ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য আবার ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, অবস্থার যতই পরিবর্তন হোক না কেন তুমি কিন্তু তোমার প্রতিজ্ঞা ছেড়ো না। কারণ তপস্যার সিদ্ধিলাভের মুখে তা ছেড়ে ওঠায় বিরূপাক্ষের যে কী মারাত্মক অবস্থা হয়েছিল তা কল্পনা করা যায় না। বিরূপাক্ষের কাহিনি আগাগোড়া শুনলে তোমার কাছে সব কিছু পরিষ্কার হবে। শুধু তাই নয়, আমার কাহিনি শুনলে তোমার এই পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল
বিরূপাক্ষ ছিল কাশীর যুবক। তার আপনজন বলতে কেউ ছিল না। বাচ্চা বয়স থেকেই সে অনাথ ছিল। যৌবনে পা দেবার মুখে তার মনে ক্রমশ বৈরাগ্যের ভাব জাগল।
তার এই ভাব জাগার পর সে আর সাধারণ মানুষের সঙ্গে থাকতে পারল না, চলে গেল হিমালয়ে তপস্যা করতে।
টানা দু-বছর তপস্যা করার পর এক তাপস তার কাছে এসে তাকে বলল, 'বিরূপাক্ষ, তুমি কি মুক্তির জন্য তপস্যা করছ? যদি তাই করে থাক তবে মনে রেখো তপস্যা করতে বসার আগে, মোক্ষলাভ চাইতে বসার আগে কিছুটা প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা দরকার। চোখ কান বুজে বসে পড়লে, মোক্ষলাভ চাওয়ার আগে, যে জ্ঞান দরকার সেই জ্ঞান তোমার হবে কোত্থেকে? জ্ঞানলাভের জন্য দেশভ্রমণ দরকার। তাই তোমার উচিত এখন দেশভ্রমণ করা।' বলে ওই তাপস অন্তর্হিত হল। বিরূপাক্ষ চারদিকে তাকিয়ে দেখল। কাউকে দেখা গেল না। তার কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।
তখন বিরূপাক্ষ বুঝল তাকে কোনো সিদ্ধপুরুষ উপদেশ দিয়ে গেছে।
তৎক্ষণাৎ বিরূপাক্ষ উঠে পড়ল। দেশভ্রমণ করতে সে বেরিয়ে পড়ল। বহুদিন ধরে, বহু দেশ ঘুরে, বহু জ্ঞানী মানুষের সাহচর্য সে লাভ করল। ঘুরতে ঘুরতে সে পৌঁছাল অবন্তীনগরে। নগরে ঢুকেই সে সুন্দর এক উদ্যান দেখতে পেল। ক্লান্ত বিরূপাক্ষ গাছের নীচে কিছুক্ষণ বসল। পরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙার পর বিরূপাক্ষ দেখতে পেল তার চারদিকে দাসীরা রয়েছে। ওদের হাতে ফুল, ফল, চন্দন ইত্যাদি। ওরা তাকে রাজকুমারীর কাছে নিয়ে যেতে চাইল। ওদের অনুরোধ শুনে বিরূপাক্ষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তোমাদের রাজকুমারী আমাকে ডাকছে কেন?'
ওরা বিরূপাক্ষকে বলল
'আমাদের রাজকুমারী খুব ভালো চিত্রশিল্পী। এই উদ্যান তারই মনের মতো তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যানে পায়চারি করার সময় তিনি আপনাকে দেখতে পেয়েছিলেন। তার ইচ্ছা হয়েছে আপনার ছবি আঁকার। তাই তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আপনার ঘুম ভাঙার পর তাঁর কাছে নিয়ে যেতে। আমরা আপনাকে রাজকুমারীর কাছে নিয়ে যেতে চাই। আপনি অনুগ্রহ করে চলুন।'
সামনে দাঁড়িয়ে রাজকুমারীর দাসীরা এমনভাবে বলল যেন না গেলে ওরা বিরূপাক্ষকে তুলে নিয়ে যাবে।
বিরূপাক্ষ ওদের সঙ্গে রাজকুমারীর কাছে গেল। রাজকুমারী ছিল অসাধারণ রূপবতী। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিরূপাক্ষ তার কাছে নিজের পরিচয় জানাল।
পরে বিরূপাক্ষের ছবি আঁকল রাজকুমারী। ছবি আঁকতে অনুমতি দেওয়ায় বিরূপাক্ষকে সেই রাত্রে অতিথি হিসাবে থাকার জন্য রাজকুমারী অনুরোধ করল। বিরূপাক্ষ ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করল। সে মনের মতো আহার খেয়ে হংস খাটের নরম বিছানায় ঘুমোল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হল। বিরূপাক্ষের যখন গভীর ঘুম তখন স্বপ্নে দেখা দিল সেই তাপস, যে হিমালয়ে বিরূপাক্ষকে উপদেশ দিয়েছিল। তাপস বলল, 'বিরূপাক্ষ, তোমার জীবনের এখন এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ। তোমার ভাগ্য খুলে গেছে। তবে এখনি তোমাকে একটা কথা বলি, এই রাজকুমারীর মতো এত ভালো অর্ধাঙ্গিনী তুমি আর জীবনে পাবে না।'
'তার মানে? আপনি কী বলছেন?' বিরূপাক্ষ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
'পাগল কোথাকার! তুমি বুঝতে পারছ না রাজকুমারী তোমাকে কত ভালোবাসে। সে তো কালকেই তার বাবাকে মনের কথা জানাবে। তার বাবা রাজি হয়ে গেলেই আর কোনো বাধা থাকবে না। তাকে দেখে তুমিও তো মুগ্ধ হয়েছ।' বলে তাপস অদৃশ্য হল। তার অদৃশ্য হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বপ্ন ভেঙে গেল।

বিরূপাক্ষ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। বুঝল সেটা স্বপ্ন। কিন্তু তাপসের কথা তার কানে তখনও বাজছিল। সেই গভীর রাত্রে সে বেরিয়ে পড়ল পথে। তাড়াতাড়ি হেঁটে এগিয়ে গেল সে নিজের পথে।
ভোরে সে পৌঁছাল ছোট্ট গ্রামে। গ্রামে ঢোকার মুখেই সে দেখতে পেল এক কুঁড়ে ঘর। কুঁড়ে ঘরের সামনে ছিল এক গাছ। ওই ঘরে ছিল এক বুড়ি। বিরূপাক্ষ ওই কুঁড়ে ঘরের কাছে গিয়ে বুড়িকে জল চাইল মুখ ধোওয়ার জন্য।
বুড়ি তৎক্ষণাৎ হেঁকে বলল, 'সত্যবতী কে জানি এসেছে। তাড়াতাড়ি এক ঘটি জল দিয়ে যাও।'
এক যুবতী এক ঘটি জল নিয়ে হাতড়ে হাতড়ে এসে বাইরে রেখে আবার দেয়াল ধরে ধরে চলে গেল।
বিরূপাক্ষ বুড়িকে বলল, 'দিদিমা, এ কি আপনার নাতনি? তার হাঁটা ওরকম কেন? একটু যেন কম দেখে?'
'সত্যবতী জন্ম থেকেই অন্ধ বাবা। তার মা-বাবা নেই। সংসারে আমি ছাড়া তার আর কেউ নেই। আমি মরে গেলে ওর অবস্থা যে কী হবে তা কে জানে!' বলে বুড়ি চোখের জল মুছতে লাগল।
বিরূপাক্ষের মন কেঁদে উঠল। সেই অন্ধ মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে যাওয়া ঠিক করল সে।
সেই রাত্রে বিরূপাক্ষ স্বপ্ন দেখল সেই তাপসকে। বিরূপাক্ষ তাকে বলল, 'হে তাপস, আমি ঠিক করেছি অন্ধ সত্যবতীকে বিয়ে করব। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।'
তৎক্ষণাৎ তাপস 'তথাস্তু' বলে অদৃশ্য হল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, আমার কয়েকটি প্রশ্ন মনে জেগেছে। বিরূপাক্ষ তপস্যায় বসেছিল। তাকে তপস্যা থেকে তুলে তাপস দেশভ্রমণে পাঠাল কেন? যে তাপস নিজে বিরূপাক্ষকে উপদেশ দিয়েছিল রাজকুমারীকে বিয়ে করতে। সেই আবার এক অন্ধ অনাথ মেয়েকে বিরূপাক্ষ বিয়ে করতে চাইলে আশীর্বাদ করল কেন? বিরূপাক্ষই বা রাজকুমারীকে বিয়ে করতে রাজি হল না কেন? রাতারাতি পালাল কেন? আবার অন্ধ মেয়েকেই বা বিয়ে করল কেন? আমার এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তবে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
রাজা বিক্রমাদিত্য বেতালের প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'তপস্যা করার সময় বিরূপাক্ষের মনে কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কোনো কিছুর যদি আকাঙ্ক্ষা না থাকে তবেই মোক্ষলাভ সম্ভব হয়। তাপস ছিল বিরূপাক্ষেরই আকাঙ্ক্ষার বাইরের রূপ। আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মোক্ষলাভের অনুকূল হয়। নাও হতে পারে। রাজকুমারীকে বিয়ে করলে বিরূপাক্ষের মোক্ষলাভ হয়তো কোনোদিনই হত না। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ বিরূপাক্ষের মনে তেমন কোনো লোভ বা আকাঙ্ক্ষা ছিল না। সত্যবতীকে বিয়ে করে সে সাংসারিক কাজকর্মের কিছু অভিজ্ঞতাও লাভ করবে। লোভ যদি না থাকে, মোহের জালে যদি বাঁধা না পড়ে, যে কোনোদিন বিরূপাক্ষের মতো মানুষ আবার তপস্যায় বসতে পারে মোক্ষলাভ করতে পারে। তাপস এই আশা পোষণ করেই আশীর্বাদ করল।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন