কণ্টক-কথা

আলপনা ঘোষ

পথের কাঁটা, শজারুর কাঁটা, তারকাঁটা এবং আরও নানাবিধ কাঁটা নিয়ে বাঙালি জর্জরিত হলেও একটি কাঁটা নিয়ে তার প্রেমের অন্ত নেই আর তা হল মাছের কাঁটা। বাঙালির মত্স্যপ্রীতিই কিন্তু তার এই কণ্টক-প্রীতির অন্যতম কারণ। মাছের কাঁটা নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতার যে অন্ত নেই তার প্রমাণ মেলে তার নানাবিধ রান্নার পদপ্রণালীতে।

রান্নার আকরগ্রন্থ বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’ গ্রন্থে তিনি অজস্র দেশি, বিদেশি রন্ধন-প্রণালী দিলেও মাছের কাঁটা দিয়ে একটিমাত্র যে পদটি দিয়েছেন তা হল ‘ডাঁটাচচ্চড়ি’। বর্ষাকালে নাকি এই চচ্চড়ির বড়ই আদর। ডাঁটার সঙ্গে ঝিঙে, থোড়, আলু, কাঁঠালবিচি প্রভৃতি নানা রকমের আনাজ একসঙ্গে মিশিয়ে রাঁধতে হয়। এই পদের প্রধান মশলা হলুদ, লঙ্কা ও সরষেবাটা। তেজপাতা এবং পাঁচফোড়ন তেলের মধ্যে দিয়ে গন্ধ বেরুলে তখন তাতে মাছের তেলকাঁটা ভেজে তারপরে আনাজ দিয়ে ভালভাবে সাঁতলে বাটা মশলা দিয়ে রান্নাটি করতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী বিদুষী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী বহু বছর আগে বলেছেন, বেশি খরচ করে বেশি ঘি ঢাললেই ভাল রান্না হয় না। তিনি আরও একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, ভাল রাঁধুনি কোনও জিনিস অপচয় করেন না। তাঁর প্রধান শক্তি হল তাঁর পরিমিতিবোধ। তাঁর এই বক্তব্যের প্রমাণ মেলে তাঁর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে। ছেঁচড়ার প্রণালী দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন যে যজ্ঞির রান্না হয়ে গেলে শাক ইত্যাদির যা উদ্বৃত্ত থাকে, তা দিয়েই এই পদটি রান্না করা যায়। এতে শাকসবজি, তরিতরকারি যেমন দেওয়া হয়, তেমনি আবার যত রকম তরকারির খোসা, এমনকী শাকের বুড়া পাতা কী গোড়া আদি যা ফেলে দেওয়া হয় তা সব কিছুই কিন্তু তিনি ছেঁচড়াতে দিতে বলেছেন। মাছের তেল, পোঁটা যেমন এতে পড়ে তেমনি পড়ে কাঁটা, মুড়া যা বাকি থাকে তা সবই। হলুদ, সরষেগুঁড়ো, লঙ্কা, ধনে, জিরা আর মাপ মতো নুন ইত্যাদি দিয়ে রাঁধা এই ছেঁচড়া কিন্তু মোটেই ফেলনা পদ নয়। গ্রন্থকারের মতে শুধুমাত্র স্বাদগুণেই এই পদটি এগিয়ে নেই, এই পদটি স্বাস্থ্যকরও বটে কারণ এটি ভিটামিনে ভরপুর।

এই গ্রন্থে উল্লিখিত পুঁইশাকের কাঁটাচচ্চড়ি একটু অন্য ঢঙে সামান্য পেঁয়াজের আভাস দিয়ে রেঁধে খাইয়েছিলেন আমার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের এক সহকর্মী চিত্রাদি। এক ছুটির দিনে দেখতে গেছি ওঁকে। ভাত না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়লেন না সঙ্গে সেই স্বাদু চচ্চড়ি। কেমো, রেডিয়েশনের প্রকোপে তখন ওঁর মাথার সব চুল ঝরে গেছে। চিরদিনের ছিপছিপে চেহারার মানুষটি আরও শীর্ণ হয়েছেন। তবু এক গাল হেসে বলছেন, ‘আমি ভাল আছি রে।’ আজ এত বছর বাদেও সেই চচ্চড়ির স্বাদ আমার মুখে লেগে আছে।

আমার বাপের বাড়ির বহুদিনের পুরাতন মায়ের রান্নাঘরের সহযোগী, সুভদ্রা প্রায় আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিলেন। ওঁর হাতের রান্না ছিল এক কথায় অতুলনীয়। শুধুমাত্র বাবুর বাড়ির ফেলে দেওয়া তরকারির খোসা, মাছের কাঁটা ইত্যাদির সঙ্গে পাঁচফোড়ন, মরিচবাটা আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে এমন একটা চচ্চড়ি রাঁধতেন যা দিয়ে এক থালা ভাত খাওয়া যেত।

আমাদের মহানায়ক উত্তমকুমারের কাঁটা-চচ্চড়ির প্রতি প্রেমের কথা প্রায় কারও অজানা নয়। এই সেই পদ যা খেতে চেয়ে না পেয়ে রাগ করে ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে হাঁটা পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি আর তাঁর পিছনে পিছনে দৌড়ে ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড। রাস্তায় জনতা সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত নায়ক নায়িকাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়েছিল। ভেটকিমাছের কাঁটা দিয়ে এই চচ্চড়িতে হাতযশ ছিল নায়ক-জননীর। পরে সুপ্রিয়া দেবী এই রান্নাটি শিখে নিয়েছিলেন।

কলকাতার এক বনেদি বাড়ির স্বাক্ষর ডিশ হল গুঁড়ো চচ্চড়ি। একবার খেলে, সারা জীবন তার স্বাদ ভোলা যাবে না। ফ্রাই-এর জন্য কাঁটা বাদ দিয়ে ভেটকি মাছের ফিলে কেটে নিলে, সেই কাঁটা না ফেলে তা দিয়ে বানানো হয় এই চচ্চড়ি স্বাদে গন্ধে যার জুড়ি মেলা ভার।

কাঁটাচচ্চড়ির এই মোহজালে শুধু বাঙালিই কিন্তু আবিষ্ট থাকেনি। কলকাতার বেশ কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও বাঙালি ক্রিশ্চান পরিবারের রোববারের মধ্যাহ্নভোজে এই পদটি থাকবেই আর তার সঙ্গে গরম গরম ভাত। কলকাতার এক নামী ক্রিশ্চান শেফের বাড়িতে বিশেষ দিনের মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য ‘আমাগো ভাজা কারি’ বা ‘লাউ টক’-এর সঙ্গে থাকে তাঁর মায়ের হাতে রান্না কাঁটাচচ্চড়ি।

এ তো গেল কাঁটাচচ্চড়ির কাহন। বাংলা রান্নায় মাছের কাঁটা দিয়ে নানাবিধ ঘণ্টেরও কিন্তু শেষ নেই। লাউ, মিষ্টি কুমড়ো এমনকী পালংশাকেও রুই বা শোল মাছের মুড়ো-কাঁটা দিয়ে জবরদস্ত ঘণ্ট রেঁধে ফেলতেন সেকালের মা-ঠাকুমারা। রুই মাছের কাঁটার সঙ্গে যেমন লাউয়ের ঘণ্ট মজে, ইলিশ মাছের মুড়ো-কাঁটার সঙ্গে তেমনি মজে ছাঁচি কুমড়োর ঘণ্ট।

ঘণ্ট নিয়ে গপ্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাঙালির মুড়িঘন্টর কথা না বলি। এই ঘন্টেরও আবার রকমফের হয়। রুইমাছের মুড়ো দিয়ে গোবিন্দভোগ চালের মুড়িঘণ্টর কথা তো আগেই বলেছি। আমার এক ঠাকুমার হাতে আমি খেয়েছিলাম ইলিশের মুড়ো দিয়ে মুড়িঘণ্ট। সমস্যা হল ইলিশের মুড়োতে থাকে অসংখ্য সরু সরু কাঁটা। মুড়িঘণ্ট করতে গেলে এই ছোট কাঁটা তো বাদ দিয়ে তবে রাঁধতে হবে না হলে তো জাত যাবে সেই মুড়িঘণ্টর। আমার ধৈর্যশীলা, রন্ধনপটিয়সী ঠাকুমা এই কাঁটাগুলি একটি একটি করে বেছে ফেলে শুধুমাত্র মুড়োর বড় বড় কাঁটা আর ইলিশের তেল দিয়ে রান্না করেছিলেন সেই ভিন্ন স্বাদের মুড়িঘণ্ট। এর সঙ্গে যোগ করছিলেন সুবাসিত বাসমতি চাল।

বাঙালিকে অন্য জাতের লোকেরা ‘মছলি-খোর’ বলে গালি দিলেও তাতে তার কিন্তু কিছু যায় আসে না। সত্যি কথা বলতে কী বাঙালির নামের পিছনে এই তকমাটি প্রযোজ্য নয় এ কথা খোদ বাঙালিও মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। মাছের মুড়ো থেকে ল্যাজা— কোনও কিছুতেও তার অরুচি নেই।

কবি ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর এক প্রবন্ধে পঞ্চপদী ইলিশ ব্যঞ্জনের এমন এক স্বাদু বর্ণনা দিয়েছিলেন যা শুধু আমাদের মুগ্ধই করে না, আমাদের রসনাকেও সিক্ত করে। সেই প্রবন্ধের মুখ্য অংশ জুড়ে কিন্তু ইলিশ মাছের কাঁটার বন্দনা।

সেদিনের অসাধারণ ভোজের শুরু হয়েছিল ইলিশ মাছের মুড়োর সঙ্গে ‘স্নিগ্ধ লাউ’ দিয়ে। তারপর এল ‘ঝড়তি-পড়তি’ কাঁটা দিয়ে রাঁধা ঘন মুগডাল, সঙ্গে কালচে ব্রাউন কড়কড়ে ভাজা গলকাঁটা।’ তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় ইলিশ মাছের দুই স্বাদু পদ। শেষ পাতে কী পরিবেশিত হল তা উদ্ধৃত করি প্রাবন্ধিকের নিজের ভাষায়।

‘আর সবশেষে, জিভ জুড়োবার জন্য চিনি মেশানো পাতিলেবুর একটা ঠান্ডা অম্বল— যাতে বিন্দু বিন্দু কালোজিরে আর দু’-একটা সুবাস নিস্রাবী কাঁচালঙ্কার সঙ্গে ইলিশের ওঁচা অংশ ল্যাজার দিকটা ভাসমান— রান্নার গুণে সেই অধমও এখন উত্তম।’

ফুলের রানি গোলাপ, কিন্তু সে ফুল তুলতে গিয়ে একটু অসাবধান হলে আর রক্ষা নেই। কাঁটার খোঁচা খেতেই হবে। মাছের রানি ইলিশের ক্ষেত্রে সেই একই কথা।

ইলিশ মাছ খাওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। এই প্রক্রিয়া না মেনে মাছ খেতে গেলে গলায় কাঁটা ফুটে ইলিশ-আস্বাদনে পুরো মজাই মাটি।

আমার এক ভোজনরসিক লেখক বন্ধুর কলমে পড়েছি, অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী নাকি ইলিশ মাছের একটি বড়সড় গাদার টুকরোর কাঁটা হাত দিয়ে না বেছে, ভেঙে মুখে পুরে, খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে কী অদ্ভুত পদ্ধতিতে মাছের পুরো কাঁটাগুলিকে একসঙ্গে মুখ থেকে বার করে দিতে পারতেন। আমার কাছে এই গল্প শুনে আমার আর এক বন্ধু অবশ্য এই চেষ্টা করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিল।

আমার এক আত্মীয় তো মাছ খেতে ভালবাসলেও, মাছের কাঁটার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে অবশ্য তাঁর উদ্ধারকর্ত্রী তাঁর পতিব্রতা স্ত্রী। যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের হাসিঠাট্টা উপেক্ষা করে তাঁর স্ত্রী স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে নিপুণহস্তে মাছের কাঁটা বেছে দিলে তবে তিনি অন্ন স্পর্শ করতেন। কোনও কারণে স্ত্রী যদি অকুস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন, তা হলেও মত্স্যপ্রেমী আত্মীয়টির কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। হাঁকডাক করে শাশুড়ি-স্থানীয় কাউকে বরাত দিয়ে তিনি মাছের কাঁটা বেছে দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করিয়ে ফেলতেন। বুঝতেই পারছেন তিনি আমাদের বাড়ির এক জামাই আর জামাই বাবাজীবনকে রুষ্ট করবেন কে?

মধ্যযুগীয় বাংলা মঙ্গলকাব্যতে বাঙালির এই মত্স্যপ্রীতির ঝুড়ি ঝুড়ি উল্লেখ পাই আমরা। নারায়ণ দেব তাঁর ‘পদ্মপুরাণ’-এ বেহুলার বিয়ের ভোজের বর্ণনায় নানাবিধ যেসব মাছের পদের কথা লিখেছেন তার মধ্যে অবশ্যই আছে ‘মত্স্যের মুড়া দিয়া মাসদাইল’-এর উল্লেখ। আজও মাছের মুড়ো দিয়ে ডাল বাঙালির অতি প্রিয় পদ।

হয়তো মঙ্গলকাব্যের ধারা অনুসরণ করেই আমাদের আধুনিক গদ্যলেখকেরা রান্না ও খাওয়া বিষয়টিকে তাঁদের বিষয়ভুক্ত করে তুলেছিলেন। চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে খাদ্য কেমন কাজে লাগে তার এক চমৎকার নমুনা মেলে রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে। মধুসূদন একজন ধনী মানুষ এবং সেই ধন জাহির করতে সে খায় রুপোর থালাতে আর জল পান করে রুপোর গেলাসে। কিন্তু তার প্রতিদিনের খাদ্য হল কলাইয়ের ডাল আর কাঁটাচচ্চড়ি এবং শেষ পাতে তেঁতুলের অম্বল আর এক বাটি চিনি মেশানো দুধ। এসব বাদ দিয়ে পোলাও কালিয়া কিন্তু তার মুখে রুচত না, মাছের কাঁটাচচ্চড়ির এমনই অমোঘ আকর্ষণ।

রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসে খেতে বসে পাতে রুইমাছের মুড়ো দেখে রমেশ বলে ওঠে, ‘এ তো স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয়— এ যে সত্যই মুড়ো— যাহাকে বলে রোহিত মত্স্য তাহারই উত্তমাঙ্গ।’ অনেকের ধারণা রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং রমেশের জবানিতে মুড়ো নিয়ে তাঁর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বিহারী ও মহেন্দ্রর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার পর আনন্দিত মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মী পুত্রবধূ আশাকে দিয়ে তাঁর মতো করে দুই বন্ধুর পছন্দের যেসব পদ রাঁধিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল মাছের কাঁটা দিয়ে ঘণ্ট। দুই ‘ভাই’কে চোখের সামনে বসিয়ে খাইয়ে তাঁর শেষ সাধ পূর্ণ করে রাজলক্ষ্মী মারা যান।

মাছের মুড়োর কদরের কথা শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাতেও মেলে। সে কালে বাংলার একান্নবর্তী পরিবারে মাছের মুড়োটি পরিবেশিত হত পরিবারের যিনি কর্তা তাঁর পাতে। আবার কখনও মাছের মুড়ো স্নেহ মমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত। শরত্চন্দ্রের ‘মেজদিদি’তে হেমাঙ্গিনী যেই তাঁর বড় জায়ের সত্ভাই, বাপ মা মরা কেষ্টকে আস্ত মাছের মুড়োটি খেতে দিলেন, তাই নিয়ে শুরু হয়ে গেল মারাত্মক অশান্তি।

মাছের কাঁটা দিয়ে নানাবিধ স্বাদু রান্নার প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ে গেল বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেত্রী ও সম্পাদিকা শ্রীমতী অপর্ণা সেনের লেখা কলমে এক বিধবা বালিকার করুণ কাহিনির কথা।

ঘটনাটি এরকম:

অনেককাল আগের কথা। বাড়ির মেয়েটি বালবিধবা। বালিকা তার উপরে আরোপিত বৈধব্যের নানা অনুশাসন বোঝে না। ঠোঁট ফুলিয়ে সে মায়ের কাছে মাছ খাওয়ার আবদার করে। হতভাগিনী মা তো নিরুপায়। আদরিণী কন্যাকে বিমুখ করতে তাঁর বুক ফেটে যায়। কিন্তু হিন্দুধর্মের অনুশাসন অমান্য করার সাহস নেই তাঁর। মাছের বড়া বলে ডালের বড়া ভেজে মেয়ের পাতে দিলেন। ছোট ভাইগুলি কিছু না বুঝেই বোনকে খেপায়— মাছের বড়া, তা হলে কাঁটা কই দেখা। বোন যেগুলিকে কাঁটা বলে দেখায়, সেগুলো আসলে শালপাতার সরু কাঠি। পরম মমতায় মা সেগুলি গুঁজে দিয়েছিলেন মেয়েকে ফাঁকি দেওয়ার তরে। এমন করুণ বৃত্তান্ত বোধহয় সে কালের বাঙালির ঘরে ঘরে।

মাছের কাঁটা দিয়ে লাউঘণ্ট

উপকরণ: রুইমাছের মুড়ো, কাঁটা, লাউ, সাদা জিরা, তেজপাতা, গোটা শুকনোলঙ্কা, হলুদগুঁড়ো, লঙ্কাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, কুচোনো পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, নুন, সরষের তেল।

প্রণালী: মাছের মুড়ো ও কাঁটাতে নুন, হলুদ মেখে নিন। লাউ সরু সরু করে কেটে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করে ভাল করে সাঁতলে তুলে রাখুন। আরও খানিকটা তেল গরম করে তাতে তেজপাতা, জিরা, শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দিন। ভাজা গন্ধ বেরুলে কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে নাড়ুন। সামান্য রং ধরলে লাউ দিন। নাড়াচাড়া করে তাতে মাছের মুড়ো ও কাঁটা দিন। নাড়তে থাকুন। এবারে বাকি সব গুঁড়ো মশলা দিয়ে ভাল করে কষুন। নুন ও কাঁচালঙ্কা দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রাঁধুন। লাউ থেকে বেরুনো জলেই পুরোটা সেদ্ধ হয়ে যাবে। মাখোমাখো হয়ে এলে আর একটু নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%