আলপনা ঘোষ
আলপনা ঘোষ যখন আমাকে ওঁর এই বইয়ের ভূমিকা লেখার জন্য নিমন্ত্রণ জানালেন, তখন সূচিপত্রে যে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য খাদ্যের তালিকা দেখলাম, তখনই আমার লোলুপ জিহ্বা উজ্জীবিত হয়ে উঠল। আমি রাজি হয়ে গেলাম ওঁর নিমন্ত্রণ গ্রহণে।
কিন্তু আমার এই বুড়ো বয়সে, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি। আস্বাদনের প্রত্যক্ষ আনন্দের বদলে, আলপনার বই পড়ে পুরনো দিনের কলকাতার বিচিত্র ভোজন-উপভোগের স্মৃতি রোমন্থন করছি। আসলে এ বইটি সাবেকি ঢঙের ‘বাঙালি রন্ধন প্রণালী’, বা ইদানীংকালের ‘Bengali Cookbook’ জাতীয় খাদ্যপ্রস্তুত প্রণালীর নির্দেশিকতার ধারা থেকে ভিন্ন। লেখিকা অন্বেষণ করেছেন কলকাতা শহরের বিশেষ ধরনের খাদ্যের পদ— যা তৈরি হয়েছিল এক নাগরিক cosmopolitan বা বিশ্বজনীন পরিবেশে। তাই, আমরা এ বইতে পাচ্ছি আর্মেনীয় পরিযায়ী যাঁরা এ শহরে স্থায়ী বাসিন্দা হলেন, কীভাবে তাঁদের নিজস্ব কায়দায় তৈরি chiken pilaf জনপ্রিয় করে তুললেন। ঠিক এইভাবেই পাচ্ছি এ শহরের পারসি বাসিন্দাদের তৈরি ‘ধান-শাখ’; ইঙ্গ-ভারতীয় বা Anglo-Indian নামে পরিচিত সমাজের বিশেষ বিশেষ পদ। চিনা খানা তো এখন বাঙালি ভোজনকক্ষের থালার অঙ্গ। এর সঙ্গে সঙ্গে, আলপনা এনেছেন আমাদের ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের রান্না, কীভাবে তা কলকাতার ভোজন রসিকদের প্রিয় হয়ে উঠল— উনিশ শতকে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-এর প্রবর্তিত ‘বিরিয়ানি’ (যা উত্তর ভারতের সাবেকি ‘বিরিয়ানি’ থেকে আলাদা স্বাদের); গুজরাটিদের তৈরি ‘ধোকলা’ এবং দক্ষিণ ভারতীয় নিরামিষ আহার।
আলপনা কিন্তু বাদ দেননি আমাদের নিজস্ব বাঙালি আহার-পর্ব। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল, এবং ঘটি-বাঙাল— এসবের রন্ধনপ্রণালীর তারতম্যের বিশ্লেষণ করেছেন নিখুঁতভাবে। তাঁর শৈশবের স্মৃতি (নিজেদের বাড়িতে ওড়িশা থেকে আগত অনন্ত নায়েকের রান্না দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা), রন্ধনশিল্পের ইতিহাসে গভীর গবেষণা— এই দুটিকে আলপনা ঘোষ চমৎকারভাবে মিলিয়েছেন। সবচেয়ে বড় উপাদেয় ভোজনরসিক পাঠকের জন্য— প্রতিটি পরিচ্ছেদের শেষে, আলপনা ঘোষ এক-একটি বিশেষ পদের রন্ধন প্রণালী আমাদের সবিস্তারে জানিয়েছেন।
সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন