এ বঙ্গের মিষ্টি

আলপনা ঘোষ

ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলার মিষ্টিকে ভাগ করেছেন দুই ভাগে। প্রথম ভাগে আছে একক উপাদানে তৈরি মিষ্টি যাতে গুড় বা চিনির সঙ্গে আর কিছু মেলানো থাকে না— যেমন গুড় বা চিনির চাকতি, পাটালি, বাতাসা, ছাঁচ ইত্যাদি। দ্বিতীয় ধরনের মিষ্টিকে আবার আরও দু’ ভাগে ভাগ করা যায়। গুড় বা চিনির সঙ্গে দুগ্ধজাত কোনও উপকরণ ছাড়া অন্য দ্রব্য সহযোগে প্রস্তুত মিষ্টি যেমন মুড়ি, চিঁড়া, খইয়ের নানাবিধ মোয়া এবং নারকেল, তিল এসবের নাড়ু। দুগ্ধজাত দ্রব্যযোগে তৈরি আরেক ধরনের মিষ্টি যা মিষ্টিপ্রিয় বাঙালি সুপরিচিত। চিনির সঙ্গে ছানার সংযোগে তৈরি হয় সন্দেশ ও মন্ডা।

বৈদিক যুগে দুধ ও দুধ থেকে তৈরি দধি, মাখন ইত্যাদি ছিল দেবভোগ্য। বিশেষ করে ননি ও মাখন অতি প্রিয় ছিল নাকি শ্রীকৃষ্ণের। এই জন্য দুগ্ধজাত খাদ্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হত।

নানাবিধ পিঠের প্রচলন ছিল প্রাচীনকালে।

চৈতন্যচরিতামৃতে দহি, দুগ্ধ, সর, নবনী এমনকী পিঠে পায়েসেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ ক্ষীর, কলাবড়া, মুগসাঁউলি, দধি, পায়েস ইত্যাদি মিষ্টান্ন পদের উল্লেখ আছে।

প্রাচীনকালে বাংলায় সবচেয়ে যে মিষ্টির প্রচলন ছিল তা হল খণ্ড। শর্করাজাত নানা প্রকারের খণ্ড দেবতাকে নিবেদন করা হত। সেকালে শেষ পাতে বাঙালির খণ্ড খাওয়ার অভ্যেস ছিল। এর মধ্যে ক্ষীরখণ্ড ছিল বিশেষ জনপ্রিয়।

চিনি দিয়ে তৈরি এসব মিষ্টি এখন লুপ্তপ্রায়, তবে পুজো-আর্চায় এখনও কদমা, বাতাসা, নকুলদানা প্রভৃতি ব্যবহারের চল আছে।

মধ্যযুগের শুরু থেকে বাংলার মানুষ মিষ্টির মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। কৃষ্ণনগরের সরভাজার উদ্ভাবন নিয়ে নানা মতভেদ আছে। চৈতন্যদেবের মিষ্টির প্রতি আসক্তির উল্লেখ আগেই করেছি। কথিত আছে তিনি নাকি তিন প্রকার সরের মিষ্টি খেতেন। তার মধ্যে অন্যতম সরপুরী বা সরপুরিয়া। কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্যচরিতামৃতে এর উল্লেখ আছে। অদ্বৈত আচার্য নাকি নিজে চৈতন্যদেবকে সরপুরিয়া পাঠাতেন।

প্রচলিত মতে সরপুরিয়ার সৃষ্টিকর্তা কৃষ্ণনগরের অধরচন্দ্র দাস। আবার মতান্তরে সরপুরিয়ার সৃষ্টিকর্তা তাঁরই পিতা সূর্যকুমার দাস। কথিত আছে যে তিনি নাকি রাতে দরজা বন্ধ করে ছানা, ক্ষীর ও সর দিয়ে তৈরি করতেন সরপুরিয়া ও তাঁর অপর আবিষ্কার সরভাজা। পরের দিন সকালে সেই মিষ্টি মাথায় করে নিয়ে তিনি ফেরি করে বেড়াতেন। যুবক অধীরচন্দ্র তাঁর পিতার কাছ থেকে এই মিষ্টি তৈরির কৌশল জেনে নেন এবং ১৯০২ সালে নেদের পাড়ায় নিজের নামে একটি মিষ্টির দোকান প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীকালে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তিনিও তাঁর পিতার মতোই সরপুরিয়া প্রস্তুত-প্রণালী কেউ যাতে জানতে না পারে তার জন্য রাতে দরজা বন্ধ করে মিষ্টি তৈরি করতেন। এত করেও কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। অন্য ময়রারা কীভাবে যেন সরপুরিয়া ও সরভাজা তৈরির কৌশল জেনে যান এবং তাঁরাও কৃষ্ণনগরে এই মিষ্টি তৈরি করতে থাকেন।

বর্ধমান শহরের সীতাভোগ, মিহিদানার কথা কারও অজানা নেই। ১৯০৪ সালের অগাস্ট মাসের এক দিন। জমিদার বিজয়চন্দ্র মহাতাবকে মহারাজ খেতাব দিতে এসেছেন বড়লাট লর্ড কার্জন। বড়লাটের এই আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে বিজয়চন্দ্র বর্ধমানের এক বিখ্যাত মিষ্টি প্রস্তুতকারক ভৈরবচন্দ্র নাগকে একটি বিশেষ মিষ্টি তৈরি করতে আদেশ করেন। ভৈরবচন্দ্র সূক্ষ্ম দানা বিশিষ্ট এক অভিনব মিষ্টি তৈরি করেন যা আস্বাদন করে কার্জন সাহেব ও তাঁর স্ত্রী অভিভূত হয়ে পড়েন। বিজয়চন্দ্রই সূক্ষ্ম দানার জন্য এই মিষ্টির নাম দেন মিহিদানা।

সীতাভোগের আবিষ্কর্তাও ভৈরবচন্দ্র নাগ। বর্ধমানের মহারাজা নাকি তাঁকে একবার ছানার সঙ্গে চালের সেমাই মিশিয়ে ঘি-তে ভাজা একটি মিষ্টি বানাবার অনুরোধ করেছিলেন। ভৈরব রাজার নির্দেশ অনুযায়ী মিষ্টি বানাতে গিয়ে যে মিষ্টি সৃষ্টি করেন তাই সীতাভোগ নামে খ্যাত হয়। মিহিদানার মতো সীতাভোগ নামটিও নাকি মহারাজেরই দেওয়া। আর তার পর থেকেই মিহিদানা-সীতাভোগ এই দুই মিষ্টির জন্য বর্ধমান বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

অতি সম্প্রতি পশ্চিমঙ্গের মধ্যে ১১ ও ১২তম মৌলিক মিষ্টির সুনামের অধিকারী হল বর্ধমানের ঐতিহাসিক সীতাভোগ ও মিহিদানা। কেন্দ্রীয় সরকার জিআই বা ‘জিয়োগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন’ তকমা দিল এই দুই মিষ্টিকে। জিআই লোগো পাওয়ায় এই মিষ্টি বিপণনে ও বিদেশে রফতানিতেও সুবিধে হবে।

ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রীর জন্মদিনে বউবাজারের বিখ্যাত ময়রা ভীম নাগের ডাক পড়েছিল এমন এক বিশেষ মিষ্টি তৈরি করার জন্য যার স্বাদ আগে কেউ কোনওদিন পায়নি। লাটসাহেবের অনুরোধ রাখতে ভীম নাগ যে বিশেষ ধরনের মিষ্টিটি তৈরি করেছিলেন তার স্বাদে লেডি ক্যানিং একেবারে মজে গিয়েছিলেন। লাটসাহেব খুশি হয়ে ভীম নাগের দুই হাত ভরে উপহার তুলে দেন। এই বিশেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে ভীম নাগ মিষ্টির নাম রাখেন লেডি ক্যানিং। সাধারণ মানুষের উচ্চারণের দোষে কালক্রমে সেই মিষ্টি লেডিকেনি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

লেডিকেনি নিয়ে অবশ্য আর একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। বহরমপুরের খাগড়া বাজারের ময়রারা নাকি সিপাই বিদ্রোহের পরে ‘লেডি ক্যানিং’ নামে এক মস্ত পান্তুয়া তৈরি করেছিলেন যা লোক মুখে মুখে ‘লেডিকেনি’ নামে পরিচিত হয়।

ল্যাংচা বলতে আমরা শক্তিগড়ের ল্যাংচাকেই বুঝি। কিংবদন্তি আছে শক্তিগড়ের যে কারিগর ল্যাংচা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি নাকি লেংচে অর্থাৎ খুঁড়িয়ে চলতেন। এই কারণেই মিষ্টির নামকরণ হয়েছিল ল্যাংচা।

মালদহের অন্যতম বিখ্যাত মিষ্টি হল রসকদম্ব। কদম্বফুলের মতো দেখতে এই মিষ্টির ভিতরে ছোট রসগোল্লা আর উপরে থাকে ক্ষীরের মোটা প্রলেপ। সারা গায়ে জড়ানো পোস্ত মাখানো চিনি। পোস্ত এখন মহার্ঘ হয়ে ওঠায় রসকদম্বের গায়ে আজকাল শুধু চিনির আস্তরণ থাকে।

জনশ্রুতি আছে, সুলতান হুসেন শাহর আমলে চৈতন্যদেব একবার গৌড়ে এসেছিলেন। তখন কেলিকদম্ব গাছের তলায় চৈতন্যদেব রূপ-সনাতনকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। এই ঘটনাকে উপলক্ষ করেই নাকি রসকদম্ব মিষ্টির নামকরণ। অবশ্য এর সত্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিশেষ মতভেদ আছে। কিন্তু এই সব নানা মত সত্ত্বেও বৈষ্ণবদের কাছে স্বাদে এবং দর্শনদারিতে রসকদম্ব মিষ্টির আজও কোনও বিকল্প নেই।

বাঙালি মিষ্টির কথা শুরু করলে তা শেষ করা মুশকিল কারণ আমাদের মিষ্টির ভাণ্ডার হাজার রকমের মিষ্টি নিয়ে সমৃদ্ধ। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি। তাই অনুপায় হয়ে ইতি টানছি মিষ্টি আখ্যানে।

মিহিদানা

উপকরণ: বেসন, চিনি, লেমন ইয়েলো কালার, গোলাপজল, ভাজার জন্য সাদা তেল।

প্রণালী: / কাপ বেসনে সমান মাপের জল দিয়ে ফেটান। বুন্দিয়ার মতো গোলা করবেন। প্রয়োজনে আরও বেশি জল দিতে পারেন। মিহিদানার ঝাঁজরি দিয়ে বুন্দিয়ার মতো মিহিদানা ভেজে তুলুন। ইয়েলো কালার মেশান।

/ কাপ চিনিতে জল মিশিয়ে সিরা তৈরি করুন। এর মধ্যে দুধ দিয়ে ময়লা ছেঁকে ফেলে দিন। ১ টেবিল চামচ গোলাপজল দিন। বুন্দিয়ার মতো মিহিদানা সিরাতে দিয়ে উনুনে বসান। নেড়ে নেড়ে ভাজুন। উনুন থেকে নামিয়ে মিহিদানা একটি হাঁড়িতে ছড়িয়ে রাখুন।

অধ্যায় ৫৮ / ৫৮
সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%