প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা

আলপনা ঘোষ

খনার বচনে আছে, ‘আগে তিতা পরে মিঠা।’ বাঙালির খাওয়া শুরু তেতো দিয়ে আর শেষ মিঠাতে। বাঙালির এই তেতো খাওয়ার প্রসঙ্গে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর নিম-বেগুন প্রীতির কথা মনে আসে। ভক্তবৃন্দ তাঁর জন্য স্বাদু নিরামিষ পদ রেঁধেছেন। তার মধ্যে থাকছে, ‘কোমল নিম্বপত্র সহ ভাজা বার্তকী’ বা ‘নব নিম্বপত্র সহ ভ্রষ্ট বার্তকী’। এসবের উল্লেখ আমরা পাই ‘চৈতন্য চরিতামৃত’তে। তাঁর শুক্তো প্রীতির কথা তাঁর ভক্তদেরও অজানা ছিল না। তাই তাঁরা যখন শ্রীক্ষেত্রে প্রভুর দর্শনে যেতেন, তাঁর পছন্দের নানাবিধ নিরামিষ পদের সঙ্গে ‘পুরান শুকতা’ নিয়ে যেতে ভুলতেন না।

‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজের বিবরণ অনুসারে, চৈতন্যদেব যখন শ্রীহট্টে তাঁর শিষ্য সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়ি যেতেন, তখনও যেসব স্বাদু নিরামিষ পদ গ্রহণ করতেন তার মধ্যে অবশ্যই থাকত, ‘দশবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল, মরিচের ঝালে ছেড়া বড়ি বড়ার ঘোল।’

১৫৫০ সাল নাগাদ কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা ‘চণ্ডীমঙ্গল’কে অনেকে সেই সময়ের বাঙালির খাওয়াদাওয়ার ‘ভাঁড়ার ঘর’ বলে থাকেন। তাঁর কাব্যে পাই ‘নিমে শিমে বেগুনে রাঁধিয়া দিবে তিত।’ দ্বিজ বংশীদাস তাঁর ‘মনসামঙ্গল’-এ লিখেছেন, ‘ঘৃতে ভাজ নিমপাত।’ এর থেকে বোঝা কঠিন নয়, তেতোর প্রতি সেকালে বাঙালির টান কিছু কম ছিল না।

বাঙালির আর এক পছন্দের পদ ছিল রকমারি শাক। ‘চৈতন্য ভাগবত’-এর রচয়িতা বৃন্দাবন দাস তাঁর গ্রন্থে কুড়ি রকম শাকের উল্লেখ করেছেন। মুকুন্দরাম তাঁর রচনায় লহনা কীভাবে শাক রান্না করল তার বর্ণনা দিয়েছেন।

ঘৃতে জব জব কৈল নালিতার শাক,

কটু তৈলে বেথুয়া করিল দৃঢ় পাক।

সেকালে সরষের তেলকে বলা হত ‘কটু তেল।’ বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’-এও কটু তেলের উল্লেখ মেলে। যেমন ‘সাজ কটু তেল দিয়া রান্ধে বেগুন পোড়া।’ প্রাচীন ও মধ্যযুগেও বাঙালির হেঁশেলে ঘিয়ের কিন্তু ব্যাপক চল ছিল। বিজয়গুপ্ত নিজেই লিখেছেন, ‘সাজা ঘৃত দিয়া রান্ধে গিমা তিতা শাক।’ বংশীদাসের মনসামঙ্গলে আবার কাঁঠালের বিচি ভাজা হচ্ছে ঘি-তে। ‘কাঁঠালের বীজগুলি ভাজিলেক ঘৃতে তুলি।’

পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ও ষোড়শ শতকে বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ বা মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ যে নানাবিধ নিরামিষ তরিতরকারির উল্লেখ পাই তা থেকে জানতে পারা যায় কত রকমের নিরামিষ পদ সে যুগে বাঙালির রান্নাঘরে প্রচলিত ছিল। বিজয়গুপ্তের তালিকায় আছে, ‘বেগুন দিয়া রান্ধে ধনিয়া পোলতা’, ‘কলার থোড় রান্ধিতে বাটিয়া দিল রাই’, অথবা ‘সরিষা-বাটা দিয়া রান্ধে পানি কচুর চৈ’, ইত্যাদি। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এও পাই নানাবিধ তরকারির উল্লেখ যেমন, ‘বার্তাকু কুমূড়া কচা/ তাহে দিয়া কলা মোচা,’ ইত্যাদি অথবা ‘দুগ্ধে লাউ দিয়া খণ্ড/জ্বাল দিল দুই দণ্ড।’

প্রাচীন বাংলায় ডাল খাওয়ার চল অতটা ছিল না। মুকুন্দরামের কবিতায় আমরা শুধু মুগ, মুশুরি আর মাষকলাই ডালের উল্লেখ পাই যেমন ‘মুগ সূপে ইক্ষু রস’ বা ‘মসুর মিশিত মাষ/ সূপ রান্ধে রস বাস’ ইত্যাদি।

‘কানু বিনে যেমন গীত নাই’ ঠিক তেমনি কিন্তু মাছ বিনে বাঙালির কথা নেই। মাছ-ভাত বলতে কী বোঝায় তারও প্রচুর নমুনা মেলে এই মঙ্গলকাব্যগুলিতে। বরিশাল ও মৈমনসিংহের মানুষ যথাক্রমে বিজয়গুপ্ত ও দ্বিজ বংশীদাসের বর্ণনা থেকে জানতে পারি, নিরামিষ রান্নার পাশাপাশি সে সময়ের বাংলার মাছ ও মাছ রান্নার বৈচিত্র্য। বিজয়গুপ্ত লিখেছেন, ‘রান্ধি নিরামিষ ব্যঞ্জন হলো হরষিত।/মত্স্যের ব্যঞ্জন রান্ধে হয়ে সচকিত। মাগুর মত্স্য দিয়া রান্ধে গিমা গাচ গাচ॥/ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুল মাছ।’ দ্বিজ বংশীদাসের ‘মনসামঙ্গল’-এ আবার পাই কাতল, চিতল, কই, শোল প্রভৃতি মাছের উল্লেখের সঙ্গে তাদের রন্ধন-প্রণালীর এক চিত্র। যেমন, ‘বড় বড় কই মত্স্য, ঘন ঘন আঞ্জি।/জিরা লঙ্গ মাখিয়া তুলিল তৈলে ভাজি॥/কাতলের কোল ভাজে, মাগুরের চাকি।/চিতলের কোল ভাজে রসবাস মাখি আবার ‘পাবদা মত্স্য দিয়া রান্ধে নালিতার ঝোল।/পুরান কুমড়া দিয়া রোহিতের কোল’ ইত্যাদি।

এ তো গেল পূর্ববঙ্গের মানুষের মৎস্যপ্রীতি ও তাঁদের রান্নার কথা। পশ্চিমবঙ্গও কিন্তু এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের জন্ম হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া গ্রামে। তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’-এ দেখি ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য রান্না করছেন: ‘ঝাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই/কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।/ময়া সোনা খরকির ঝোল ভাজা সার/চিংড়ির ঝোল ভাজা অমৃতের তার।’

মধ্যযুগের বাঙালির হেঁশেলে মাংস নিষিদ্ধ ছিল না। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণেরা কিন্তু দেবীপূজায় নিবেদিত মাংসই গ্রহণ করতেন। খাসি, ছাগ, মৃগ, কাউঠা, এমনকী শজারুর মাংস খাওয়ার চল ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিজয়গুপ্ত লিখেছেন, ‘মাংসতে দিবার জন্য ভাজে নারিকেল।/ছাল খসাইয়া রান্ধে খাসির তেল।’ দ্বিজ দাসবংশী আবার লিখেছেন কাউঠার মাংসের কথা। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ উল্লেখ মেলে মৃগমাংসের। নানাবিধ মাংস দিয়ে রাঁধা হত নানাবিধ পদ আর তার ঝুরি ঝুরি নমুনা মেলে মধ্যযুগের সাহিত্যে। মাংস দিয়ে শুধু ঝোল নয়, ভাজা, পোড়া, শিককাবাব প্রভৃতির কথা লিখে গেছেন সেকালের কবিরা।

দ্বিজ বংশীদাস লিখেছেন, ‘কাউঠার রান্ধে মাংস তৈল ডিম্ব দিয়া।/তলিত করিয়া তোলে ঘৃতেতে ছাকিয়া’ ‘রাঁধিছে পাঁঠার মাংস দিয়া খর ঝাল।/পিঠালি বাটিয়া দিল মরিচ মিশাল’ ইত্যাদি। আর কবি ভারতচন্দ্র যা লিখলেন তাতে বোঝা যায় যে মুঘলাই খানার অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে সে যুগের বাঙালির হেঁশেলে। যেমন ‘কচি ছাগ মৃগমাংসে ঝাল ঝোল রসা।/কালিয়া দোলমা বাঘা সেচকি সমসা।’ শুধু কালিয়া, দোলমা নয়, কবি লিখলেন শবরদের মাংস খাওয়ার কথাও। তাঁদের তো আরও কোনও বাদবিচার নেই। ব্যাধপত্নী নিদয়া বলছেন, ‘প্রাণ পাই পাইলে পাকাল।/লুন দিয়া কিছু বাড়া, নকুল গোধিকা পোড়া,/হংস ডিমে কিছু তোল বড়া,/শজারু শিক পোড়া’/ইত্যাদি।

বাঙালির খাদ্যাভাসে অম্লব্যঞ্জনের আধিপত্যও কিছু কম ছিল না। তার মধ্যে মাছের অম্বলের চল সেই প্রাচীনকাল থেকে আর তার প্রমাণ পাই বিজয়গুপ্তর ‘মনসামঙ্গল’-এ। ‘একে একে যত ব্যঞ্জন রান্ধিল সকল।/শৌল মত্স্য দিয়া রান্ধে আমের অম্বল।’ আজও অম্লমধুর স্বাদের এই ‘আমশোল’ বাঙালির একটি অতি প্রিয় পদ।

পদ্মমুখীর রাঁধা ছাগ মাংসের রসা

উপকরণ: কচি পাঁঠা, আদার রস, টকদই, লঙ্কা, হলুদ, জিরে, তেজপাতা, গোটা গরমমশলা, নুন, ঘি।

ব্রাহ্মণদের জন্য রাঁধা এই নিরামিষ মাংসের রসাতে রসুন, পেঁয়াজের ব্যবহার করা হয়নি। রসা বাঙালির বিভিন্ন রন্ধন প্রকরণের একটি ধারা। মশলাদার কম ঝোলের রান্না এটি। বাটা কিংবা কোচানোর পরিবর্তে এতে আদা পেঁয়াজের রস ব্যবহার করতে হয়। রসাতে খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে রান্না করাই রীতি।

প্রণালী: মাংসতে টকদই ও সামান্য হলুদবাটা মেখে রাখুন। ঘি গরম করে তাতে তেজপাতা ও গোটা গরমমশলা থেঁতো করে ফোড়ন দিন। আদার রস ও জিরেবাটা দিয়ে কষুন। বাকি হলুদবাটা ও লঙ্কাবাটা দিন। দইমাখা মাংস দিয়ে ভাল করে নাড়ুন। স্বাদ অনুযায়ী নুন দিন। দইমাখা মাংস থেকে বেরুনো জল শুকিয়ে মশলার উপরে ঘি ভেসে উঠলে আন্দাজ মতো উষ্ণ জল দিন। মাংস সেদ্ধ হয়ে ঝোল কমে মাখোমাখো হয়ে এলে নামিয়ে নিন।

শেষ পাতে বাঙালির পছন্দ ছিল মিষ্টি পদ। এ ব্যাপারে আজও সে রুচির পরিবর্তন হয়নি। দধি, সন্দেশ, পরমান্ন, নানা রকমের পিঠা, মিষ্টি বড়া ছিল তাঁদের অতি প্রিয়। ভবদেব ভট্টের এক গ্রন্থ থেকে জানা যায় দুধ-ভাত ছিল বাঙালির প্রিয় খাদ্য। মঙ্গলকাব্যগুলিতে যেসব মিষ্টির উল্লেখ পাই তার মধ্যে দুগ্ধজাত মিষ্টির আধিক্য একটু বেশি। সেযুগের মিষ্টির তালিকায় পরমান্ন তো আছেই, আছে ক্ষীরখণ্ড, ক্ষীরপুলি ইত্যাদির উল্লেখ। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে সনকা পরিবেশন করেছেন ‘উত্তম ক্ষীরসা দিয়ে গঙ্গাজলি লাড্ডু।’ গঙ্গাজলি হল হিন্দুদের বাড়িতে প্রস্তুত মাঙ্গলিক নাড়ু।

‘ফুল্লরার সাধ ভক্ষণ’ কবিতাতে পাই, ‘মনে করি সাধ খাইতে মিঠা/খীর নারিকেল তিলের পিঠা/দুগ্ধে গুড়ে মিশায়ে লাউ/দধির সহিত খুদের জাউ/শুন প্রভু কিছু কহি অপর/চিঁড়া চাঁপাকলা দুধের সর’।

বাঙালির ভোজনের শেষে সর্বদাই ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’-এর ব্যবস্থা থাকে, সে কথা স্মরণে রেখে এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে উপসংহার টানি এক মিষ্টি ছড়া দিয়ে:

‘আয় রে আয় রে আয় রে আয় রে

বোঝাই করা হাঁড়ি হাঁড়ি

মণ্ডা মিঠাই কাঁড়ি কাঁড়ি

আছে যত সেরা মিষ্টি।

এল বৃষ্টি এল বৃষ্টি।’

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%