মনের পরিবর্তন

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য যথারীতি গাছে উঠে গাছ থেকে শব নাবিয়ে আগের মতােই কাধে ফেলে হাঁটতে লাগলেন নীরবে। কিছুক্ষণ পরে শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার কাজে তােমার কঠোর পরিশ্রম সত্যি প্রশংসার। তবে ভয় হয় পাছে তুমিও বদলে যাও। ভাবি অবন্তী নগরের যুবরাজ অমরধ্বজের মতাে তােমারও মনের পরিবর্তন হবে কি না। অমরধ্বজের কাহিনি বলছি। শুনতে শুনতে হাঁটলে হাঁটার পরিশ্রম কমে যাবে।'

বেতাল কাহিনি শুরু করল : প্রাচীন কালে অবন্তী নগরের প্রান্তে বিরাট এক অরণ্য ছিল। বিরাট বিরাট ভয়ংকর জীবের লঙ্গে লড়াই করে সেই অরণ্যে থাকত ভীল জাতের কয়েকটি পরিবার। অন্য অঞ্চলের সঙ্গে তাদের কোনাে যােগাযােগ ছিল না। নিজেদের খাবার নিজেদেরই একরকম যুদ্ধ করে জোগাড় করে নিতে হত। প্রাণ রাখতে তাদের প্রাণান্ত হতে হত। নিজেদের অঞ্চলে ওরা সীমাবদ্ধ থাকত। বাকি পৃথিবীর খবর তাদের কাছে ছিল অজানা। অরণ্যের জন্তুজানােয়ারদের হাত থেকে ওরা বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করত। ওদের হাত থেকে জন্তুজানােয়ারগুলােও বাঁচার চেষ্টা করত। ওদের এক পক্ষের আঘাতে অন্য পক্ষের মৃত্যুও ঘটত। ভীল অঞ্চলের সবাই একজনকে নেতা হিসেবে মানত। তার কথামতাে ওরা প্রত্যেকে চলত।

অবন্তী নগরের যুবরাজ ছিল খুব সাহসী এবং শক্তিশালী। বহু বার সে কোনাে অস্ত্র ব্যবহার না করে হিংস্র জন্তুকে খালি হতে মেরে ফেলেছিল। বড়াে বড়াে বাঘ বা সিংহকে খালি হাতে ধরা বা মেরে ফেলা তার পক্ষে এমন কোনাে শক্ত কাজ ছিল না।

একবার এক বাঘ মারতে গিয়ে ব্যর্থ হল। বাঘ তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে লাগল। অমরধ্বজের মনে জিদ চাপল। সে-ও ছাড়ার পাত্র নয়। বাঘের পিছনে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে সে ভীল অঞ্চলে পৌঁছে গেল। অরণ্যের ওই অঞ্চলে যে জনমানব ছিল সে সম্পর্কে তার কোনাে ধারণা ছিল না। এদিকে সেদিকে তাকাতে তাকাতে তার নজরে পড়ল এক অপূর্ব সুন্দরী জীবন্ত দুশ্য। দেখল এক সুন্দরী যুবতী বাঘের বাচ্চার সঙ্গে খেলা করছে। এই ধরনের একটি ঘটনা অমরধ্বজ দেখা তাে দুরের কথা কোনােদিন ভাবতেও পারেনি। ভীল কন্যা ও অমরধ্বজ একে অন্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কোনাে গয়নাগাটি না পরা অবস্থায়ও যে কোনাে রমণীকে এত সুন্দর দেখায় তা যেন যুবরাজ ভেবেও ভাবতে পারল না। ভীল ছাড়া অন্য কোনাে জাতের মানুষকে ভীল কন্যা দেখেনি কোনােদিন। তাই তার কাছে যুবরাজ এক বিস্ময়। গায়ের রঙে রূপে এ যেন তাদের মতাে নয়। অন্য এক জগতের মানুষ। কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল হয়তাে এ কোনাে দেবতা। তাই সে ছুটে গেল সবাইকে খবরটা দিতে। যুবরাজও তাকে অনুসরণ করল। অল্পক্ষণের মধ্যে ভীলেরা যুবরাজ অমরধ্বজকে ঘিরে ফেলল। যুবরাজ ঠিক এই অবস্থার জন্য যেন প্রস্তুত ছিল না। পরমুহূর্তে সে চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল, 'আমি অবন্তী নগরের যুবরাজ। কারাে আপত্তি যদি না থাকে তাে আমি এই মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।'

এ-কথা শুনে ভীলেরা অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। তারপর তাদের ভিতর থেকে এক বৃদ্ধ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে অমরধ্বজকে তাদের নেতার কাছে নিয়ে গেল। ভীল নেতা যুবরাজের বক্তব্য শুনে বলল, ‘এই মেয়েকে বিয়ে করতে হলে তােমাকে একটা পরীক্ষা দিতে হবে। রাজি আছ?’

সাহসী যুবরাজ পরীক্ষা দিতে রাজি হয়ে গেল।

'তাহলে চল।' বলে ভীল নেতা তাকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে গেল। পরে ভীলেরা সবাই এসে সারি বেঁধে দাঁড়াল। সেই সারিতে বুড়াে-বুড়ি, যুবক-যুবতী সবাই ছিল। তারা সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে এল এক বিরাটাকায় শক্তিশালী মানুষ। হাতির শরীরের মতাে বিরাট শরীর তার। তাকে দেখে অমরধ্বজের ঈর্ষা জাগল। তাকে দেখে অসহ্য লাগল যুবরাজের।

ওই লােকটাকে দেখিয়ে ভীল নেতা অমরধ্বজকে বলল, 'আমাদের মধ্যে এর চেয়ে শক্তিশালী লােক আর নেই। এই মেয়েকে বিয়ে করতে হলে তােমাকে এর সঙ্গে লড়তে হবে। একে হারিয়ে দিলে তাবেই বিয়ে করতে পারবে। তা না হলে পারবে না।'

অমরধ্বজ ভীল নায়ককে বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারে এই ধরনের পরীক্ষা নেওয়া অনুচিত। তােমাদের এই আচার অত্যন্ত খারাপ। এই লােকটাকে হারানাের জন্য দরকার পশুশক্তি। কিন্তু বিয়ের ব্যপারে দেখা উচিত পাত্রের গুণ আর রূপ।'

‘আমরা অরণ্যের বাসিন্দা। আমরা তােমাদের রীতিনীতি জানি না। আমাদের মত অনুযায়ী এর সঙ্গে লড়তে রাজি না হলে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যেতে পার।' ভীল নায়ক বলল।

এ-কথা শুনে অন্যেরা হাসল।

‘আমি ওর সঙ্গে লড়তে রাজি আছি।'

বলল অমরধ্বজ। মুহূর্তে সকলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। কঠিন নীরবতা বিরাজ করতে লাগল চারদিকে।

শুরু হল দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি। বেশিক্ষণ হল না। হটাৎ লােকটা অমরধ্বজকে ধরে তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলল। সবাই হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল। গােটা অঞ্চল আনন্দমুখর হয়ে গেল। ভীল কন্যাও আনন্দে হাততালি দিতে লাগল।

লড়তে গিয়ে অমরধ্বজ টের পেল যে ভীলদের ওই লােকটাকে যত বড়াে ওস্তাদ ভেবেছিল তত বড়াে সে নয়। তার গায়ে হাতির শক্তি ছিল বটে তবে বুদ্ধিতে সে ছিল খাটো। কুত্তির মারপ্যাচ সে কিছুই জানত না। যার ফলে গায়ের জোরে অমরধ্বজকে কাবু করে ছুঁড়ে ফেলতে পারল। প্রচণ্ড শক্তিতে অমরধ্বজের উপর ঝাপিয়ে পড়তে এলে যুবরাজ চট করে সরে গেল। ফলে নীচে পড়ে গেল লােকটা। তৎক্ষণাৎ অমরধ্বজ শক্তি এবং চমৎকার প্যাচের মাধ্যমে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারল। সেখান থেকে। কোনােরকমে উঠে এসে আবার সে অমরধ্বজকে আক্রমণ করল। এবারে আর পারল না। অমরধ্বজ আর এক প্যাচ কষে তাকে আবার ছুঁড়ে ফেলে দিল। সবাই আর একবার হাসতে হাসতে হাততালি দিতে লাগল। ওই ভীল কন্যাও আনন্দে হাততালি দিল। ওদিকে লােকটা মুখ দিয়ে রক্ত তুলে মারা গেল।

ভীল নায়ক তখন অমরধ্বজের কাঁধ চাপড়ে বলল, 'তুমি সত্যিকারের যােদ্ধা। আমাদের মেয়েকে তুমি বিয়ে করতে পার। এখন তােমাদের দুজনের বিয়ে হতে পারে।'

‘আমি আর এই মেয়েকে বিয়ে করব না। আমাকে ফিরে যেতে দাও।' অমরধ্বজ বলল ভীল নেতাকে।

অমরধ্বজের কিছু দূর যাওয়ার পর আবার ওরা সবাই তাকে ঘিরে ফেলল। ওদের নায়ক বলল, 'দেখ ভাই, তুমি যাকে ছুঁড়ে মেরে ফেললে সেই লােকটাই এই মেয়েটাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। অন্য যারা চেয়েছিল তাদের অনেককেই সে হয় শােচনীয়ভাবে মারধাের করেছে নয় মেরে ফেলেছে। এই কথা তােমাকে জানানাে প্রয়ােজন বােধ করছি। আচ্ছা, এখন তুমি যেতে পার।' বলল ভীল নায়ক।

ভীল নায়কের কথার পরে ওরা সবাই সরে গিয়ে তার যাওয়ার পথ ছেড়ে দিল। তখন অমরধ্বজ বলল, 'আমি এখন যাব না। আমি এই মেয়েকেই বিয়ে করব।'

ভীল নায়ক ওদের দুজনের বিয়ে দিয়ে ওই মেয়েকে অমরধ্বজের সঙ্গে তার দেশে পাঠিয়ে দিল।

বেতাল এই কাহিনি বলে বিক্রমাদিত্যকে বলল, ‘রাজা, অমরধ্বজ একবার বিয়ে করতে চাইল আবার বিয়ে করতে গররাজি হল কেন? সে কি ভেবেছিল যে তাকে যেতে দিয়ে পিছন দিক থেকে তাকে আক্রমণ করে মেরে ফেলবে? মৃত্যুভয়ে সে বিয়ে করতে রাজি হল? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বিক্রমাদিত্য জবাবে বললেন, ‘ওই ভীল কন্যাকে বিয়ে করতে হলে এক পশুশক্তির মােকাবিলা করতে হবে জেনেই অমরধ্বজের মনে তাদের আক্ষ্ম চারবিচারের প্রতি অশ্রদ্ধা জেগেছিল। তখনই সে ঠিক করে ফেলেছিল বিয়ে করবে না। মেয়েটির ভাবী বরের মৃত্যুতেও হাসতে হাসতে হাততালি দেওয়া তার ভালাে লাগল না। তবু অমরধ্বজ তাকে বিয়ে করতে রাজি হওয়ার কারণ হল মেয়েটার ভাবী বরকে সে হত্যা করেছে। বীরকে ওই মেয়েটা বিয়ে করতে চায়। তার কপালে আর বীর নাও জুটতে পারে। তাই যুবরাজ আর একবার ভেবে নিজের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করল এবং ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চাইল।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মৌনভাব ভঙ্গ করার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে আবার সেই গাছে গিয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
গোড়ার কথা
২.
হেরফের
৩.
অন্যায় শাস্তি
৪.
বন্ধুত্ব
৫.
শাসক
৬.
চোরের সম্মান
৭.
সাধনা
৮.
রাক্ষস বিবাহ
৯.
প্রাণদান
১০.
পিতার ধর্ম
১১.
গরিবের দম্ভ
১২.
পরিবর্তন
১৩.
ঘুমন্ত রাক্ষস
১৪.
জনতার শক্তি
১৫.
ধর্মস্থাপনা
১৬.
প্রদর্শনী
১৭.
বিজয় চিহ্ন
১৮.
হারানাে সুযােগ
১৯.
কথা না রাখা
২০.
আসল কারণ
২১.
দেবতার রাগ
২২.
পুরুষদ্বেষিণী
২৩.
পরিবেশের প্রভাব
২৪.
মনের পরিবর্তন
২৫.
পরিশ্রমের ফল
২৬.
বন্ধুবিচ্ছেদ
২৭.
রাজকুমার
২৮.
সােনার অলংকার
২৯.
পর্দার আড়ালে
৩০.
বাপের ব্যাটা
৩১.
চোর ধরা
৩২.
যার ভাগ্যে যা
৩৩.
জ্যান্ত পিশাচ
৩৪.
কর্তব্য
৩৫.
তিন জন তিরন্দাজ
৩৬.
যখন যা হওয়ার
৩৭.
নরক থেকে ফেরা
৩৮.
চোখের ফাঁড়া
৩৯.
কে বড়ো দাতা
৪০.
রূপ লাগি
৪১.
ক্ষত্রিয়ের ধর্ম
৪২.
পরমাসুন্দরী
৪৩.
অযোগ্য ছেলে
৪৪.
বিরূপাক্ষের অবস্থা
৪৫.
গীতার কথা
৪৬.
প্রস্তাব
৪৭.
সাক্ষী
৪৮.
পাত্র বাছাই
৪৯.
সাধুর দণ্ড
৫০.
মণির ফল
৫১.
প্রতিশোধ
৫২.
অবিশ্বাস
৫৩.
বন্দি মুক্তি
৫৪.
সাধুর কৌটো
৫৫.
নকল সুধীর
৫৬.
পরিবর্তন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%