কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি

আলপনা ঘোষ

কলকাতার ইহুদি প্রসঙ্গ উঠলেই একশো বছরেরও বেশি পুরনো প্রতিষ্ঠান ‘নাহুম্‌স’-এর কথাই প্রথমে মনে পড়ে। নিউ মার্কেটের এই ‘নাহুম্‌স’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ছোটবেলার বড়দিনের কত স্মৃতি।

ক্রিসমাসের ছুটির দিনগুলিতে মাঝে মাঝেই বাবার হাত ধরে ‘নাহুম্‌স’-এ যেতাম বড়দিনের কেক কিনতে। ভেতরে ঢুকতেই আভেন ফ্রেশ মাফিন, রিচ ফ্রুট কেকের মিষ্টি গন্ধ যেন আমাদের আদর করে ডেকে নিত। দোকানের এক কোণে মান্ধাতার আমলের একটি ক্যাশবাক্স সামলে বসে থাকতেন ডেভিড নাহুম, নাহুম অ্যান্ড সন্স-এর মালিক। খুদে খদ্দের দেখলেই নিজের আসন ছেড়ে হাসিমুখে উঠে আসতেন মধ্য ত্রিশের তরুণ ডেভিড। আমার পছন্দের ঠিক কেকটি কাচের খোলা বাক্স (আলমারি) থেকে বের করে তুলে দিতেন আমার হাতে। তখন তো ঠিক বুঝতে পারতাম না কিন্তু বড় হয়ে যখনই ওখানে গেছি, ওঁর সহৃদয়তা অনুভব করেছি। ব্যবসায়িক কাজকর্মের পাশেপাশে, ডেভিড নানা সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। কলকাতার প্রায় সব ক’টি ইহুদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই শুধু যে যুক্ত ছিলেন ডেভিড, তাই নয়, যুক্ত ছিলেন বেশ কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও। ইদানীং শরীর ভাল যাচ্ছিল না ওঁর। বয়সের ভারে কাবু হয়ে পড়েছিলেন। দোকানে আসাও অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। আজকাল নাহুম্‌সে গেলে ওঁকে খুব একটা দেখতে পেতাম না। ওঁর অসুস্থতার খবর কানে এসেছিল। সেদিন যখন খবরের কাগজের পাতায় ওঁর মৃত্যুসংবাদ পড়লাম মনে হল আমার জীবনের কিছুটা অংশ, আমার কৈশোরের কলকাতাও হারিয়ে গেল ডেভিড নাহুমের সঙ্গে।

দিন বদলাচ্ছে। আমার নিজের বয়সও তো কিছু কম হল না। ছেলেবেলার সেই নিউ মার্কেটের চেহারাতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু নাহুম্‌স সেই একই রকম থেকে গেছে। সেই অনুজ্জ্বল আলো, সেই পালিশ-ওঠা আসবাবপত্র আর এসব নিয়েই আমাদের ‘নাহুম্‌স’। আজকের প্রচার ও বিজ্ঞাপনের বাজারে সে তার পুরনো চেহারা নিয়েই টিঁকে রয়েছে। এতে তার বিক্রিবাটায় মনে হয় না কোনও ফারাক পড়েছে। আজও পৃথিবীর দূর দূর প্রান্ত থেকে কলকাতার প্রবাসীরা ফিরে ফিরে আসেন নাহুম্‌স-এর রিচ ফ্রুট কেক, রাম বল্‌স, চিজ-স্ট্র, প্যাটিস, চিজ় কেক বা মাংসের শিঙাড়ার স্বাদ নিতে। ডেভিড সাহেব তাঁর ইহুদি ধর্মের অনুশাসন মেনে শেষ জীবনে নিরামিষাশী হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তাঁর দোকানের চিকেন প্যাটিস, চিকেন প্যানথেরাস তৈরি বন্ধ হয়নি।

শুধু আক্ষরিক অর্থে নয় কলকাতার পরিচয় চিরদিনই একটি আন্তর্জাতিক শহর হিসেবে। প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কত যে ভিন দেশ, ভিন প্রজাতির মানুষ এই দেশে ও পরে এই শহরে পা রেখেছেন তার সঠিক হিসেব মেলা ভার। ইতিহাসের সূত্র অনুযায়ী সেই কোন মধ্য যুগে ইহুদি বণিকেরা প্রধানত বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ইউরোপ থেকে এই দেশের বিভিন্ন প্রদেশে আসতে শুরু করেছিলেন।

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে শালম আহারন কোহেন কলকাতাতে আসেন এবং তাঁকেই এই শহরের প্রথম ইহুদি বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে আগত ইহুদিদের এক বড় অংশ বাগদাদ থেকে এসে এই শহরে পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেছিলেন। এঁদের পরিচিতি হয়েছিল বাগদাদি ইহুদি হিসেবে। ইংরেজ শাসনকালে এঁদের সংখ্যা পৌঁছেছিল প্রায় ছয় হাজারে। ইজ়রায়েলের জন্মের পরে সে সংখ্যা ষাটে এসে দাঁড়ায়। এখন মেরেকেটে এ শহরে ত্রিশজন ইহুদিকেও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। কলকাতার সেই প্রাচীন ইহুদিদের মধ্যে অবশ্যই নাম করতে হয় ডেভিড জোসেফ এজ়রার যাঁর নামেই এজ়রা স্ট্রিটের নামকরণ। এই ধনী ব্যবসায়ীর পৃষ্ঠপোষকতায় এ শহরে গড়ে উঠেছিল ইহুদিদের উপাসনা মন্দির সিন্যাগগ, জিউইশ গার্লস স্কুল, এজ়রা ম্যানশন, চৌরঙ্গী ম্যানশন।

এই ইহুদিরা আবার কলকাতার মানুষজনের মতোই ছিলেন অত্যন্ত খাদ্যরসিক। বাগদাদ থেকে এ শহরে এসে ওঁরা পরিচিত হলেন এ দেশীয় শাকসবজি, মশলাপাতির সঙ্গে। জিরে, ধনে, হলুদ, লঙ্কা, মেথি, এলাচ, সরষে ইত্যাদি মশলা যোগ হল ইহুদি রান্নায়। বঙ্গভূমির তরিতরকারিও বাদ গেল না। লাউ, কুমড়ো, বরবটি, আলু প্রভৃতি সবজি ও এদেশীয় মশলার সঙ্গে ওঁদের নিজস্ব রন্ধনশৈলীর এক মেলবন্ধন ঘটিয়ে সৃষ্টি হল ফিশ স্ট্যু, আঞ্জুলি, চিকেন-মাকাল্লার মতো অসাধারণ সব ইহুদি পদ। দুধ বা ক্রিমের বদলে বাঙালিদের মতোই ওঁরা রান্নায় নারকেলের দুধ ব্যবহার করা শুরু করলেন। যেহেতু মধ্য প্রাচ্যে সেই সময়ে আলুর ফলন ছিল না তাই খুব সম্ভবত কলকাতায় আসার পরেই ওঁরা ওঁদের রান্নায় আলু দিতে শিখেছিলেন। শোনা যায় এক বাঙালি গৃহিণীর হেঁশেলে তৈরি আলুভাজা খেয়ে এক ইহুদি রমণী ওঁদের নিজস্ব পদ চিকেন মাকাল্লার সহযোগী পদ হিসেবে আলু মাকাল্লা রেঁধে ফেলেছিলেন। আজও এ শহরের ভোজনবিলাসীদের কাছে এই রান্নার পদটির পরিচিতি একান্তই কলকাতার ইহুদি পদ হিসেবে।

ইহুদিদের খাওয়া-দাওয়ার প্রসঙ্গে ওঁদের পারিবারিক রান্নাবান্নার পদ্ধতি ও নানা রীতি-নীতির প্রসঙ্গ এসে পড়ে। সেকালে কলকাতার ইহুদি বাড়িতে হেঁশেলের রাজ্যপাট চলত পরিবারের প্রবীণা সদস্যার কড়া অনুশাসন মেনে। আমিষ ও নিরামিষ পদের জন্য ব্যবহৃত হত পৃথক বাসনপত্র। এ ব্যাপারে গৃহকর্ত্রীর কড়া নজরদারি এড়িয়ে অন্যথা করার উপায় ছিল না কারুর। এ যেন আমাদের হিন্দু বিধবাদের ক্ষেত্রে ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি হত, অনেকটা সেই রকম। ইহুদিরা যেমন নিজেদের ধর্মের প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন ঠিক তেমনি ওঁরা ছিলেন অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই কারণে ওঁরা যখন দেখলেন কলকাতার হিন্দুদের কাছে গো-মাংস নিষিদ্ধ তখন তাঁরাও তাঁদের খাদ্য-তালিকার অন্তর্গত কিছু পদ গো-মাংসের বদলে পাঁঠা বা মুরগির মাংস দিয়ে রান্না করতে শুরু করলেন।

বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানে ইহুদি রান্নাঘরে সাজসাজ রব পড়ে যেত। উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হত হেঁশেল সাফসুতরোর কাজ দিয়ে। এর সঙ্গে চলত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপযোগী নানা ধরনের বিশেষ পদ রান্নার পর্ব। যেমন ওঁদের সাব্বাথ অর্থাৎ বিশ্রাম দিবস হল ইহুদি মতে শনিবার। সেদিন ওঁদের রান্নাঘরেও ছুটি, উনুন জ্বলবে না। বাঙালিদের যেমন রান্না পুজোতে উনুন জ্বালানো নিষেধ বলে আগের দিন বাড়ির গিন্নিরা সারা রাত জেগে নানা পদ রান্না করেন নিমন্ত্রিত আত্মীয়পরিজনদের জন্য, ঠিক তেমনি ইহুদিদের হেঁশেলে শাস্ত্রের অনুশাসন মেনে ওই দিনটির জন্য ইহুদি গিন্নিরা মাংস, আলু, বিনস, বার্লি দিয়ে এক বিশেষ স্ট্যু তৈরি করতেন এক অভিনব পদ্ধতিতে। শুক্রবার রাতে জ্বলন্ত উনুন বা হটপ্লেটের উপরে একটি পাতলা টিনের পাত পেতে আগুনের শিখাকে ঢেকে তার উপরে স্ট্যু-এর পাত্র বসিয়ে কম আঁচে সারা রাত ধরে রান্না চলত যা সাব্বাথ ডে-তে ওঁরা মহানন্দে খেতেন। এপ্রিল মাসে উদ্‌যাপিত হয় ওঁদের ‘পাসওভার’ উৎসব। এই উৎসবকে মিশরের ফারাওদের দাসত্ব থেকে ইহুদিদের মুক্তিলাভের উৎসব বলা হয়ে থাকে। সেদিন নাকি এমন পরিস্থিতিতে ওঁদের মিশর ত্যাগ করতে হয়েছিল যে খামির বা ইস্ট মেশানো পাঁউরুটির ময়দা গেঁজে ওঠা পর্যন্ত ওঁরা অপেক্ষা করতে পারেননি, রুটি বানানো বা খাওয়া তো দূরের কথা। আজও পাসওভার উৎসবের দিনে সেই দিনের স্মরণে আচারনিষ্ঠ ইহুদিদের রান্নাঘরে ইস্ট বা খামির জাতীয় পদার্থের প্রবেশ নিষেধ। কলকাতার তিন খাদ্য-গবেষিকা তাঁদের ‘ক্যালকাটা কুকবুক’-এ ইহুদি হেঁশেলে প্রস্তুত ‘মুসসা’র উল্লেখ করেছেন। এটি পাতলা বিস্কুটের মতো মুচমুচে এক ধরনের খামিরহীন রুটি যা ইহুদিরা ঘন খেজুর রসে ডুবিয়ে খেয়ে থাকেন। সেসব দিনে কলকাতার কলুটোলা স্ট্রিটে বেথএল সিন্যাগগের আশেপাশের কিছু দোকানগুলিতে মিলত এই ধরনের রুটি যা অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও স্ট্যু বা সুরুয়া দিয়ে খেতে পছন্দ করতেন।

এই পর্বের শেষে থাকছে ইহুদিদের একটি স্বাদু পদ।

আঞ্জুলি

উপকরণ: ভেটকি জাতীয় মাছের ফিলে, হলুদগুঁড়ো, পেঁয়াজ, বেগুন, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, লেবুর রস, নারকেলের দুধ, নুন, তেল।

প্রণালী: মাছের ফিলেগুলিতে এক চিমটে হলুদ ও স্বাদ অনুযায়ী নুন মাখিয়ে ভাপিয়ে নিন ও ঠান্ডা হলে সারা রাত ফ্রিজে রেখে দিন। মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজে নুন ছড়িয়ে রাখুন। পরের দিন রান্নার সময় পাতলা করে কাটা বেগুনের টুকরোকে নুন, হলুদ মাখিয়ে তেলে ভেজে নিন। কাঁচালঙ্কা ও ধনেপাতা কুচিয়ে রাখুন। নুন মাখানো পেঁয়াজের জল ঝরিয়ে মাছের ফিলেগুলি পেঁয়াজ দিয়ে ঢেকে দিন। এবারে এর ওপরে ভাজা বেগুন রেখে ঘন নারকেলের দুধ ঢেলে কুচোনো কাঁচালঙ্কা ও ধনেপাতা দিয়ে ঢেকে দিন। সব শেষে ওপর থেকে লেবুর রস ছড়িয়ে আবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিন। ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%