বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প

আলপনা ঘোষ

‘পাটিপত্র’ হল বাঙালি বিয়ের নানাবিধ আচারের মধ্যে প্রথম আচার যা ‘পাকাদেখা’ অনুষ্ঠান নামে পরিচিত। সাবেক কালে এই বিশেষ আচারের আর এক পরিচিতি ছিল ‘লগ্নপত্র’ বা ‘মঙ্গলাচরণ’ অনুষ্ঠান নামে। ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে নগদ বা গহনাপত্রে যৌতুক ও অন্যান্য দেনাপাওনা ও বিবাহের দিন ও শুভ লগ্ন চূড়ান্ত ভাবে স্থির করার জন্য প্রধানত ‘পাটিপত্র’ অনুষ্ঠানটি সাধিত হত।

আমার এক বাগবাজার নিবাসী বর্ষীয়সী আত্মীয়া আমাকে জানিয়েছেন যে সেকালে এই অনুষ্ঠানে মহিলাদের প্রবেশ নাকি নিষিদ্ধ ছিল। দুই পরিবারের বর্ষীয়ান প্রধান ও প্রবীণ পুরুষ সদস্যরাই কেবল এই ‘পাকাদেখা’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিবাহের বৈষয়িক দিকগুলি স্থির করতেন। সেই প্রাচীন কালে দুই পক্ষের মধ্যে লেখাপড়া করে নাকি লেনদেন স্থির হত।

চুক্তি সম্পন্ন হলে সোনার গহনা দিয়ে বধূর মুখ দেখতেন তাঁর ভাবী শ্বশুর মশাই। এই শুভকাজ উপলক্ষে বাড়ির ভিয়েনে প্রস্তুত বিশাল আকারের বাঙালির জবরদস্ত মিষ্টি রসগোল্লা, সন্দেশ ও দই দিয়ে ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক রীতিনীতি পালটেছে। পণপ্রথাকে সরকারি ভাবে বেআইনি ঘোষণা করা হলেও নির্মূল করা যায়নি। তার প্রমাণ মেলে যখন সংবাদপত্রে অসংখ্য অস্বাভাবিক বধূমৃত্যুর খবর দেখি। আজকাল আর পাকাদেখা অনুষ্ঠানে লেনদেন নিয়ে তাই প্রকাশ্যে কথা হয় না। তার পরিবর্তে বিবাহের দিন ও লগ্ন স্থির হয়। অনেকে আবার ‘পাকাদেখা’র দিনে আশীর্বাদের অনুষ্ঠানটিও সেরে ফেলেন। পরিবারের মহিলা সদস্যরাও এ অনুষ্ঠানে আজকাল উপস্থিত থাকেন।

‘পাকাদেখা’ অনুষ্ঠানে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে। শুধুমাত্র মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়নের পরিবর্তে এখন থাকে ভূরিভোজের আয়োজন। মত্স্যপ্রেমিক বাঙালির সব শুভকাজেই মাছের একটি মুখ্য ভূমিকা আছে কারণ বাঙালির কাছে মাছ একটি মঙ্গলচিহ্ন, তাই বিবাহের মতো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের শুরু যেহেতু ‘পাকাদেখা’ অনুষ্ঠান দিয়ে তাতে মাছকে তো থাকতেই হবে। এই কারণে ‘পাকাদেখা’ অনুষ্ঠানের খাদ্যতালিকায় নানাবিধ পদ থাকলেও তার সিংহভাগ জুড়ে থাকে বাঙালির অতি প্রিয় মাছ। তাই মাছকে মধ্যমণি করে ‘পাকাদেখা’র উৎসবে যে কয়েকটি পদ পেশ করছি, আশা করছি তা রেঁধে যেমন রাঁধুনি খুশি হবেন তেমনি তৃপ্ত হবেন তাঁর ভোজন-বিলাসী অতিথি।

কমলা-ফুল

উপকরণ: ফুলকপি, মাঝারি মাপের ১টি, আলু ২টি, কমলালেবুর রস, / কাপ, গোটা কমলালেবুর কোয়া, ১টি, তেজপাতা, ২টি, গরমমশলা, (২টি লবঙ্গ, ৩টি এলাচ, / ইঞ্চি টুকরো দারচিনি), পেঁয়াজ ২টি (কুচোনো), আদাবাটা, ১/ চা-চামচ, হলুদগুঁড়ো, / চা-চামচ, লঙ্কাগুঁড়ো, / চা-চামচ, জিরাগুঁড়ো, ১ চা-চামচ (ঐচ্ছিক), চেরা কাঁচালঙ্কা, ৩টি, নুন ও মিষ্টি, স্বাদ অনুযায়ী, তেল ৪ টেবিল চা-চামচ।

প্রণালী: ফুলকপির ফুল বড় টুকরো করে কেটে রাখুন। আলু টুকরো করে কেটে নিন। গোটা কমলালেবুর কোয়াগুলি আলাদা করে রেখে দিন। তেল গরম করে কপি ও আলুতে নুন হলুদ মেখে হালকা সোনালি করে ভেজে তেল ঝরিয়ে রাখুন। ওই তেলে তেজপাতা ও থেঁতো করা গোটা গরমমশলা দিন। সুগন্ধ বেরুলে পেঁয়াজ দিন। বাদামি রং ধরলে আদাবাটা দিয়ে কষুন। হলুদ, লঙ্কা ও জিরে গুঁড়ো সামান্য জলে গুলে ঢেলে দিন। চিনি দিয়ে কষুন, এতে রং সুন্দর হবে। ফুলকপি ও আলু দিন। নুন মেশান। সামান্য জল মিশিয়ে কমলালেবুর রস দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রাঁধুন। তরকারি সেদ্ধ হলে কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে নামিয়ে নিন। কমলালেবুর কোয়া দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন কমলা ফুল।

চিতল বাহার

উপকরণ: চিতলপেটি ৫০০ গ্রাম, বড় পেঁয়াজ ১টি (বাটা), আদাবাটা ১ চা চামচ, রসুনবাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদগুঁড়ো ১ চা-চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, পাকাতেঁতুলের ক্কাথ ২ চা-চামচ, গুড় ১ চা-চামচ, নারকেলকোরা ২ টেবিল চামচ, গোটা ধনে ১ চা চামচ, সাদা তিল ২ চা চামচ, ভাজা চিনাবাদাম ১ টেবিল চামচ, জিরে ১ চা-চামচ, শুকনোলঙ্কা ৪-৫টি লবঙ্গ ২টি, নুন স্বাদ অনুযায়ী, সরষের তেল পরিমাণ মতো।

প্রণালী: নারকেলকোরা, ধনে, সাদাতিল, জিরে, শুকনোলঙ্কা, চিনাবাদাম মিহি করে একসঙ্গে বেটে রেখে দিন। মাছ ধুয়ে তাতে নুন হলুদ মেখে হালকা করে সাঁতলে তুলে নিন। অন্য পাত্রে তেল গরম করে তাতে লবঙ্গ ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ, আদা, রসুনবাটা, গুড় দিয়ে কষুন। বাদামি রং ধরলে তাতে বাকি বাটামশলা দিন ও কম আঁচে নাড়ুন। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে তাতে মাছ ও / কাপ জল দিয়ে রাঁধুন। এবারে এতে নুন ও তেঁতুলের ক্বাথ মেশান। গ্রেভি মাখো মাখো হয়ে এলে কাঁচা সরষের তেল ও গোটা কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। নারকেলের স্লাইস দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

দই চিংড়ি

উপকরণ: গলদা চিংড়ি ৫০০ গ্রাম, বড় পেঁয়াজ ১টি (কুচোনো), রসুন ৪-৫ কোয়া (বাটা), আদা ২ ইঞ্চি টুকরো (বাটা), হলুদগুঁড়ো ১ চা-চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, টকদই ২০০ গ্রাম (ফেটানো), শুকনো খোলায় ভাজা জিরে ও শুকনোলঙ্কার গুঁড়ো ২ চা-চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি (চেরা), সরষের তেল / কাপ, নুন ও চিনি স্বাদ অনুযায়ী।

প্রণালী: চিংড়ি নুন হলুদ মেখে রেখে দিন। এবারে একটি পাত্রে তেল গরম করে চিংড়ি হালকা করে সাঁতলে তুলে নিন। একটি অন্য পাত্রে সোনালি করে পেঁয়াজ ভেজে তেল ঝরিয়ে রাখুন। ওই তেলে আদা রসুন ভাল করে কষে লঙ্কাগুঁড়ো সামান্য জলে গুলে ঢেলে দিন। মশলা থেকে ভাজা গন্ধ বেরুলে এবারে এতে নুন মেশানো খানিকটা দই, চেরা কাঁচালঙ্কা ও চিংড়ি মাছ দিয়ে কম আঁচে রান্না করুন। মাছ সেদ্ধ হয়ে এলে বাকি দইতে চিনি মিশিয়ে ঢেলে সামান্য সময় রেখে নামিয়ে রাখুন। মাছের উপরে ভাজা মশলার গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

টম্যাটোর স্বাদু চাটনি

উপকরণ: বড় টম্যাটো ৬টি (কুচোনো), মিহি করে কুচোনো আমআদা ২ চা চামচ, হলুদগুঁড়ো সামান্য, শুকনোলঙ্কা ১টি, পাঁচফোড়ন ১ চা-চামচ, তেজপাতা ২টি, মৌরি ১ চা-চামচ (শুকনো খোলায় ভাজা), খেজুর ৫-৬টি, আমসত্ত্ব ৩ টেবিল চামচ, কিশমিশ ২ টেবিল চামচ, পাতিলেবুর রস ৩ টেবিল চামচ, চিনি ১/ কাপ, তেল।

প্রণালী: তেল গরম করে তাতে পাঁচফোড়ন, শুকনোলঙ্কা ও তেজপাতা ফোড়ন দিন। ১ চা-চামচ আমআদা দিয়ে নেড়ে তাতে টম্যাটো, নুন, হলুদ দিন। টম্যাটো গলে গেলে নেড়েচেড়ে চিনি দিন। বাকি আমআদার সঙ্গে কিশমিশ, আমসত্ত্ব, খেজুর মেশান। লেবুর রস দিয়ে নেড়েচেড়ে নামিয়ে মৌরির গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

পরমান্ন

উপকরণ: দুধ ১ লিটার, কাওনের চাল ১ মুঠো, গুড় / কাপ বা স্বাদ অনুযায়ী, গুঁড়ো দুধ ২ টেবিল চামচ, ঘি ১ চা-চামচ, নুন ১ চিমটে, তেজপাতা ১টি, কিশমিশ।

প্রণালী: কাওনের চাল বেছে, ধুয়ে এক ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। পরে জল ঝরিয়ে নেবেন। দুধ উনানে বসিয়ে জ্বাল দিন। অন্য একটি পাত্রে ঘি গরম করে তাতে চাল নাড়াচাড়া করে রেখে দিন। দুধ ফুটে উঠলে চাল ও নুন দিন। মাঝারি আঁচে রাখুন। চাল সেদ্ধ হয়ে এলে গুড় দিন ও ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। / কাপ জলে গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে ঢেলে দিন ও নাড়ুন যাতে তলা থেকে দুধ কোনওভাবেই ধরে না যায়। পরমান্ন ঘন হয়ে এলে উপর থেকে কিশমিশ ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। অন্য পায়েসে এলাচের গুঁড়ো দেওয়া গেলেও, গুড়ের পায়েসে কখনওই এলাচ দেবেন না কারণ তাতে গুড়ের গন্ধ এলাচের গন্ধে ঢাকা পড়ে যাবে।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%