আলপনা ঘোষ
বাঙালির তেলেভাজার গল্প হবে আর চপ, কাটলেট এবং ফ্রাইয়ের গল্প হবে না তা আবার হয় নাকি? আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগে গৃহস্থের বাড়িতে এসব খাবার বানানোর তেমন চল ছিল না। বাড়ির কর্তারা তাই জিভের স্বাদ মেটাতে অ্যালেনের কিচেন, চাচার হোটেল প্রমুখ ভোজনশালায় হানা দিতেন। রমরমিয়ে চলত চপ কাটলেটের সাদামাঠা এই দোকানগুলি।
উত্তর কলকাতার ওরিয়েন্টাল ইস্কুলের কাছে অ্যালেন মার্কেটে ‘অ্যালেন্স কিচেন’ খুলেছিলেন জীবনকৃষ্ণ সাহা। একশো বছরের পুরানো এই চপ কাটলেটের দোকানের খ্যাতি তাদের পাতলা ভেটকির কাটলেট আর ‘প্রন কাটলেট’ নিয়ে। গত শতকের আটের দশক থেকে অবশ্য তাদের ঠিকানা শোভাবাজার। অ্যালেনের প্রন কাটলেটের ভক্ত ছিলেন সেসব দিনের ছায়াছবি ও গানের জগতের রথী, মহারথীরা। সে যুগের মন্ত্রী, আমলারাও বাদ যাননি এই ভক্তদল থেকে।
সারা বছরই অ্যালেনের কিচেনে চিংড়ির কাটলেটের দারুণ চাহিদা। দোকানের দৈন্যদশা কিন্তু ভক্তকুলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। বিকেলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না পৌঁছোলে কিন্তু কাটলেট শেষ। এতই জোরালো এর চাহিদা। কিচেনের কর্তার কথা অনুযায়ী তাঁরা বাছাই করা সেরা মাছ দিয়ে কাটলেট বানান। এ ব্যাপারে তাঁরা কোনও সমঝোতা করেন না। আর কাটলেটের মশলাটি তাঁরাই নিজেরা বানান। এটাই এ বাজারে তাঁদের টিকে থাকার গোপন কথা।
ও পাড়ার আর এক বিখ্যাত ‘চাচার দোকান’-এর ফাউল কাটলেটের বেজায় নামডাক। হেদোর কাছে এই ভোজনশালাটির বয়স কিন্তু কম নয়। কম করে পঞ্চাশ-ষাট বছর তো হবেই। একসময়ে নাকি একটি ফাউল কাটলেটের দাম ছিল চার আনা। এই কাটলেটের বৈশিষ্ট্য ছিল এর স্বাদ। থুড়ে নেওয়া মুরগির মাংস পেঁয়াজ-আদা-রসুনের রসে সিক্ত করে ডিমের আস্তরণে ডুবিয়ে তা ভাজা হত। ওঁরা নাকি বিস্কুটের গুঁড়ো একেবারেই ব্যবহার করতেন না এই কাটলেটে।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে ডিউক রেস্তোরাঁর কথাই বা কে না জানে! এখানে আবার আড্ডা জমাতে আসতেন নামী সব সাহিত্যিকেরা যাঁদের মধ্যে শিবরাম চক্রবর্তী থেকে শুরু করে বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী প্রমুখের নাম করতেই হয়। ডিউকের হাতে গড়া গরম রুটির সঙ্গে মেটে কষার কোনও তুলনা নেই। ওদের আর একটি বিশেষ পদ হল মাংসের পুর ভরা মাছভাজা।
দক্ষিণ কলকাতাতে চপ কাটলেটের ব্যবসায়ে এগিয়ে আছেন রাধুবাবু আর পাঁচুবাবুরা। লেক মার্কেটে রাধুবাবু আর খিদিরপুরে পাঁচুবাবু। রাধুবাবুর দোকান শুরু হয়েছিল আজ থেকে সাত-আট দশক আগে। দোকানের নাম রাধাকিশোর দত্তের নামে যিনি এ দোকানের প্রতিষ্ঠাতাও বটে। আজও লেকে প্রাতর্ভ্রমণ সেরে ফেরার পথে বা দোকানের গা-লাগোয়া বাজারে ঢোকার আগে অনেক বাঙালিবাবুর এ দোকানের চায়ে চুমুক না দিলে চলে না। প্রায় একই পাড়ার বাসিন্দা কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সে যুগের নামকরা গায়ক সুধীরলাল চক্রবর্তী, শ্যামল মিত্রের মতো নামী মানুষেরা ছিলেন রাধুবাবুর দোকানের বাঁধা খদ্দের। উত্তমকুমারের পরিবারও ছিলেন এই ঠেকটির মস্ত পৃষ্ঠপোষক। এঁদের পছন্দ ছিল যেমন চায়ের সঙ্গে পাঁউরুটি টোস্ট, ঘুঘনি তেমনি পছন্দ ছিল ফিশ বা মাটন কবিরাজি কাটলেট, স্বাদু বাগদা দিয়ে তৈরি প্রন কাটলেট। আজও এ দোকানের খাবারের গুণগত মানে একটুও ভেজাল মেশেনি।
খিদিরপুরের পাঁচুবাবুর দোকান খুলেছিলেন পাঁচুবাবু স্বয়ং সেই চল্লিশের দশকে। ওঁদের দোকানের ব্রেজড কাটলেট, চিকেন ফ্রাই কী কবিরাজি কাটলেটের জবাব নেই যেমন জবাব নেই ওঁদের সুগন্ধী স্বাদু চায়ের।
উত্তর কলকাতার আর এক নামী চপ কাটলেটের ঠেক হল ‘মিত্র কাফে’। ওঁদের চিংড়ির কাটলেটের মস্ত ভক্ত ছিলেন উত্তমকুমার। সেই চিংড়ি কাটলেটের রেসিপি দিয়ে ইতি টানছি এই পর্বে।
উপকরণ: চিংড়ি, আদাবাটা, পেঁয়াজবাটা, সাদা ভিনিগার, টম্যাটো কেচাপ, পুদিনাপাতা বাটা, ডিম, ময়দা, বেসন, কর্নফ্লাওয়ার, নুন, চিনি।
প্রণালী: চিংড়ি ধুয়ে, বেছে একটু থুড়ে রাখুন। পেঁয়াজ, আদাবাটা, পুদিনাপাতাবাটার সঙ্গে ভিনিগার ও টম্যাটো কেচাপ মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে চিংড়িগুলি এতে ভিজিয়ে রাখুন। এবারে ফেটানো ডিম, ময়দা, বেসন, কর্নফ্লাওয়ার, সামান্য নুন ও চিনির আর একটি মিশ্রণ তৈরি করে তাতে মশলামাখা চিংড়ি ডুবিয়ে ডোবা তেলে ভাজুন আর গরম গরম পাতে ফেলুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন