ওপার বাংলার মিষ্টি খবর

আলপনা ঘোষ

এ বাংলার মতো ওপার বাংলার মানুষজনের মধ্যেও মিষ্টিমুখের বাড়াবাড়ি আছে। এ দেশীয় বাঙালিদের মতো তাঁদেরও ভরপেটে শেষপাতে মুখে মিষ্টি না ছোঁয়ালে খাওয়াই অসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল আবার বিখ্যাত তার নিজস্ব বিশেষ মিষ্টির জন্য। নওগাঁয়ের প্যাঁরা সন্দেশের প্রচলন কবে থেকে শুরু তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। প্রথম দিকে এই সন্দেশ নাকি দেবদেবীকে নিবেদন করা হত। লোকমুখে শোনা যায় নওগাঁ শহরের মহেন্দ্রী দাস নামে এক ময়রা নাকি প্রথম এই সন্দেশ তৈরি শুরু করেন।

দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে ভাল ভাবে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর তৈরি করতে হয়। ক্ষীর যখন জড়িয়ে আসতে শুরু করে তখন সেই গরম ক্ষীর দুই হাতের তালুর মাঝখানে নিয়ে সামান্য চাপ দিতে হয়। এইভাবে তৈরি হয় প্যাঁরা সন্দেশ।

বনলতা সেনের নাটোরের আর এক খ্যাতি তার কাঁচাগোল্লাকে নিয়ে। এই মিষ্টিকে নিয়ে নাটোরবাসীর গর্বের শেষ নেই। এই মিষ্টির বিশেষত্ব হল এতে কাঁচা ছানার গন্ধ পাওয়া যায় যা অন্য কোনও মিষ্টিতে পাওয়া যায় না।

জনশ্রুতি আছে নিতান্ত দায়ে পড়ে নাকি তৈরি করা হয়েছিল এই কাঁচাগোল্লা। নাটোর শহরের মধুসূদন পালের মিষ্টির দোকানের খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত। দোকানে সারাদিন জ্বলত বেশ কয়েকটি বড় উনুন। সেইসব উনুনে প্রায় মন দুয়েক ছানার নানা প্রকারের মিষ্টি তৈরি হত যেমন রসগোল্লা, চমচম, পান্তুয়া, সন্দেশ ইত্যাদি। দোকানে কাজ করতেন জনা পনেরো কারিগর। একদিন দোকানে প্রধান কারিগর অনুপস্থিত। মধুসূদনের তো মাথায় হাত। এত কাঁচা ছানা পাক দিয়ে মিষ্টি বানাবে কে? ছানাকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে মধুসূদন সব ছানাতে চিনির রস ঢেলে নামিয়ে রাখতে বললেন তাঁর কারিগরদের। কী মনে করে কেউ একজন বোধহয় সেই চিনিমাখা ছানা চেখে দেখতে গিয়ে দেখেন তার স্বাদ হয়েছে অপূর্ব। নতুন মিষ্টির নামকরণ নিয়ে শুরু হয়ে গেল নানা জল্পনা-কল্পনা।

যেহেতু চিনির রসে ডোবাবার আগে ছানাকে কিছুই করা হয়নি অর্থাৎ কাঁচা ছানাই চিনির রসে ঢালা হয়েছে, তাই এর নাম দেওয়া হল কাঁচাগোল্লা। কাঁচাগোল্লা কিন্তু অচিরে রসগোল্লা, পান্তুয়া এমনকী পাক দেওয়া সন্দেশকেও স্বাদের দৌড়ে হার মানিয়ে দিল। ধীরে ধীরে মিষ্টান্ন প্রেমীরা এই মিষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। মধুসূদনও নিয়মিত এই মিষ্টি বানাতে থাকলেন। ক্রমে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কাঁচাগোল্লার চাহিদা এত বৃদ্ধি পেল যে মধুসূদনকে প্রতিদিন তিন থেকে চার মন ছানার কাঁচাগোল্লা তৈরি করতে হত। সেই সময়ে নাকি ঢোল বাজিয়ে জানানো হত কাঁচাগোল্লার কথা।

কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি এক সময়ে এমন ছড়িয়ে পড়েছিল যে নাটোর থেকে বিলেতের রাজপরিবারেও এই মিষ্টান্ন পৌঁছে গিয়েছিল। রাজশাহী গেজেট পত্রিকাতে তো কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি নিয়ে প্রবন্ধ পর্যন্ত লেখা হয়েছে।

এই মিষ্টি নিয়ে আর এক জনশ্রুতিও রয়েছে। নাটোর শহরের শুকুলপট্টি এলাকার লোকজনদের মধ্যে যে কাহিনি প্রচলিত আছে তা হল নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় একটু খামখেয়ালি প্রকৃতির ছিলেন। একদিন গভীর রাতে মিষ্টি খাওয়ার বায়না ধরেন তিনি। তখুনি ডেকে পাঠানো হল মিষ্টি বানানোর রাজকারিগরকে। কিন্তু এত রাতে কোথায় মিলবে মিষ্টি? কীভাবেই বা মিষ্টি তৈরি করা যাবে? নিরুপায় কারিগর গাভী দুইয়ে দুধ সংগ্রহ করে দুধ উনুনে জ্বাল দিয়ে ছানা তৈরি করে তাতে চিনি মিশিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে স্বাদু মিষ্টি বানিয়ে মহারাজকে খাইয়ে দিলেন। মিষ্টি খেয়ে রাজা তো মুগ্ধ। শুকুলপট্টিবাসীর মতে সেদিন থেকেই নাকি নাটোরের কাঁচাগোল্লার পথ চলা শুরু।

মুক্তাগাছার মণ্ডা শুধু খেতে স্বাদু নয়, তাকে ঘিরেও প্রচলিত আছে নানা কিংবদন্তি। ওই অঞ্চলে গোপাল পাল নামে এক ব্যক্তি স্বপ্নের মাধ্যমে এক ঋষির কাছ থেকে নাকি এমন মণ্ডা তৈরি করার আদেশ পেয়েছিলেন। শুধু কি তাই? এই সাধুই নাকি মণ্ডা তৈরি করার পদ্ধতিও শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

মুক্তাগাছার এই স্বাদু মণ্ডা নাকি একবার পাঠানো হয়েছিল রাশিয়ায় লৌহমানব কমরেড স্টালিনের কাছে। এমনই স্বাদ এই মণ্ডার যে তা স্টালিনের মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী মানুষের হৃদয়কে দ্রবীভূত করতে পেরেছিল। মণ্ডা খেয়ে তিনি এত প্রীত হয়েছিলেন যে প্রশংসাপত্র পাঠিয়েছিলেন মণ্ডাপ্রেরক মুক্তাগাছার তত্কালীন মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে।

নেত্রকোনা গ্রামের খ্যাতি আবার তার বালিশ মিষ্টির জন্য। এই মিষ্টির উপরে ক্ষীরের একটি প্রলেপ থাকে। এই মিষ্টির আকৃতির সঙ্গে পাশবালিশের সাদৃশ্য থেকেই এই মিষ্টির নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয় মানুষের ধারণা।

কুমিল্লা রসমালাইয়ের আদি উদ্ভাবক কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্যের ঘোষেরা। উনিশ শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এঁরা মিষ্টি সরবরাহ করতেন। সেই সময়ে রসগোল্লার সঙ্গে মালাইয়ের প্রলেপ দেওয়া এক প্রকারের মিষ্টির প্রচলন ছিল। কেউ কেউ একে মালাই রসগোল্লা বলত। পরবর্তীকালে দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর বানিয়ে তার মধ্যে রস নিংড়ানো রসগোল্লা ডুবিয়ে তৈরি হত ক্ষীর সমেত রসগোল্লা। এর নাম দেওয়া হয় ক্ষীরভোগ। ত্রিশ দশকে ছোট আকারের রসগোল্লা ক্ষীরে ডুবিয়ে পরিবেশন করা শুরু হয় আর তখন এই মিষ্টির নামকরণ হয় রসমালাই। অনেকের আবার ধারণা পাকিস্তানি আমলে অবাঙালিরাই নাকি কুমিল্লার এই মিষ্টির নাম দিয়েছিলেন রসমালাই।

সে যাই হোক না কেন স্বাদগুণে কুমিল্লার রসমালাই যে আজও সেরার সেরা তাতে কিন্তু ভোজনরসিকদের মনে কোনও সন্দেহ নেই। একবার তো সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় কুমিল্লার রসমালাইয়ের স্থান ছিল সব মিষ্টি পদের উপরে।

উল্লিখিত মিষ্টি ছাড়াও বাংলাদেশের আরও সহস্রাধিক মিষ্টির খবর মেলে যার মধ্যে রয়েছে যশোরের নলেন গুড়ের প্যাঁড়া সন্দেশ, মুনশিগঞ্জের অমৃতি, সিলেটের চুঙ্গাপুরা, শাহাজাদপুরের রাঘবসাই, পান্তোয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী প্রভৃতি স্বাদু মিষ্টি।

কাঁচাগোল্লা

উপকরণ: বাড়িতে করা জল ঝরানো ছানা, চিনির রস, এলাচগুঁড়ো।

প্রণালী: ছানা ভাল করে হাতের তালুতে আট-দশ মিনিট ধরে ডলে ডলে মাখুন। একেবারে মোলায়েম হয়ে গেলে এলাচের গুঁড়ো মিশিয়ে ছোট বলের মতো বানিয়ে ফেলুন। কাঁচাগোল্লা তৈরি। প্রায় এই পদ্ধতিতেই বানানো হয়েছিল সেই আদি কাঁচাগোল্লা।

দিন পালটেছে আর তার সঙ্গে পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবতর্ন। সে কথা মাথায় রেখে সামান্য পাক দেওয়া কাঁচাগোল্লার আর এক পদ্ধতি দিচ্ছি।

উপকরণ: নরম ছানা, চিনি, খোয়াক্ষীর, এলাচগুঁড়ো।

প্রণালী: হাতের তালুতে ছানা নিয়ে ভাল করে ডলে ডলে মাখুন। এবারে ননস্টিক ফ্রাইংপ্যানে ছানা এবং চিনি একসঙ্গে ভাল করে মেশান। কম আঁচে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। চিনি গলে মিশ্রণটি হালুয়ার মতো দেখতে হয়ে গেলেই দ্রুত প্যান উনুন থেকে নামিয়ে নিন।

বেশিক্ষণ আঁচে রাখলে কিন্তু ছানা শক্ত হয়ে যাবে। এবারে উনুন থেকে নামিয়ে এলাচগুঁড়ো মিশিয়ে ছানার মিশ্রণটি খুব ভাল করে ফেটান।

মিশ্রণ ঠান্ডা হয়ে গেলে ছোট ছোট বলের মতো বানিয়ে খোয়াক্ষীরে গড়িয়ে পরিবেশন করুন পাক দেওয়া কাঁচাগোল্লা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী

এই মিষ্টিটি চারকোনা, আকারে ছোট ও শক্ত। এর উপরে জমাট-বাঁধা চিনির প্রলেপ থাকে।

উপকরণ: ১ কেজি দুধের ছানা, চিনি ১ কাপ, তেজপাতা ১টি, ছোটএলাচ ৫টি, গুঁড়ো চিনি।

প্রণালী: দুধ থেকে ছানা কাটানো হয়ে গেলে ভাল করে জল ঝরিয়ে নিন। এবারে ওই ছানা ঠেসে মেখে চারকোনা আকারের ছোট ছোট মণ্ড তৈরি করে নিন। ১ কাপ চিনিতে ২ কাপ জল, তেজপাতা ও এলাচ দিয়ে সিরা তৈরি করুন। সিরা ঘন হলে আঁচ কমিয়ে ছানার মণ্ডগুলি দিন। মিষ্টিগুলি উপরে ভেসে উঠলে, রস থেকে তুলে গুঁড়ো চিনিতে ভাল করে গড়িয়ে রেখে দিন। ঠান্ডা হলে পরিবেশন করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%