কলকাতার ধোকলা

আলপনা ঘোষ

বছর দুয়েক আগে খবরের কাগজের পাতায় একটি ছোট সংবাদ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কলকাতায় বসবাসকারী আটশো জন গুজরাটির দল বেঁধে পুরো হল ভরতি করে এক পারিবারিক বাংলা চলচ্চিত্র দেখতে যাওয়া। এমন ঘটনা কেবল কলকাতাতেই ঘটা সম্ভব! দুই ভিন্ন প্রদেশের মানুষের মধ্যে এমন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পিছনে আছে দুই পক্ষের মানুষের সহৃদয় সহনশীলতা।

মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মতো গুজরাটিরাও কিন্তু ব্যাবসা বাণিজ্য করতেই কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। প্রায় একশো বছর আগে ওঁরা এ রাজ্যে এসে ব্যাবসা বাণিজ্য মন দিয়ে করতে শুরু করেন। কলকাতায় ওঁদের প্রথম ঘাঁটি ছিল এজ়রা স্ট্রিট, বড়বাজার এবং চিত্পুর। পরে অনেকেই ভবানীপুর অঞ্চলটিকে বসবাসের জন্য বেছে নেন।

গুজরাটিদের এক বৃহৎ অংশ জৈন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় খাদ্যাভাসের দিক দিয়ে এঁরাও কিন্তু প্রধানত নিরামিষাশী। এই সম্প্রদায়ের খাদ্যতালিকাভুক্ত পদগুলি শুধু স্বাদুই নয় স্বাস্থ্যকরও বটে। রান্নার ক্ষেত্রে নানাবিধ মশলা প্রয়োগ ও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনে সৃষ্ট পদগুলি এমনই বৈচিত্র্যময় যা স্বাদ ও দর্শনদারিতে এদের এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের খাদ্যরুচি নিয়ে ভোজনরসিক বাঙালির আগ্রহ অসীম। প্রতিবেশী গুজরাটিদের ধোকলা, খাণ্ডভী, গাঠিয়া প্রভৃতি পদ ক্রমে বাঙালিদের মধ্যে এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে প্রখর ব্যাবসাবুদ্ধি সম্পন্ন গুজরাটিরা এই জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে এই শহরে বেশ কয়েকটি ভোজনালয় খুলে ফেলেন। আজকাল তো বাঙালি মিষ্টির দোকানে, শিঙাড়া নিমকির পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে ধোকলা, নলেনগুড়ের সন্দেশের পাশে শ্রীখণ্ড, গুলাব জামুন।

বাঙালি বিয়ের খাদ্যতালিকাতেও গুজরাটি পদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যেমন ঘটেছে পাঞ্জাবি ও অন্যান্য প্রদেশের নানা পদের ক্ষেত্রে। তাই স্টার্টার হিসাবে যেমন আপনি পেয়ে যাবেন নানাবিধ গুজরাটি চাট, সামোসা তেমনি আবার মূল খাবারের মেনুতে পাবেন অতি স্বাদু গুজরাটি ডাল। চিনাবাদাম, লেবুর রস, টম্যাটো, গুড় ও খেজুর সহযোগে অড়হড় ডালের টকমিষ্টি এই দারুণ স্বাদু ডালটি এক কথায় ‘লা জবাব’। এই ডালে ফোড়ন হিসাবে ঘি-তে পড়বে জিরা, মেথি, কারিপাতা, লবঙ্গ, দারচিনি, তেজপাতা, হিং, শুকনো লঙ্কা, আদাকুচি, লঙ্কা ও হলুদগুঁড়ো।

গুজরাটিদের আর একটি পছন্দের ডিশ যা বঙ্গসন্তানদের মন জয় করেছে তা হল খাণ্ডভী। স্টার্টার হিসেবে যা বাঙালির নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছে।

খাণ্ডভী

এই খাণ্ডভী করতে লাগবে এক কাপ বেসন, / কাপ টকদই, ১ চামচ আদা, কাঁচালঙ্কাবাটা, হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো, স্বাদমতো নুন আর ১ চিমটে হিং। সাজানোর জন্য লাগবে ২ টেবিলচামচ নারকেল কোরা, ২ টেবিল চামচ ধনেপাতাকুচি, ২ টেবিল চামচ সাদা তিল ও ১ চা চামচ কাঁচালঙ্কা কুচি।

ফোড়নের জন্য চাই তেল, ৮-১০টা কারিপাতা, সরষে, তিল এবং কুচোনো কাঁচালঙ্কা।

বেসনের মধ্যে ঘোল, জল, আদা-লঙ্কাবাটা, হলুদ, হিং ও নুন মেশান। এমন ভাবে ফেটান যাতে বেসনের কোনও ডেলা না থাকে।

এবারে বেসনের গোলা আঁচে বসিয়ে খুন্তি দিয়ে ক্রমাগত নেড়ে যান যাতে তলায় ধরে না যায়। হাতের কাছে বেশ কয়েকটি স্টিলের থালা রাখবেন। এবারে বেসনের মিশ্রণ থালার ওপরে পাতলা করে ছড়িয়ে দিন। গরম গরম অবস্থায় এই মিশ্রণ লাগাতে হবে। এবারে থালায় মিশ্রণের প্রলেপ লাগানো হয়ে গেলে এবং ঠান্ডা হয়ে, জমে গেলে ছুরি দিয়ে থালার মাঝখানে একটা আঁচড় কাটতে হবে। ছুরির সাহায্যে একপ্রান্ত তুলে একটু টান দিলেই প্রলেপ থালা থেকে সহজে উঠে আসবে। এবারে হাত দিয়ে এই প্রলেপ রোল বানিয়ে নিন। এইভাবে প্রতিটি থালার প্রলেপ রোল করে নিয়ে সেগুলি / ইঞ্চি সাইজে কেটে নিলেই খাণ্ডভী তৈরি। খাণ্ডভীগুলি একটি প্লেটে সাজিয়ে রাখুন।

এবারে কড়াইতে তেল গরম করে তাতে সরষে দিন। ফুট ধরলে এতে কারিপাতা ও কুচোনো কাঁচালঙ্কা ও তিল দিন। সামান্য সাঁতলে খাণ্ডভীগুলোর ওপরে ঢেলে দিন। এবারে নারকেলকোরা ও ধনেপাতাকুচি দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন স্বাদু খাণ্ডভী।

ধোকলা

উপকরণ: ছোলার ডাল, সাদা তেল, ১ টুকরো আদা, কাঁচালঙ্কা, স্বাদমতো নুন, চিনি, সামান্য খাবার সোডা, পাতিলেবুর রস, কয়েকটি কাঁচালঙ্কা (বাটা), কালো সরষে, গোটা কাঁচালঙ্কা।

প্রণালী: সারারাত জলে ডাল ভিজিয়ে রাখুন। সকালবেলা ভেজানো ডাল জল ঝরিয়ে মিক্সিতে মসৃণ করে বেটে নিন। প্রথমে একটি পাত্রে ডালবাটা, সামান্য তেল, আদা, কাঁচালঙ্কাবাটা, লেবুর রস, স্বাদমতো নুন, চিনি, খাবার সোডা ও পরিমাণ মতো ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ভাল করে মেশান।

একট স্টিলের পাত্রে তেল মাখিয়ে সম্পূর্ণ মিশ্রণটি ঢালুন। এবারে স্টিমারে জল দিন। ফুটে উঠলে ধোকলার পাত্রটি এর মধ্যে বসিয়ে দিন।

১০-১৫ মিনিট স্টিম করুন। জমে গেলে নামিয়ে নিন। একটু ঠান্ডা হলে চারকোনা সন্দেশের মতো কেটে নিন।

অন্য একটি পাত্রে তেল গরম করে তাতে কালো সরষে, গোটা কাঁচালঙ্কা ও কারিপাতা দিন। মশলার গন্ধ বেরুলে ধোকলার উপরে ছড়িয়ে দিন। চাইলে সামান্য পরিমাণে কোরানো নারকেলও ছড়িয়ে দিতে পারেন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%