ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছােড়বান্দা বিক্রমাদিত্য আবার গেলেন ওই গাছের কাছে, গাছ থেকে শব নাবিয়ে কঁাধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা তােমার কাছে এটা হয়তাে একটা বিরাট পরীক্ষার মতাে লাগছে। কিন্তু মনে রেখাে, পরীক্ষা দিলেই যে তুমি সুফল পাবে তার কোনাে মানে নেই। উদাহরণস্বরূপ তােমাকে নারায়ণ ভট্টের কাহিনি শােনাচ্ছি। এই কাহিনি শুনলে তােমার পরিশ্রম অনেকখানি কমে যাবে।' বলে বেতাল তার কাহিনি শুরু করল :
প্রাচীন কালে কাশ্মীর দেশে নারায়ণভট্ট নামে এক পণ্ডিত ছিলেন। সমস্ত শাস্ত্রে তার পাণ্ডিত্য ছিল গভীর। তার একবার ইচ্ছে জেগেছিল নানান দেশে ঘুরে সমস্ত পণ্ডিতের সঙ্গে তর্ক করে বিজয়ী হওয়ার।
একের-পর-এক দেশে তিনি ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। প্রত্যেক দেশের পণ্ডিতদের সঙ্গে তর্ক করে জয়ী হয়ে বহু উপহার সংগ্রহ করেছিলেন। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি কলিঙ্গ দেশে এলেন।
কলিঙ্গ দেশের এক অঞ্চলে কমলামণি নামে এক বিদুষী মহিলা ছিলেন। তিনিও সমস্ত শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। বিদুষী মহিলা ঘােষণা করেছিলেন, যিনি তাঁকে পরাজিত করবেন, তাঁকেই তিনি বিয়ে করবেন। আর যদি কোনাে পণ্ডিত ওই মহিলার কাছে পরাজিত হন তাহলে তাকে ওই মহিলার পায়ে প্রণাম করে যেতে হবে।
এর আগে বহু যুবক পণ্ডিত কমলামণির সঙ্গে তর্কে পরাজিত হয়ে তাঁকে প্রণাম করে বাড়ি ফিরে গেছে।
কলিঙ্গ দেশে পা রেখেই নারায়ণ ভট্ট কমলামণির নাম শুনেছিলেন। কমলামণি যে অঞ্চলে থাকতেন, সে অঞ্চলের এক প্রান্তে এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন নারায়ণ ভট্ট।

খেয়ে উঠে নারায়ণ ভট্ট কমলামণির বাড়িতে গিয়ে তাকে খবর দিলেন। তিনি যে তাঁর সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হতে এসেছেন সে ইচ্ছাও তিনি লােক মারফত জানিয়ে দিলেন। খবর পেয়েই কমলামণি নারায়ণ ভট্টকে আহ্বান জানিয়ে, তাকে অন্য ঘরে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে নিজে পাশের ঘরের পর্দার আড়ালে বসলেন।
নারায়ণ ভট্ট নিজের আসনে বসার পর কমলামণি পর্দার আড়াল থেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি আমার প্রতিজ্ঞার কথা শুনেছেন?’
‘আপনার মুখেই শুনতে চাই।' নারায়ণ ভট্ট বললেন।
‘আপনি পরাজিত হলে আমার পায়ে প্রণাম করে যেতে হবে। আর আমি পরাজিত হলে আপনি আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য থাকবেন। এই শর্তে রাজি থাকলে আমি আপনার সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হতে পারি।' কমলামণি বললেন।
‘আমি পরাজিত হলে নিশ্চয়ই আপনার পায়ে প্রণাম করব। আর আপনি পরাজিত হলে, আপনাকে বিয়ে করার বিষয়ে আমাকে একাধিক কারণে বিচার করে দেখতে হবে। আমি আপনার পায়ে অতি সহজেই প্রণাম করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি কিন্তু বিয়ে করার ব্যাপারে আমাকে ভেবে দেখতে হবে।' নারায়ণ ভট্ট বললেন।
কমলামণি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, 'ঠিক আছে, তাই হােক।'
কমলামণি ও নারায়ণ ভট্টের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে বিভিন্ন বিষয়ের উপর তর্ক চলতে লাগল। তারপর শুরু হল বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তরের পালা। কমলামণির প্রশ্নের জবাব দেন নারায় ভট্ট। নারায়ণ ভট্টের প্রশ্নের জবাব দেন কমলামণি। নারায়ণ ভট্ট বহু জটিল প্রশ্ন করলেও কমলামণি খুব সহজেই সেইসব প্রশ্নের জবাব পর পর দিয়ে যেতে লাগলেন। এইভাবে অনেকক্ষণ প্রশ্ন ও উত্তরের পালা কেটে যাওয়ার পর নারায়ণ ভট্ট জিজ্ঞেস করলে, ‘আপনি কার কাছে শিক্ষালাভ করেছেন?’
'আমার বাবার কাছেই শিখেছি।' কমলামণি বললেন।
‘আপনার বয়স কত?’ নারায়ণ ভট্ট প্রশ্ন করলেন।
‘বাইশ।' কমলামণি বললেন।
‘আপনি এভাবে পর্দার আড়াল থেকে জবাব দেন কেন?’ নারায়ণ ভট্ট বললেন।
‘এটা আমার পদ্ধতি।' কমলামণি বললেন।
নারায়ণ ভট্ট কিছুক্ষণ ভেবে তালপাতায় একটি শ্লোক লিখে পর্দার ওপারে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, 'এই শ্লোকের অর্থ বলুন।'
কমলামণি পরক্ষণেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। কয়েক মুহর্ত পরে কমলামণি বললেন, 'আমি হেরে গেছি। আমাকে বিয়ে করুন।'
নারায়ণ ভট্ট নিজের আসন থেকে উঠতে উঠতে বললেন, 'তা অসম্ভব। আপনাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।'
তারপর নারায়ণ ভট্ট চলে গেলেন।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, ‘রাজা, কমলামণি পরাজিত হওয়াতে নারায়ণ ভট্ট তাকে বিয়ে না করে চলে গেল কেন? আমার এ প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তােমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
বিক্রমাদিত্য জবাবে বললেন, 'নারায়ণ ভট্ট কমলামণিকে পরাজিত করতে পারেননি। উনি শুধু তাঁর পর্দার আড়ালে থাকার কারণ আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কমলামণি অন্ধ। যিনি মুখে মুখে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন, তিনি একটি শ্লোকের অর্থ জানেন না। এ হতে পারে না। এর কারণ আবিষ্কারের জন্যই তিনি কমলামণির বয়স ও শিক্ষক সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। বাবাই গুরু হওয়াতে মেয়ে যে অন্ধ তা বাইরের লােকের কাছে প্রকাশ পায়নি। নারায়ণ ভট্টের চলে যাওয়ার কারণ দুটো হতে পারে। প্রথম, তিনি হয়তাে ভেবেছিলেন, কমলামণিকে পরাজিত করা যাবে না। দ্বিতীয়, তিনি হয়তাে অন্ধ মহিলাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাননি।'
রাজার এইভাবে মুখ খােলার সাথে সাথে বেতাল শব নিয়ে আবার ওই গাছে গিয়ে উঠল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন