আলপনা ঘোষ
আমার সঙ্গে পারসি মেয়ে বাচ্চি কাঙ্গার পরিচয় হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ক্লাসে। বব কাট চুল, পরনে স্কার্ট, এমব্রয়ডারি করা সাদা টপ। আমারই মতো সেও লম্বায় পুরো পাঁচ ফুট নয়। এখনও যখন ওর কথা ভাবি, ছোট হাতা সাদা জামা পরা চেহারাটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই বাচ্চি এখন কর্ম ও বিবাহসূত্রে মুম্বাইবাসী। নিজে একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলম লেখিকা। বাচ্চি কারকারিয়া নামেই সে আজ অধিক পরিচিত।
অতিথিবৎসল পারসিদের বাড়িতে কিছু মুখে না দিয়ে আসার উপায় নেই। কাজেই পারসি খাবারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বাচ্চিদের বাড়িতেই। ওর মায়ের হাতের পারসি মিষ্টি মুরোব্বা আর ধানশাকের স্বাদ গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
সুদূর ইরান থেকে মুসলমান আক্রমণকারীদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে সেই সপ্ত শতকে কিছু যোরোয়াস্ট্রিয়ানরা গুজরাটে এসে পৌঁছেছিলেন আশ্রয়ের আশায়। গুজরাটের রাজা তাঁদের আশ্রয় দিলেন। সেই থেকে ওঁদের এ ভূমে বাস, এদেশেরই মানুষ হয়ে। দীর্ঘ দিন গুজরাটে বসবাসের দরুন পারসিরা শুধু যে গুজরাটি ভাষায় কথা বলেন তাই নয়, তাঁদের রন্ধনজগতেও অনুপ্রবেশ ঘটেছিল গুজরাটি ধোকলা ও খাণ্ডোভির। তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন পারসিরা কিছু দিনের মধ্যে ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেন। ব্যাবসা বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পরস্পরের মধ্যে সামাজিক আদানপ্রদান। এর ছায়া পড়ে ওঁদের রান্নাঘরে। পারসি খাদ্যে তাই পাশ্চাত্য রন্ধনশৈলীর সুস্পষ্ট প্রভাব সহজেই লক্ষণীয়। তাই ওঁদের খাদ্যতালিকায় কাস্টার্ড, সস, স্ট্যু ও রোস্টের সহ অবস্থান ওঁদের পিলাফ, ডালের সঙ্গে।
কয়েক শতক পরে ১৭৬৭ সালে পারসি সম্প্রদায়ের এক অংশ কলকাতাতে এসে বসবাস শুরু করেন। ওঁদের বন্ধুবৎসল স্বভাব, স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আদানপ্রদান, বুদ্ধিমত্তা ও কৌতুকপ্রিয়তা অচিরেই কলকাতার মানুষের মন জয় করে ফেলে। পারসিদের প্রতি আকর্ষণের আর একটি কারণ বোধ হয় পারসিদের ধানশাক ও প্রন পাতিয়া। ধানশাকের বিশেষ মশলা কলকাতাতে না মিললে পারসি গিন্নিরা নিজেদের জন্য তো বটেই, এ শহরের বাঙালি বান্ধবীদের চাহিদা মেটাতে বাড়িতে নিজেরাই সে মশলা তৈরি করে নিতেন। খাদ্যগবেষকদের মতে সম্ভবত ইরানের ‘খোরেস্তে এসফান্নাজ’ পদটি থেকেই পারসি ধানশাকের উদ্ভাবন। দুটি পদেই ব্যবহার হয়েছে শাক, ডাল ও মাংস। ছয় রকমের ডাল, চৌকো করে কাটা মাংস ও তার সঙ্গে নানাবিধ সবজি, শাক, হার্বস, শুকনো ও ভিজে মশলা দিয়ে রান্নার শেষে মেশানো হয় টক মিষ্টি তেঁতুলের গোলা, ব্রাউন সুগার ও লেবুর রস। এই ধানশাক পদ নিয়ে পারসিদের নিজেদের মধ্যে বেশ রেষারেষি চলে। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে ধানশাক বানান। তাই শুধু ‘ধানশাক’-এর রেসিপি দিয়েই একটি রান্নার বই লেখা যেতে পারে।
মাছমাংসের মতো পারসিরা আবার অত্যন্ত ডিমের ভক্ত। ডিম দিয়ে নানারকমের স্বাদু পদ বানাতে ওঁদের জুড়ি মেলা ভার। এর মধ্যে ডিম দিয়ে ওঁদের বিশেষ পছন্দের ডিশ হল ‘আকুরি’বা স্ক্র্যাম্বেল্ড এগ, ‘পোরা’ বা ওমলেট আর একটু ভারী খেতে ইচ্ছে হলে ‘পাপেতা পার ইডা’। শেষের এই পদটি পাপেতা অর্থাৎ আলু আর ইডা অর্থাৎ ডিম দিয়ে বেক করা হয়।
নভজ্যোত বা যে-কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঘিয়ে বাদামি করে ভাজা সেমুই চিনির রসে ডুবিয়ে কিসমিস দিয়ে পরিবেশিত হয়। বাঙালিদের মতো ওঁদেরও পছন্দ মিষ্টি দই, আবার সে দই যদি হয় বাড়িতে পাতা।
রোববারের দুপুরে ওঁদের চাই ধানশাক, ব্রাউন রাইস, কিমা কাবাব আর তার সঙ্গে মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা ও তার মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে তৈরি কাছুমবার।
বহু হাজার বছর আগে ওঁরা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এলেও আজও ওঁরা ওঁদের ঐতিহ্যকে ভোলেননি। তাই বিয়ের ভোজে আধুনিক কেতা মেনে খাবার টেবিলে কাঁটাচামচের ব্যবস্থা থাকলেও প্লেটের বদলে খেতে দেওয়া হয় গোল করে কাটা কলাপাতায়। খাওয়ার ব্যাপারে কোনও কোনও পারসি পরিবার আবার গুজরাটি প্রভাবমুক্ত হতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে খাওয়ার পর্ব শুরু হয় টক টক ঝাল ঝাল গুজরাটি আচার, সাদা পাঁপড় বা রুটি দিয়ে। পরের পাতে থাকে পত্রানি মচ্ছি। কোরানো নারকেল, কাঁচালঙ্কা ও ধনেপাতা বাটা পমফ্রেট মাছে মেখে কলাপাতায় মুড়ে ভাপিয়ে নিলেই তৈরি পারসিদের অতি প্রিয় এই পদ। এ ছাড়া থাকে ‘সালি জর্দালু মুরগি’। টক-মিষ্টি পার্সিয়ান এই পদটির সঙ্গে থাকে লম্বা করে কাটা মুচমুচে আলুভাজা। আর থাকে ‘ধান-জিরু’ নামক বিশেষ পারসি মশলা মেশানো সবজির স্ট্যু, ভিনিগার ও প্রচুর ঝাল ও নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না ল্যাম্ব বাফাড। ‘লগন’ কথার অর্থ বিবাহ আর ‘নু’র অর্থ হল ভোজ। পারসি ঐতিহ্য মেনে থাকে ‘লগন নু কাস্টার্ড’ বা কাস্টার্ড যা আবার পরিবেশিত হয় খাওয়ার মাঝখানে। সব শেষে থাকে কাজু, কিসমিস, জাফরান দেওয়া মাংসের পোলাও ও সঙ্গে ঘন ডাল। রান্না করা মুরগির মেটে ও গলার নলি দিয়ে তৈরি হয় ভোজপর্বের শেষে বাড়ির সদস্যদের খাবার জন্য মশলাদার পদ ‘আলেটি পালেটি’। মুখশুদ্ধির জন্য বাঙালিদের মতো ওঁদেরও মশলা দেওয়া পানের ব্যবস্থা থাকে।
কলকাতার পারসিদের আবার বিশেষ পছন্দ রুই বা ইলিশের ডিম। ডিমে নুন মাখিয়ে রেখে দেন সংরক্ষণের জন্য। মুম্বাইয়ের পারসিরাও নাকি সমুদ্রের মাছের ডিম এই একইভাবে রেখে দেন অসময়ে রেঁধে খাবার জন্য। বাঙালির মাছের পাতুরির সঙ্গে ওঁদের ‘পত্রানি মচ্ছি’ রন্ধন পদ্ধতিতে মিল আছে যেমন মিল আছে আমাদের ছেঁচকির সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া ওঁদের ছেঁচকির। এ শহরের পারসিরা আবার মুগ্ধ বাঙালির ‘আলুর দম’-এ।
পারসিদের সাবেকি রান্নাঘরে সব বাসনপত্রই ছিল তামার। রান্না করার জন্য তামা ছাড়া অন্য কোনও ধাতুর তৈরি বাসন ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অপছন্দের। বিশেষ বিশেষ দিনে রান্নাঘর সাফা করে বাড়ির গিন্নিরা চালের গুঁড়ো দিয়ে মেঝেতে নকশা আঁকতেন আর রান্নাঘরের দরজায় ঝুলিয়ে দিতেন গোলাপ ও রজনীগন্ধার মালা।
উপকরণ: বাগদা চিংড়ি, বনস্পতি তেল, মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ, আদা, কাঁচালঙ্কা, থেঁতো করা রসুন, শুকনো খোলায় ভাজা ধনে-জিরের গুঁড়ো, লাল লঙ্কা, টম্যাটো, ভিনিগার, চিনি, নুন।
প্রণালী: মাঝারি আঁচে তেল গরম করে পেঁয়াজ দিন। বাদামি রং ধরলে আঁচ কমিয়ে আদা, রসুন দিয়ে সামান্য নাড়াচাড়া করে তাতে বাকি মশলা দিয়ে কষুন। ভাজা গন্ধ বেরুলে টম্যাটো, নুন, চিনি, ভিনিগার দিয়ে অল্প নেড়ে সামান্য জল দিন। ফুটে উঠলে ঢাকা দিন। গ্রেভি ঘন হয়ে এলে মাছ দিন। কম আঁচে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। মাছ সেদ্ধ হয়ে এলে কুচোনো কাঁচালঙ্কা দিয়ে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন