আপদে সে কোনােদিন পড়েনি। যথাসময়ে লেখাপড়া করার কষ্টও সে করেনি। তাই লেখাপড়া তার আর হল না। তার জমিজায়গা ছিল অনেক। তাই, মাধবের বাবা-মা তাকে লেখাপড়া করতে জোর করেনি। মাধবের যা ইচ্ছা তাই তাকে করতে দিত।

মাধব বড়াে হল। তার ইচ্ছে করল শহরে যাওয়ার। বাবা-মা-কে নিজের ইচ্ছা জানাল। ওর বাবা-মা বারণ করল না। মাধব জমিজায়গা সব বিক্রি করে শহরে চলে গেল। ওই শহরের নাম বিক্রমসিংহপুর। শহরে ভালাে বাড়ি কিনল। বাকি সমস্ত অর্থ দিয়ে ব্যাবসার জিনিস কিনে যত্ন করে ভাণ্ডারে রেখে দিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। একদিন তার বাড়িতে আগুন ধরে গেল। মাধব কোনােরকমে আগুনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাল। কিন্তু পারল না তার বাবা-মা ও ব্যাবসার জিনিস উদ্ধার করতে। ধনী মাধব ভিখারি হয়ে গেল। বাঁচার পথ তার সামনে খােলা ছিল না।

কিন্তু ভিক্ষে করতেও তার মন চাইল না। তাই সে ঠিক করল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। একদিন গভীর রাত্রে সে চুপিচুপি পিনাকিনী নদীতে ঝাঁপ দিতে গেল।

হঠাৎ সেই অন্ধকারে গাছের নীচে থেকে অজানা অচেনা কে একজন চিৎকার করে বলে উঠল, 'বাবা তুমি যাচ্ছ কোথায়? কী করতে যাচ্ছ?’

মাধব সেই গাছের নীচে গেল। সেখানে এক মুনিকে দেখতে পেল। মাধব মুনিকে নিজের কাহিনি শােনাতে গেল। মুনি তাকে বাধা দিয়ে বলল, 'আমি তােমার সমস্ত কাহিনি ভালােভাবেই জানি। এই জগতে কীভাবে বাঁচতে হয়। তা তুমি দেখছি মােটেই জান না। তুমি নদীতে ঝাপ দিয়ে মরতে চাইছ বটে কিন্তু তুমি তা কিছুতেই পারবে না।'

‘কেন মুনিবর?’ মাধব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল !

‘তােমার আয়ু যে এক-শাে বছর। এক-শাে বছর না হলে তুমি মরবে কী করে?’ মুনি বলল।

এ-কথা শুনে মাধব মােটেই খুশি হল না। আরও ঘাবড়ে গিয়ে সে বলল, ‘আমার এখন একমুঠো খাবারের জোগাড় করার ক্ষমতা নেই। আর আপনি বলছেন কিনা আমি এক-শাে বছর বাঁচব? বাঁচা আমার কাছে নরকযন্ত্রণা। মনিবর, এখন আমাকে কি এক-শাে বছর ধরে নরকযন্ত্রণা ভােগ করতে হবে?’

মুনি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, তুমি টাকাপয়সা ছাড়া বাঁচতে পারবে না? তুমি কি টাকাপয়সা রােজগার করতে চাও? বল তাহলে আমি একটা উপায় বলে দেব। মরা মানুষকে তুমি নিজের আয়ু থেকে ভাগ দিয়ে বাঁচাতে পারবে। এইভাবে একটু একটু আয়ু বিক্রি করে অনেক রােজগার করতে পারবে। কিন্তু মনে রেখ যত আয়ু তুমি বিক্রি করবে তােমার এক-শাে বছর থেকে কিন্তু তত বছর কমবে।'

মাধব ভাবল মুনির কথা যদি সত্য হয় তাহলে তাে তার জীবনে কোনাে সমস্যাই থাকবে না।

মুনির কাছে মাধব মন্ত্র নিল। কী করে অন্যকে বাঁচাতে হয়। কী করে আয়ু বিক্রি করতে হয়।

তারপর সে হাঁটতে শুরু করল। যেতে যেতে সকালে একটি গ্রামে পৌঁছােল। ওই গ্রামে এক ধনীর বাড়ির সামনে অনেক লােক ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। আগের দিন রাত্রে নাকি ওই ধনী লােকটা দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে।

মাধব ওই ধনীর আত্মীয়দের কাছে গিয়ে বলল, 'আমি একে বাঁচিয়ে দিলে তােমরা আমাকে কী দেবে?’

তার কথা শুনে সবাই অবাক হল। বিশ্বাস করল না তার কথা।

‘আমি বাঁচাতে না পারলে কারও কোনাে ক্ষতি তাে হবে না? বাঁচাতে পারলে কী দেবে তাই জিজ্ঞেস করছি।' মাধব বলল।

‘একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দেব। তুমি যদি পার বাঁচিয়ে তােল।' ধনীর আত্মীয়রা বলল।

মাধব হাত-পা ধুয়ে নিল। একটা জল ভরতি পাত্র নিয়ে মড়ার কাছে বসল। মন্ত্র পড়ে নিজের আয়ুর অংশ দান করতে করতে মড়ার উপর জলের ছিটে দিল। সাথে সাথে মডা নড়ে উঠল। ধনী বেঁচে উঠল। মাধবকে ওরা শুধু যে স্বর্ণমুদ্রা দিল তাই নয় বস্ত্র ও বাহন দিয়ে তাকে প্রণাম করল।

স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে মাধব নিজের শহরে ফিরে এল। তার যশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রতিদিন পালকিতে করে বহু মড়া তার বাড়ির সামনে লােকে আনত।

মাধবের জীবন দানের ব্যাবসা জোর জমে উঠেছিল। ওর বাড়িতে ধনসম্পত্তির যেন বৃষ্টি হতে লাগল। বহু গরিবও মড়া নিয়ে হাজির হত, প্রাণ দান করতে অনুরােধ করত তাকে।

মাধব অল্পদিনের মধ্যেই কোটিপতি হয়ে গেল। তা সত্ত্বেও তার প্রাণ দানের ব্যাবসা দিনের পর দিন বাড়ছিল। সে সতর্ক হল। অল্প অল্প দিনের আয়ু বণ্টন করতে লাগল। শুধু মাধব নিজে জানত সে কতদিনের আয়ু বণ্টন করতে পারে। অন্যেরা ভাবত মাধব অফুরন্ত আয়ু বণ্টন করতে পারে।

মাধব যােগ্য এক মেয়েকে বিয়ে করল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরেই তার বউ মারা গেল। মাধব নিজের বউকে আয়ু দান করে বাঁচাল না। শাস্ত্র মতে স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্মাদি সারল।

সবাই অবাক হল। যে লােকটা এত লােককে বাঁচাতে পেরেছে সে নিজের বউকে বাঁচাতে পারল না! লােকে ভাবতে লাগল মাধবের আর বাঁচানাের ক্ষমতা নেই। যে ক্ষমতা দেখিয়ে মাধব হাজার হাজার মানুষকে অবাক করেছিল, সেই ক্ষমতা যে মাধবের হারিয়ে গেছে লােকে তার প্রমাণ হাতেনাতে পেয়ে গেল।

এই ঘটনার পর থেকে যারাই মড়া নিয়ে মাধবের কাছে যেত তাদের সবাইকে মাধবের প্রতিবেশীরা বলত, 'আরে তােমরা কার কাছে এসেছ! যে মাধব নিজের বউকে বাঁচাতে পারল না সে অন্যকে বাঁচাবে কী করে?’ এ-কথা শুনে লােকে ফিরে যেত হতাশ হয়ে। ক্রমে ক্রমে মড়া আর কেউ আনত না। এর পর আশি বছর বয়স পর্যন্ত মাধব ভালােভাবে বেঁচেছিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, আমার মনে একটা সন্দেহ জেগেছে। যে মাধব এত লােককে বাঁচিয়েছে সে নিজের স্ত্রীকে বাঁচাল না কেন? ওর স্ত্রীর কাছে টাকাপয়সা পাবে না বলে? নাকি সে নিজের স্ত্রীকে ভালােবাসত না ? স্ত্রীকে না বাঁচিয়ে মাধব নিজের সুনাম ক্ষুন্ন করল কেন? এই প্রশ্নগুলাের সঠিক জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

তারপর বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘মাধব ব্যাবসা করছিল। ওর ব্যাবসার মূলধন ছিল ওর নিজের আয়ু। সীমিত আয়ু থেকে কিছু কিছু বণ্টন করে সে টাকাপয়সা রােজগার করছিল। সে সুনাম অর্জনের জন্য এসব করেনি। তার টাকাপয়সা যখন হয়ে গেল তখন সে ঠিক করল, আয়ু বিক্রির ব্যাবসা বন্ধ করে দেবে। কিন্তু তার যশ এবং সুনাম এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল যে তার পক্ষে ব্যাবসা বন্ধ করা অসম্ভব ছিল। একমাত্র সুনাম ক্ষুন্ন করা ছাড়া ব্যাবসা বন্ধের অন্য কোনাে উপায় ছিল না। ঠিক এই সময় তার স্ত্রী মারা গেল। স্ত্রীর প্রতি যথেষ্ট ভালােবাসা থাকা সত্ত্বেও মাধব তাকে বাঁচল না। নিজেকে সে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিল। তাই সে ত্যাগ করল নিজের সুনাম এবং স্ত্রীকে। মাধব তা না করলে অন্যদের বাঁচাতে বাঁচাতে নিজে মরে যেত।'

রাজার এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ হওয়ার সাথে সাথেই বেতাল শব নিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%