বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না

আলপনা ঘোষ

একসময় ইংরেজ-শাসিত ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতার খ্যাতি কিন্তু ভোজনরসিক শহর হিসাবেও কিছু কম ছিল না। যেহেতু সেই পুরনো কলকাতা ছিল নানা জাতির মিলনক্ষেত্র তাই তার খাদ্য-সংস্কৃতির মধ্যেও অনায়াসে ভিন্ন ধারার ছাপ পড়েছিল।

এই একই কারণে পর্তুগিজ, ফরাসি ও ওলন্দাজ প্রভাবও বেশি করে পড়েছিল কলকাতার বাঙালি ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের খাদ্য সংস্কৃতির উপরে। বিদেশি ও দেশি রান্নার এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটেছে ওঁদের খাদ্যরুচিতে। এ শহরে এখনও এমন কিছু ক্রিশ্চান পরিবার আছেন যাঁরা বংশ পরম্পরায় এই কৃষ্টিকে রক্ষা করে চলেছেন। এমনই এক পরিবারের মা ও ছেলের কথা বলি যাঁরা বাঙালি ক্রিশ্চান খাদ্য সংস্কৃতিকে শুধু যে বজায় রেখেছেন তাই নয়, সারা বিশ্বকে এই খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন।

কলকাতার অন্যতম সেরা রন্ধনবিদ হিসাবে প্রদীপ রোজারিওর নাম আজ আর কারও অজানা নয়। নানা দেশের রান্না নিয়ে নানা গবেষণার সিলমোহর তিনি ফেলেছেন তাঁর অসাধারণ সব রান্নায় যা তিনি অনায়াসে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। এই শহরের সেরা দুটি ভোজনালয় চলে তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে। প্রদীপ তাঁর ভোজনশালার টেবিলে বিশ্বকে এনে হাজির করেছেন ঠিকই, কিন্তু এত যশ ও খ্যাতি তাঁকে তাঁর মূলকে ভুলতে দেয়নি। তাই তাঁর রন্ধন-কৃতির মধ্যে বারবার ফিরে আসে বাঙালি ক্রিশ্চান খাদ্যসংস্কৃতির নানাবিধ পদ যার হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর মায়ের কাছে যিনি নিজেও একজন অসাধারণ রন্ধনশিল্পী।

বাঙালি ক্রিশ্চান খাদ্যরুচি কিন্তু বাঙালি হিন্দু, মুসলমান এমনকী কলকাতার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের খাদ্যাভ্যাস বা রুচি থেকে সম্পূর্ণ ভাবে পৃথক না হলেও তাঁরা তাঁদের রন্ধনধারায় বজায় রেখেছেন স্ববৈশিষ্ট্য। এই বিশেষ সম্প্রদায়টির রান্নাতে তাই মেলে বাংলা ধারার সঙ্গে ক্রিশ্চান রন্ধনধারার এক অপূর্ব মিশেল।

ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের রন্ধনরীতির থেকে বাঙালি ক্রিশ্চানরা কিন্তু আজও তাঁদের রন্ধনরীতিতে এক স্বচ্ছ স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলেছেন আর এখানেই এই রন্ধনধারার বৈশিষ্ট্য। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতীয় ক্রিশ্চান সম্প্রদায় যখন রান্নার মাধ্যম হিসাবে নারকেল, সূর্যমুখী তেল, ঘি প্রভৃতি নানাবিধ ব্যবহার করেন তখন বাঙালি ক্রিশ্চান সম্প্রদায় কিন্তু তাঁদের রান্নার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন শুধুমাত্র সরষের তেল। ওঁদের বিশেষ রান্না ‘ঠাকুরদার রোস্ট মাটন’-এর প্রধান মাধ্যম তাই বাঙালির আদি অকৃত্রিম ঘানির খাঁটি সরষের তেল।

প্রাচীনকালে নানা ইয়োরোপীয় জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বঙ্গভূমিতে এসে দীর্ঘকাল বসবাস করায় তাঁদের সংস্কৃতি, তাঁদের খাদ্যরুচির প্রভাব বাঙালি ক্রিশ্চানদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই সংক্রামিত হয়েছে। এদের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয় এই ঘরানার খাদ্য-সংস্কৃতিতে পর্তুগিজ প্রভাব। এর প্রমাণ মেলে ওঁদের ইলিশ মাছ রান্নাতে। যে ইলিশমাছ কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বা ভাপে সরষে ছাড়া বাঙালি ভাবতে পারে না, সেই ইলিশ মাছই কিন্তু বাঙালি ক্রিশ্চান হেঁশেলে রাঁধা হয় ভিন্ডালু মশলা দিয়ে। শুধু কি তাই? মিষ্টি কুমড়ো দিয়েও ওঁরা যে ভিন্ডালু পদটি করেন স্বাদে, গুণে তার জুড়ি মেলা ভার।

ক্রিশ্চান বাঙালি পদগুলির নামের মধ্যেও মেলে এই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের ছোঁয়া। যেমন ধরুন বেগুন, চিংড়িভাজা ও নানাবিধ দেশি মশলা দিয়ে তৈরি ‘আমাগো ভাজা কারি’ বা কাঁচালঙ্কা ও মশলা সহযোগে ওঁদের ‘মামুর লিভার আর গিজার্ড ঝটকা’ পদের কথা। কলকাতার বাঙালি ক্রিশ্চান পরিবারগুলি তো ‘ভাজাকারি’ ছাড়া তাঁদের মধ্যাহ্ন ভোজের কথা কল্পনাও করতে পারেন না। ধর্মে ভিন্ন হলেও বাঙালির ‘মাছে-ভাতে’ সংস্কৃতি তাঁদের মজ্জায় মজ্জায়। তাই মাছ তাঁদের খাদ্যতালিকায় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। গুজরাটিদের ‘ধোকলা’ আর পাঞ্জাবিদের ‘ডাল-মাখানি’র মতোই ওঁদের ‘ভাজাকারি’ ওঁদের রন্ধনধারাকে দিয়েছে এক বিশেষ পরিচিতি।

প্রদীপ রোজারিও আবার নিজের নাম জুড়ে ভিন্ন উপকরণ দিয়ে আর এক ‘ঝটকা’ ডিশ আমাদের উপহার দিয়েছেন যার নাম হল, ‘রোজারিও’স হ্যাম আর বেকন ঝটকা’। এই পদটি রান্না করতে তিনি সরষের তেলে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, শুকনোলঙ্কা দিয়ে হ্যাম ও বেকন নাড়াচাড়া করেন এমনভাবে যাতে মাংসতে বাদামি রং না ধরে এবং মাংসের নিজস্ব রসে পাক সম্পূর্ণ হয়। নামাবার আগে এতে যোগ করেন ধনেপাতা। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে অল্প সময় রান্না করে নামিয়ে কিছু সময় বাদে অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্ট্যান্ডিং টাইম’ দিয়ে তবে তা অতিথির পাতে পরিবেশন করেন। রোজারিও পরিবারের এই বিশেষ পদটি বাঙালির সাদা গরম ভাতের সঙ্গে দারুণ যাবে।

বাঙালি ক্রিশ্চানদের খাদ্যসূচির এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ‘পর্ক’ বা শুয়োরের মাংস। নানাভাবে এটি ওঁরা রান্না করেন। ‘পর্ক ভুনি’ বা ‘সসেজ ভাজা’ এরকমই একটি পদ যা রান্নার মাধ্যম সেই সরষের তেল আর এখানেই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ‘পর্ক ভুনি’র সঙ্গে এই রান্নার পার্থক্য। এই সসেজ ভাজার আর একটি বিশেষত্ব হল এঁরা এই পদটিতে ভিনিগারের বদলে ব্যবহার করেন পাতিলেবু বা গন্ধরাজলেবুর রস।

সাধারণ বাঙালি হিন্দুদের রান্নায় ফোড়ন হিসাবে ‘পাঁচফোড়ন’-এর ব্যবহার যথেষ্ট হলেও বাঙালি ক্রিশ্চান রান্নায় কিন্তু এই বিশেষ ফোড়নটি প্রায় ব্রাত্য। মাছে হলুদ ব্যবহারের চল থাকলেও, ওঁরা মাংস রান্না করেন হলুদ ছাড়াই।

বাঙালি ক্রিশ্চানদের এই বিশেষ রন্ধনধারাতে যেমন ঔপনিবেশিক রন্ধনধারা ও স্থানীয় রন্ধনরীতির এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটেছে, তেমনি আবার অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার রান্নার প্রভাবও এঁদের খাদ্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

কলকাতার বাঙালি ক্রিশ্চান পরিবারের অন্যতম পছন্দের পদ হল ‘চিকেন ভুনি’। প্রদীপ রোজারিওর মতে এই পদটিকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ খাদ্যবস্তু বলে মনে করলে তা ভুল হবে। এই পদটির সঙ্গে মিশে আছে ওঁদের সম্প্রদায়ের কৃষ্টি ও ধারা।

বাঙালি ক্রিশ্চানদের আর এক পছন্দ টক পদ। এমনই এক পদ হল ওঁদের ‘লাউ টক’। টুকরো করে কাটা লাউ ভাপিয়ে নিয়ে জল ঝরিয়ে রেখে দিতে হবে। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে কালোজিরা ফোড়ন দিয়ে তাতে ছেঁকে নেওয়া পাকা তেঁতুলের নির্যাস যোগ করে ফুটতে দিন ও পরিমাণ মতো নুন চিনি মেশান। একটু ঘন হলে লাউখণ্ডগুলি দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে কিছুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিন। এই পদটি ওঁরা পছন্দ করেন বিভিন্ন পদ খাওয়ার মাঝে মাঝে খেতে, শেষ পাতে খেতে নয়।

বাঙালি ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের সিলমোহর পদ ‘ভাজা-কারি’র রন্ধন প্রণালী থাকছে এই পর্বে।

ভাজা-কারি

উপকরণ: চিংড়ি, বেগুন, লঙ্কার গুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, কাঁচালঙ্কা, স্বাদমতো নুন এবং সরষের তেল।

প্রণালী: পাতলা গোল করে কাটা বেগুনের টুকরো আধ ঘণ্টা নুনজলে ভিজিয়ে পরে জল ঝরিয়ে রেখে দিন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে তাতে সব মশলা ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে হালকা করে কষুন। নুন মেশান। এবারে বেছে রাখা ধোয়া চিংড়ি দিন। সামান্য জল মেশান। পুরোটা বেশ মাখো মাখো হয়ে এলে আঁচ কমিয়ে সামান্য সময় রেখে তাতে জল ঝরানো বেগুন দিন। বেশ ভাজা ভাজা মতো হয়ে এলে সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন ‘আমাগো ভাজা কারি।’

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%