ইতালির পিৎজ়া

আলপনা ঘোষ

এই পৃথিবীতে হাতে গুনে তেমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নেই যেখানে তাদের বিশেষ কোনও একটি জাতীয় পদ আন্তর্জাতিক পদে পরিণত হয়েছে। ইতালি কিন্তু এমনই দুটি ডিশ নিয়ে গর্ব করতে পারে যা আজ সারা পৃথিবীর হেঁশেলে ঠাঁই পেয়েছে— আর সেই দুটি পদ হল পিৎজ়া এবং পাস্তা।

অনেকের মতে পিৎজ়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রিক শব্দ ‘পিটা’ থেকে যার অর্থ ফ্ল্যাট ব্রেড বা চ্যাপটা রুটি।

লোককথা অনুসারে জানা যায় যে কোনও এক যুদ্ধের সময়ে রোমান সৈনিকরা যখন রোম অধিকৃত প্যালেস্টাইনে অবস্থান করছিলেন তখন তাঁরা ‘Matzoth’ নামে একটি ইহুদি পদ খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। দেশে ফিরে ওঁদের মাধ্যমে সেই পদটি ইতালির হেঁশেলে ঢুকে পড়ে আর তারই রূপান্তরের ফলে যা আমরা পেয়েছি তা হল আজকের পিৎজ়া।

শোনা যায় নেপল্‌স শহরে নাকি প্রথম পিৎজ়া খাওয়া শুরু হয়েছিল স্থানীয় দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে। পরবর্তীকালে তাকে স্বাদু করতে তেল, রসুন, এক ধরনের ছোট মাছ ও মোত্জ়ারেলা পনির ব্যবহার করা হত। প্রথম পিৎজ়া ভোজনাগারের নাম ছিল পোর্ট আলবা। এখানে যে চুলা ছিল তাতে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির প্রস্তরখণ্ড জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হত, কারণ এগুলি ছিল উচ্চ তাপমাত্রা উত্পাদন সক্ষম যা পিৎজ়া তৈরির পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক ছিল।

ইতালির এই ছোট্ট শহরেই জগৎসেরা ‘পিৎজ়া মার্গারিটা’র জন্ম। ১৮৮৯ সালে নেপল্‌স বেড়াতে এসেছেন ইতালির রানি মার্গারিটা। রানির সাধ হল নেপল্‌সের এক নাম-করা পিৎরিয়াতেজ গিয়ে পিৎজ়া খাওয়ার। ওই দোকানের সেরা পিৎজ়া কারিগর র‍্যাফেলের উপরে ভার পড়ল রানির জন্য তাঁর সম্মানার্থে বিশেষ পিৎজ়া বানানোর। র‍্যাফেল অতি যত্ন নিয়ে ইতালির জাতীয় পতাকার অনুকরণে লাল, সাদা, সবুজ এই তিন রং ব্যবহার করে এক ভারী স্বাদু দর্শনধারী পিৎজ়া বানিয়ে ফেললেন। ব্যাফেল রানির নামে পিৎজ়ার নাম রাখলেন ‘পিৎজ়া মার্গারিতা’। পিৎজ়াতে তিনি লাল রং দিতে ব্যবহার করলেন টম্যাটো, সাদা রং দিতে মোত্জ়ারেলা চিজ আর তাজা সবুজ রঙের জন্য ব্যবহার করলেন বেসিল/ মিষ্টি তুলসীপাতা। পিৎজ়া খেয়ে ও দেখে রানির খুশি ধরে না। শুধু ইতালি নয় সারা পৃথিবীতে র‍্যাফেলের বানানো এই পিৎজ়ার খ্যাতি আজও অমর হয়ে আছে।

শিঙাড়াতে যেমন আলু ছাড়া কপি, কড়াইশুঁটি, চিনাবাদাম, মাংসের কিমা যুক্ত হতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে পিৎজ়ার অনুপান হতে পারে নানা ধরনের চিজ়, সবজি এবং মাংস।

এক ইতালীয় অভিবাসী আমেরিকানদের পরিচিত করায় পিৎজ়ার সঙ্গে। ১৯০৫ সালে নিউ ইয়র্ক শহরে নিজের রেস্টুর‍্যান্টে জেনারো লোমবার্ডি প্রথম পিৎজ়া তৈরি করেন, যদিও তাঁর এই প্রয়াস আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখেনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইতালিতে আগত আমেরিকান সৈন্যরা ইতালিয়ান পিৎজ়ার স্বাদে মুগ্ধ হন এবং তাঁদের উত্সাহেই আমেরিকাতে পিৎজ়া তৈরি শুরু হয়। শিকাগোতে প্রথম পিৎজ়া রেস্টুর‍্যান্ট ‘পিজ়ারিয়া উনো’-তে গভীর প্যানে তৈরি মোটা পিৎজ়া আমেরিকানদের পিৎজ়া-প্রেমী করে তোলে।

১৯৫৮-তে ৬০০ ডলার মূলধন নিয়ে ক্যানসাসে পিৎজ়া হাটের যে পথচলা শুরু আজ তা ছড়িয়ে আছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। ডমিনোস হল আর একটি পিৎজ়া সংস্থা যার খ্যাতিও আজ বিশ্বজোড়া।

এদের দৌলতে কলকাতাও আজ পিৎজ়া-প্রেমের জ্বরে জারিত। বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলেই পিৎজ়া স্বাদে মোহিত। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শুধু দূরভাষে পিৎজ়ার অর্ডার দিন আর পেয়ে যান স্বাদু পিৎজ়া।

কলকাতা শহরে খাঁটি ইতালিয়ান পিৎজ়া যেমন সহজলভ্য তেমনি আপনি পেতে পারেন ভারতীয় মশলা সহযোগে নানাবিধ স্থানীয় সবজি, মাছ, মাংস দিয়ে প্রস্তুত বাংলা-ইতালির ফিউশন পিৎজ়া।

নিজের হাতে সহজ পদ্ধতিতে বাড়িতে বানিয়ে ফেলুন আপনাদের পছন্দের পিৎজ়া আর তারই জন্য থাকছে মিক্সড পিৎজ়ার এক রন্ধন-প্রণালী।

পিৎজ়া

পিৎজ়ার উপকরণ: ময়দা ২ কাপ, ফ্রেশ ইস্ট ৩০ গ্রাম, নুন স্বাদমতো, সাদা তেল ১ টেবিল চামচ, ডিম ২টি, চিনি / চা-চামচ।

পিৎজ়া টপিং-এর উপকরণ: মাংসের কিমা, পেঁয়াজ, রসুনকুচি, টম্যাটো, ক্যাপসিকাম, মোত্জ়ারেলা চিজ, টম্যাটো কেচাপ, নুন ও চিনি স্বাদমতো, সাদা তেল।

প্রণালী: একটি পাত্রে ময়দা রেখে মাঝখানে গর্ত করে ডিম ভেঙে ওর মধ্যে ঢালুন ও তেল মেশান। সামান্য গরম জলে সামান্য চিনি ও পরিমাণ মতো শুকনো ইস্ট মিশিয়ে রেখে দিন। ফেনা মতো হলে ময়দার মিশ্রণে মিশিয়ে ভাল করে মাখুন। মণ্ড নরম করে মাখা হলে, একটি ভেজা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢেকে রেখে দিন যতক্ষণ না মণ্ডটি ফুলে-ফেঁপে দ্বিগুণ আকার নেয়।

অন্য একটি পাত্রে তেল গরম করে তাতে রসুন ও পেঁয়াজ দিন। রসুনের ভাজা গন্ধ বেরুলে কিমা ও নুন দিন। মাংস ভাজা ভাজা হলে চিজ ও টম্যাটো কেচাপ মিশিয়ে নামিয়ে নিন।

একটি পিৎজ়া পাত্রে তেল মাখিয়ে ময়দার রুটি বেলে ওপরে কিমা দিয়ে ঢেকে দিন।

ক্যাপসিকাম, টম্যাটো, পেঁয়াজ গোল করে কেটে সাজিয়ে দিন। গ্রেট করা অবশিষ্ট চিজ় দিয়ে ঢেকে প্রি-হিটেড ওভেনে ২৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেক করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%