আলপনা ঘোষ
সালটা ১৮৯৫। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার পুত্র এডওয়ার্ড অব ওয়েলস, বেড়াতে এসেছেন প্যারিসে। এক নামী রেস্তোরাঁতে ঢুকেছেন তাঁর বান্ধবীকে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারতে। রাজপুত্রকে দেখে রেস্তোরাঁতে সবাই তটস্থ। সমাদর করে রাজ-অতিথিদের ওই প্রতিষ্ঠানের সেরা, মহার্ঘ, স্বাদু সব পদ পরিবেশন করা হল।
শেষ পাতে মিষ্টিমুখ করাবার ভার পড়ল হেনরি নামের এক তরুণ রাঁধুনির ওপরে, যে ছিল আবার মিঠা ক্রেপ তৈরির কাজে বিশেষ চৌকস।
আগে থেকে তৈরি করা ক্রেপকে কমলালেবুর রস ও লিকরে সিক্ত করে ক্রেপ পাত্রটিকে উনুনে বসাতেই মহা বিপত্তি। হেনরির সামান্য অসাবধানতার কারণেই বোধহয়, ক্রেপে ধরে গেল আগুন। সকলের তো মাথায় হাত। রাজ-অতিথিরা অপেক্ষায় রয়েছেন। উপায়ান্তর না দেখে হেনরি বুক ঠুকে সেই পোড়া-গন্ধওয়ালা ক্রেপই পরিবেশন করলেন।
অবাক কাণ্ড! সেই পোড়া ক্রেপ খেয়ে রাজকুমার মোহিত হলেন আর রাঁধুনিকে অনুরোধ করলেন তাঁর বান্ধবীর নামে ওই ক্রেপের নামকরণ সুজ়েৎ ক্রেপ করতে। আজও খাদ্যরসিক মানুষজনের কাছে সুজ়েৎ ক্রেপের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ক্রেপ নিয়ে এরকম কত গল্প চালু আছে তার ঠিক নেই।
প্যানকেকের জাতভাই এই ক্রেপের জন্ম হয়েছিল ফরাসি দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ব্রিতানিতে। কাঠের চুল্লির গনগনে আঁচে লোহার চাটু বসিয়ে বানানো হত ক্রেপ। সাইডার-এর পাত্রে ডুবিয়ে গরম গরম ক্রেপ খাওয়ার আনন্দে মজে থাকতেন ব্রিতানিবাসী ফরাসিরা। এসব অবশ্য মধ্যযুগের কথা। ফরাসিদের সেই ক্রেপ প্রেম ভিন্ন নামে, ভিন্ন স্বাদে আজ সারা বিশ্ব জুড়ে বহাল।
ফ্রান্সের ২ ফেব্রুয়ারির বিশেষ ছুটির দিন ‘লা শান্দেলিয়’র অপর নাম হল ‘জ্যুর দ্য ক্রেপ’ অর্থাৎ ক্রেপের দিন। কারণ সারা দেশে সেদিন নাকি ক্রেপ খাবার ধুম পড়ে যায়।
ভাগ্যক্রমে একবার আমার প্যারিস ভ্রমণের সময়ে, সেই ব্রিতানিতে বসে ফরাসি বন্ধু ফিলিপের মুখে ক্রেপের জন্ম-বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে এই অসাধারণ পদটি খাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। আবিষ্কার করলাম ক্রেপের স্বাদের মতো, ক্রেপের গল্পও কিছু কম বৈচিত্র্যময় নয়।
ক্রেপের জন্মকালের প্রথম দিকে ব্রিতানিতে ময়দার দাম ছিল বেশ আকাশ ছোঁয়া। সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতার বাইরে। তাই তারা ক্রেপ বানাতে শুরু করে সস্তা দামের বাকহুইট নামক এক ধরনের শস্যবীজ থেকে প্রস্তুত আটা দিয়ে। শুনে আশ্চর্য হবেন যে এই শস্যবীজের গাছ কিন্তু প্রধানত ব্যবহৃত হত ঘোড়া ও মুরগির খাদ্য হিসেবে।
পরিস্থিতির চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে যে বাকহুইট ব্রিতানির মানুষ একদিন ক্রেপ বানানোর প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছিল, পরে তারা বুঝতে পারে ময়দার থেকে বাজরার এই কালো আটা দিয়ে প্রস্তুত নোনতা ক্রেপ আরও বেশি স্বাদু। তাই আজও ব্রিতানির মানুষের কাছে ক্রেপ বানাতে বাকহুইটই কিন্তু অন্যতম প্রধান উপকরণ। প্যারিসের ফ্ল্যাটবাড়িতে ফিলিপকেও দেখলাম ময়দার সঙ্গে বাকহুইট মিশিয়ে ক্রেপ বানাতে। ওঁর মতে ক্রেপে এই বিশেষ আটাটি না পড়লে স্বাদ নাকি জুতসই হয় না।
ক্রেপ রান্নার প্রক্রিয়া নিয়ে আবার নানা সংস্কার আছে ফরাসিদের মধ্যে। ডান হাতের মুঠোয় একটি স্বর্ণমুদ্রা রেখে বাঁ হাতে ক্রেপ রান্না করতে করতে ক্রেপটাকে শূন্যে ছুড়ে দেওয়ার একটা রীতি প্রচলিত আছে ওদের মধ্যে। সেই ক্রেপ যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়ে ঠিকঠাক মতো চাটুর ওপরে এসে পড়ে, তা হলে ফরাসি সাহেব নিশ্চিন্ত। বাকি বছরটা তাদের আর কোনও আর্থিক কষ্ট থাকবে না। এই মজাদার প্রক্রিয়াটি ফিলিপও করে দেখালেন আমাকে। তবে অবশ্যই স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে নয়।
প্রথম দিকে ক্রেপ নাকি ফরাসিরা খেতেন মিষ্টি পদ হিসেবে। পরে ক্রেপের ভেতরে আমিষ, নিরামিষ পুর দিয়ে নোনতা ক্রেপ খাওয়ার চল শুরু হয়।
মিষ্টি ক্রেপে পুর হিসেবে জ্যাম, গলানো চকোলেট, আইসক্রিম, মেপল সিরাপ, কমলালেবু বা পাতিলেবুর রস, নানা ধরনের ফলের কুচি ব্যবহার করা হয়। নোনতা ক্রেপে পুর হিসেবে ফরাসিরা যেমন নানা রকমের মাংস, চিজ় দেন, তেমনি নিরামিষ ক্রেপে যোগ করেন পালংশাক, মাশরুম, আলু, টম্যাটো প্রভৃতি নানাবিধ সবজি দিয়ে রান্না করা স্বাদু সব পুর।
ইতালির পিৎজ়ার মতো আজ অবশ্য ক্রেপের জয়-জয়কার দুনিয়াময়। এই খোদ কলকাতা শহরে তো এখন ক্রেপারির ছড়াছড়ি। সারা দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কলকাতাও এখন ক্রেপ প্রেমে মজে গেছে। শুধু ক্রেপ নয়, ফরাসি খাদ্যের প্রতি ভোজনরসিক বাঙালির আগ্রহ তো কিছু কম নয়।
ক্রেপের রকমফের নানাবিধ খাদ্যের চল কিন্তু এদেশে নতুন নয়। দক্ষিণ ভারতীয় দোসা, বাঙালির অকৃত্রিম পাটিসাপটা, সরুচাকলি পিঠে, চিল্লা প্রভৃতি কিন্তু ফরাসি ক্রেপেরই নামান্তর মাত্র।
আমাদের এই নিজস্ব ক্রেপের কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে আমার ঠাকুমার হাতের সরুচাকলি পিঠের কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটি প্রায় অন্ধকার রান্নাঘরের চিত্র। মাটির উনুনের আগুনের তাপ গায়ে মেখে আমরা নাতিনাতনিরা গোল হয়ে ঠাকুমাকে ঘিরে বসে আছি এক শীতের সকালে। উনুনের ওপরে বসানো গরম তাওয়াতে চালের গুঁড়োর পাতলা মিশ্রণ হাতায় তুলে ঠাকুমা ফেলছেন। স্স্স্স্ করে একটা আওয়াজ যা শুনেই আমাদের জিবে জল। ক্ষিপ্র গতিতে এপিঠ, ওপিঠ করে সেঁকে ধোঁয়া বেরুনো গরম পিঠে পড়ছে আমাদের ছোট ছোট হাতে ধরা পাত্রে আর পাশে বসে থাকা আমাদের মা জননী সোনালি রঙের সুগন্ধী ঝোলা গুড় ঢেলে দিচ্ছেন পিঠের মধ্যে। আহা স্বাদে, গন্ধে অতুলনীয় সেই চাকলি পিঠে আর তার মিঠা স্মৃতি আজও অম্লান।
উত্তর ভারতের বেসনের চিল্লার কথাই ধরুন না কেন! বেসনের মিশ্রণের মধ্যে আদা, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা কুচি, লঙ্কাগুঁড়ো এবং নুন দিয়ে প্রস্তুত এই চিল্লা কোনও অংশে সাহেবদের নোনতা ক্রেপের তুলনায় কম স্বাদু নয়।
তবু আমাদের রসনা শুধু তো দেশি পদে তৃপ্ত নয়। তাই এদেশে ইতালির পিৎজ়ার মতোই ফরাসি ক্রেপের চাহিদা কিন্তু ক্রমবর্ধমান। খোদ কলকাতা শহরেই বেশ কিছু ক্রেপারিজ় আছে যার মান এতই ভাল যে বিদেশি পর্যটকরাও কলকাত্তাইয়া ক্রেপ খেয়ে মুগ্ধ হন।
ফরাসি ক্রেপ সুজ়েটের ধাঁচে আমাদের এক কলকাতাবাসী বাঙালি শেফ ‘ক্রেপ সুজাতা’ বানিয়ে ফেলে এই শহরে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। এই ক্রেপে তিনি ব্যবহার করেছেন আমের পাঁপড়, আম ও লেবুর রস। মহারাষ্ট্রের রান্নার অনুসরণে তাঁর বানানো ‘প্রন থেচা ক্রেপ’-ও যথেষ্ট স্বাদু।
আজকের পর্ব শেষে থাকছে চিংড়িমাছের পুর দেওয়া এক সহজ ঘরোয়া ক্রেপের প্রণালী।
ক্রেপের মিশ্রণ করতে লাগবে সম পরিমাণ দুধ ও ময়দা। কেউ কেউ আবার মিশ্রণ পাতলা করতে দুধের মধ্যে জল মিশিয়ে নেন। দুধ ময়দার মিশ্রণে ডিম, নুন ও মাখন যোগ করে ভাল করে ফেটিয়ে ঘণ্টাখানেক ফ্রিজে রেখে দিন।
একটি পাত্রে পরিমাণ মতো মাখন দিয়ে তাতে মিহি করে কুচোনো গাজর, টম্যাটো, ক্যাপসিকাম ও চিংড়ি দিয়ে নাড়ুন। নুন, গোলমরিচ দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রাঁধুন। পেঁয়াজশাক ও সেলারি পাতা দিন। পুরো জিনিসটা মাখো মাখো হয়ে এলে নামিয়ে নিন। একটি ননস্টিক পাত্রে সামান্য মাখন দিয়ে গরম করুন। এবারে এতে ক্রেপের পাতলা মিশ্রণ ঢালুন। এক দিক ভাজা হলে উলটে দিন। ক্রেপ দু’দিক ভাজা হলে, মাপ মতো পুর দিয়ে ভাঁজ করুন। ইচ্ছে হলে প্রতিটি ক্রেপের ওপরে একটি করে ডিমের পোচ রেখে পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন