আলপনা ঘোষ
নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার খেতে বসে তাঁর প্রিয় বয়স্য গোপাল ভাঁড়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কী দিয়ে প্রথমে খাওয়া শুরু করা উচিত। উত্তরে গোপাল রাজাকে আগে ‘পোড়া’ খেতে বললেন কারণ তাঁর মতে ‘পোড়া-মুখে’ সব ভাল লাগবে। গোপাল একথা রহস্য করে বলে থাকলেও, কথাটা কিন্তু হেসে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। আদিম যুগে মানুষ কিন্তু সর্বপ্রথম পুড়িয়ে ছাড়া রান্না করার অন্য কোনও প্রক্রিয়া জানত না।
শাক, তরকারি, মাছ, মাংস উনুনের মধ্যে গরম ছাইয়ের ওপরে বা জ্বলন্ত কাঠের আগুনের ওপরে ধরে উলটে পালটে ঝলসানোকে পোড়া বলা হত। আজকাল অবশ্য গ্যাসের আগুনের উপরে চাটু বসিয়ে বা বৈদ্যুতিক উনুনে পোড়াবার নানা আধুনিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
পোড়াবার সময় পোড়াবার বস্তুতে নুন, ঝাল, তেল মেখে পুড়িয়ে তার পরে তা খাবার রীতি ছিল। এখন অবশ্য পোড়ানোর পরে নানাবিধ মশলা ইত্যাদি মেখে তাকে আরও স্বাদু করা হয়ে থাকে। স্থল বিশেষে পোড়াবার বস্তুটিকে আবার কলাপাতা বা অন্য কোনও শাকপাতাতে জড়িয়ে পোড়ানো হয়ে থাকে।
নিরামিষ পোড়ার মধ্যে বেগুন পোড়ার কথা সবাইয়ের জানা। বড় মাপের বেগুনের গায়ে ফুটো করে এক ছেঁদায় একটি রসুনকোয়া, অন্য ছেঁদায় একটি কাঁচালঙ্কা পুরে তেল মাখিয়ে পুড়িয়ে নিতে হয়। এবারে পোড়া অংশ বাদ দিয়ে বেগুনের শাঁসের মধ্যে কাঁচা সরষের তেল, কাঁচালঙ্কা কুচি, নুন, পেঁয়াজকুচি মেখে নিলে তা দিয়ে খাওয়া যায় এক থালা ভাত।
‘বরেন্দ্র রন্ধন’ গ্রন্থে লেখিকা কিরণলেখা রায় আমিষ-নিরামিষ প্রায় দশটি পোড়া পদের উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে মটরডাল পোড়া, ইলিশ মাছ পোড়ার পদ শুধু অভিনব নয় অনবদ্যও বটে। মটরডাল পোড়াতে সারারাত ডাল জলে ভিজিয়ে পাটাতে শুকনো শুকনো করে বেটে দলা পাকিয়ে কলাপাতায় বেঁধে পুড়িয়ে সরষের তেল, নুন ও কাঁচালঙ্কা মেখে ভাতের সঙ্গে খেতে চমৎকার।
কেউ কেউ আবার মটরডালবাটার সঙ্গে সরষেবাটা, নারকেল কোরাবাটা ও নুন মিশিয়ে ওপরে নীচে কলাপাতা দিয়ে তাওয়ার ওপরে চাপড়ি আকারে পুড়িয়ে নেন।
বিপ্রদাস তাঁর ‘পাক প্রণালী’ গ্রন্থে ‘পটল পোড়া’র উল্লেখ করেছেন। আস্ত পটলের মাঝখানটা চিরে জ্বলন্ত কয়লার উপরে বসিয়ে পোড়াতে হয়। পাকা পটল হলে তেল, নুন মাখিয়ে নিলেই তা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কচি পটল পোড়ায় কিন্তু স্বাদ তত খোলতাই হয় না।
ইলিশমাছ পোড়াতে মাছের পেটিতে তেল, নুন, হলুদ, সরষে ও কাঁচালঙ্কাবাটা ভাল করে মেখে একটি লোহার তাওয়াতে দু’-তিন পরত কলার পাতা বিছিয়ে তার ওপরে মাখা মাছগুলি সাজিয়ে দিতে হবে। অপর একটি কলাপাতা দিয়ে পুরোটা ঢেকে তার ওপরে আর একটি তাওয়া দিয়ে জ্বলন্ত কয়লা রেখে খানিকক্ষণ পুড়িয়ে নামিয়ে নিলেই রান্না শেষ। এই পদ্ধতির রান্নাকে আবার পাতুরি বলা হয়ে থাকে।
ইউরোপীয় রান্নায় সেদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান খাদ্য। মাছ এবং সবজি ওঁরা সাধারণত সেদ্ধ খেতেই পছন্দ করেন। তবে যাই সেদ্ধ করুন না কেন, তা ওঁরা মাছ বা মাংসের সুরুয়াতে সেদ্ধ করে মাখন বা সুইট অয়েল, ভিনিগার, নুন, সাদা সরষে গুঁড়ো, গোলমরিচগুঁড়ো, ডিমের হলুদ অংশ প্রভৃতি মিশ্রণে বিভিন্ন প্রকারের সস তৈরি করে তা সবজি ও মাছের সঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে থাকেন।
প্রাচীন কালে হিন্দু বিধবাদের মূল খাদ্যের মধ্যে ছিল আতপ চালের ভাত, সৈন্ধব লবণ, মুগ, মটর ডাল বা কাঁচকলা, আলু ঝিঙে সেদ্ধ। প্রায় স্বাদহীন এই খাদ্যবস্তুর সঙ্গে ঘি বা কাঁচা তেল ও কাঁচালঙ্কা যোগ হলে তাঁদের হাতের গুণে তাই হয়ে উঠত অমৃত। পুজো আর্চা, ব্রত উদযাপন ইত্যাদিতে হিন্দু সধবাদেরও আমিষ খাওয়া বারণ ছিল। সেদিনটিতে তাঁরাও ঘি-ভাত ও সেদ্ধ সবজি দিয়ে তাঁদের ব্রত ভাঙতেন। মঙ্গলচণ্ডী ব্রত শেষে আমার ঠাকুমাকে দেখেছি মিষ্টি কুমড়ো, আলু, বেগুন, মিঠে আলু সেদ্ধ করে তাতে নুন, লঙ্কা ও তেল বা সুগন্ধী গাওয়া ঘি দিয়ে মেখে খেতে।
আমিষ সেদ্ধর মধ্যে ইলিশমাছ কুমড়ো পাতার সঙ্গে সেদ্ধ করে নুন, কাঁচালঙ্কা, সরষেবাটা ও বেশি পরিমাণ সরষের তেল দিয়ে মেখে গরম ভাত দিয়ে খেতে দারুণ। অতি পুরাতন এক বাংলা রন্ধন প্রণালীর বইতে সেদ্ধ বিভাগে আমি এই প্রণালীটি পেয়েছিলাম।
এই বইটিতে আমিষ সেদ্ধর তালিকাতে আছে পারসে, চিংড়ি, রুই, বাচা এমনকী বড় কই মাছের কথাও। কুচোচিংড়ি দিয়ে লাউশাকসেদ্ধর প্রণালীটি শুধু সহজ নয়, অত্যন্ত স্বাদুও বটে। কুচোচিংড়ি ভাল করে ধুয়ে বেছে রাখতে হবে। এর জন্য চাই কচি এবং টাটকা লাউপাতা। লাউপাতাগুলি ধুয়ে নিতে হবে। একটি লাউপাতা প্রথমে পেতে তার ওপরে অন্য পাতাগুলি সাজিয়ে রাখুন। চিংড়ি অল্প নুন ও হলুদ মেখে লাউপাতার ওপরে রেখে ভাল করে মুড়ে সুতো দিয়ে ঠিক করে বাঁধতে হবে যাতে চিংড়িগুলি বেরিয়ে না যায়। এবারে কড়াইতে জল দিয়ে উনুনে বসান। জল ফুটতে শুরু করলে মাছ বাঁধা পাতাগুলি জলে ছেড়ে দিন। পাতাগুলি সেদ্ধ হলে লাউপাতা, চিংড়ি, কুচোনো কাঁচালঙ্কা, সরষেবাটা, স্বাদ অনুযায়ী নুন ও সরষের তেল দিয়ে চটকে মাখুন। গরম ভাতের সঙ্গে খেতে জমে ভাল। ভাতের ফেন না ফেলে তাতে সেদ্ধ করলে তা আরও স্বাদু হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন