আলপনা ঘোষ
কালবৈশাখীর ঝড় উঠলে আমগাছ থেকে টুপটাপ করে যে আমগুলি ঝরে পড়ে তা হল কাঁচাআম। ফালি ফালি করে কেটে তাতে নুন, সরষের তেল ও কাঁচালঙ্কাবাটা দিয়ে মেখে খেতে দারুণ। সেই আম আবার রোদে সেঁকে খেতেও জব্বর।
বৈশাখ মাসের অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে আমার ঠাকুমাকে দেখেছি বরিশালের প্রথা অনুযায়ী নানা আচার নিয়ম মেনে কাসুন্দি বানাতে। অনেক ঘটাপটা করে গোটাহলুদ, রাইসরষে আর পাঁচটি গোটা কাঁচাআম স্নান করানোর এক রীতি ছিল। বাড়ির এয়োরা উলু দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে এই স্নান সম্পন্ন করাতেন। রোদে সরষে শুকিয়ে গেলে এর পরে তা কোটার পালা। পাঁচ এয়ো মিলে শিলনোড়ায় সরষে কুটতেন। এরপর তোলা নতুন উনুনে একটি নতুন হাঁড়িতে বহুক্ষণ জল ফুটিয়ে জল একটু মরে এলে তার মধ্যে কোটা সরষের গুঁড়ো চেলে দিতে হত। এর সঙ্গে মেশানো হত নুন, হলুদ ও ভাজা জিরা ও ঝালের গুঁড়ো। পূর্বোক্ত কাঁচা আমের সঙ্গে আরও কিছু আম খোসা ছাড়িয়ে, কষ বের করে কাসুন্দিতে মিলিয়ে বেশ কয়েক দিন রোদ খাইয়ে আম কাসুন্দি ঘরে উঠত।
বাঙালদের ডালপ্রীতির কথা কে না জানে। এ ব্যাপারে বেশি খ্যাতি ছিল বরিশালের লোকেদের। চর্ব্যচোষ্য পদ দিয়ে চেটেপুটে খাওয়ার শেষে বাবাকাকাদের দেখেছি লেবু চিপে এক বাটি মুশুরির ডাল খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে। গ্রীষ্মের গরমে দুপুরে ভাতের সঙ্গে বাঁধাধরা আর একটি পদ ছিল আমডাল। মুগ, মুশুর দু’রকম ডাল দিয়ে রাঁধা হলেও আমার প্রিয় মুশুরির ডালে সরষে, শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দেওয়া টকডাল। টকমিষ্টি স্বাদের এই ডাল তুলনাহীন।
কাঁচাআম দিয়ে মাছ নাকি একেবারে রাজযোটক। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এমনই একটি পদ হল ‘আমশোল’। রবিঠাকুরের নাকি অত্যন্ত প্রিয় ছিল এই পদটি।
আমের খোসা ছাড়িয়ে রস বের করে তা দিয়ে কীভাবে এই পদটি রাঁধতে হবে তার বিস্তৃত রন্ধন প্রণালী দিয়েছেন প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর ‘আমিষ নিরামিষ’ গ্রন্থে। কাঁটা ও ছাল বাদ দিয়ে এই মাছ রাঁধতে হবে। মশলার মধ্যে পড়বে পোস্ত, লঙ্কা, হলুদবাটা। তেলে শুকনোলঙ্কা, সরষে, জিরে ফোড়ন দিন। ওই তেলে মাছ দিয়ে সামান্য ভেজে তাতে বাটা মশলা, থেঁতো করা আমআদা, কাঁচা আমের রস, নুন, চিনি দিন। হালকা করে কষে জল দিয়ে ঢাকা দিন। জল মরে তেল ভেসে উঠলে শুকনো খোলায় ভাজা জিরে, শুকনোলঙ্কার গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
‘আম কাসুন্দি চিংড়ি’ পদের খোঁজ পেয়েছি এক নামী রাঁধুনির ডায়েরি থেকে। কড়াইতে তেল গরম করে তাতে সরষে আর গোটা শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তাতে যোগ করুন ফালি করে কাটা কাঁচা আম এবং স্বাদমতো চিনি। আমের টুকরোতে যখন পোড়া চিনির রঙের ছোঁয়া লাগবে তখন বাছা ধোয়া চিংড়ি দিন। একটু ভাজা হলে জল ও নুন দিন। ঢিমে আঁচে ফুটতে দিন। জল শুকিয়ে এলে নামাবার আগে সামান্য সরষেবাটা ও কাসুন্দি দিন। মাখোমাখো হলে নামিয়ে নিন।
আর একটি মুখরোচক পদ হল কাঁচাআম দিয়ে লটেমাছের স্বাদু বড়া। লটেমাছ সেদ্ধ করে কাঁটা বাদ দিয়ে তাতে কাঁচালঙ্কাবাটা, কুচোনো আম, হলুদ ও নুন দিয়ে মেখে নিতে হবে। আঁটো করতে মাছের মিশ্রণে সেদ্ধ আলু দিয়ে বড়ার আকারে গড়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই হল। চায়ের সঙ্গে টক-ঝাল এই বড়া দারুণ জমে যাবে যদি তা পরিবেশন করেন আমকাসুন্দি সহযোগে।
কাঁচালঙ্কা ও নুন দিয়ে পোস্ত বেটে তাতে কোরানো কাঁচাআম মিশিয়ে বড়া ভেজে নিলে তাও কিন্তু কম মুখরোচক হবে না।
নেমন্তন্নবাড়িতে শেষপাতে কিশমিশ দেওয়া, খোসাসুদ্ধ আমের ঘন চাটনিও স্বাদ মাহাত্ম্যে কোনও অংশে পিছিয়ে নেই।
ছেলেবেলায় মা-ঠাকুমাকে দেখেছি মাটির উনুনে আম পুড়িয়ে সেই পোড়া শাঁস দিয়ে আমপোড়ার শরবত বানাতে। তাতে পড়ত চিনি, বিটনুন, শুকনো খোলায় ভাজা জিরের গুঁড়ো। ঠান্ডা করতে মেশানো হত বরফের কুচি। পাথরের গেলাসে করে আমপোড়ার শরবত খেয়ে প্রাণ জুড়োত অতিথির।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন