আলপনা ঘোষ
কোপ্তা কাবাব এ দুটি পদ বাঙালি হেঁশেলে কায়েমি হয়ে বসলেও, দুটি পদের উৎপত্তি নিয়ে নানা মুনির নানা মত। ভাষাবিদদের মতে আমাদের বাঙালি ‘কোপ্তা’ শব্দটি এসেছে পারস্য শব্দ ‘কুফতে’ থেকে। পারস্য ভাষায় যার অর্থ বাটা বা মিশ্রণ। আগেকার দিনে যখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্রয়োগ কৌশল সম্বন্ধে মানুষের কোনও ধারণা ছিল না, তখন মাংসের কিমা বানাতে ব্যবহার করা হত মস্ত মাপের হামানদিস্তা। মাংসের কিমা দিয়ে বানানো সেই গোলাকার পদার্থই পারস্য দেশে পরিচিত হয়েছিল ‘কুফতে’ নামে। সুদূর পারস্য দেশ থেকে কীভাবে, কবে কোপ্তা একদিন বাঙালির রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল সে আর এক গল্প।
বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে চপ, কাটলেটের সঙ্গে কোপ্তা, কাবাব প্রভৃতিকেও বিজাতীয় খাদ্যের তালিকাভুক্ত করেছেন যা নিরামিষ, আমিষ দুই প্রকার নিয়মেই প্রস্তুত হয়ে থাকে। আমার মায়ের একটি শতছিন্ন রন্ধন প্রণালীর বই আজও আমার সংগ্রহে আছে, যার নামটি উদ্ধার করতে পারলেও লেখিকার নামটি মলাটসুদ্ধ হারিয়ে গেছে। ‘রান্নার বই’ নামক এই গ্রন্থে যে ক’টি পাতা খুঁজে পেয়েছি তার মধ্যে এঁচোড়ের কোপ্তা, আলুর কোপ্তা, মোচার কোপ্তা, কাঁচকলার কোপ্তা, বেগুনের কোপ্তা এমনকী করলা দিয়ে প্রস্তুত নিরামিষ সব কোপ্তার রন্ধন প্রণালীর পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু আমিষ কোপ্তার রন্ধন প্রণালী।
বিপ্রদাস তাঁর গ্রন্থে এক ‘ইটালিয়ান মাংস গোলকের’ উল্লেখ করেছেন যা নাকি ইতালি থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচার ও ব্যবহার হয়েছে। তাঁর মতে এই মাংস গোলকই পরবর্তীকালে মাংসের কোপ্তার রূপ নিয়েছে। লেখক কোপ্তার পক্ষে কোমল মাংসই প্রশস্ত বলেছেন। তাঁর রন্ধন প্রণালী অনুযায়ী কোপ্তা বানাতে মাংস সুসিদ্ধ করে হামানদিস্তা বা শিলে পিষে তাতে বাদাম ও পেস্তাবাটা এবং তার সঙ্গে হলুদ, লঙ্কা, ধনে, আদা, পেঁয়াজ, দারচিনিগুঁড়ো ইত্যাদি মশলা ও নুন মেখে রাখতে হবে। এতে ডিমের তরল অংশ ও বেসন দিয়ে ভাল করে চটকাতে হবে। এবারে ঘি জ্বাল দিয়ে গাঁজা মরে গেলে তাতে মাংস দিয়ে অবিরাম নেড়ে নিন। মাংস বাদামি রং ধরলে নামিয়ে নিন এবং এক-একটি আমড়ার আকারে গড়ুন। এবারে প্রতিটি কোপ্তা বাকি ডিমের গোলায় চুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে গরম ঘি-তে ভেজে ঝাঁঝরা হাতায় করে তুলে গরম গরম পরিবেশন করুন। অতঃপর বিপ্রদাস লিখেছেন, ‘এইরূপ প্রস্তুত করা মাংসকে মাংসের কোপ্তা কহিয়া থাকে’ যদিও কোপ্তার আধুনিক রন্ধনকারীরা এ সম্বন্ধে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।
‘কাবাব’ নামটি বৈদেশিক হলেও এর উল্লেখ মেলে ভট্টিকাব্যে। যেমন ‘বুভুজে দেবসাৎ কৃত্বা শূল্যমুখ্যঞ্চ হোমবান’। উদ্ধৃত এই শ্লোকের অর্থ ‘হোমকার্য সমাপনপূর্বক (শ্রীরামচন্দ্র) শূলে পক্ব মাংস ঝলসাইয়া দেবতাদিগকে নিবেদন করিয়া (স্বয়ং) ভোজন করিলেন।’ (জয়মঙ্গলের টীকা দ্রষ্টব্য)। ভারতবর্ষে মুসলমান আগমনের বহু পূর্বে যেহেতু এই কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছিল, সুতরাং ওই উক্তিকে কোনওভাবে বৈদেশিক ভাবে প্রভাবিত বলে মনে হয় না। বর্তমানে যাকে কাবাব বলা হয় তা সেই প্রাচীনকালে নিষিদ্ধ তো ছিলই না, বরং দেবগণকে নিবেদন করার প্রথাও ছিল। শিককাবাবাদি যে হিন্দুদের প্রাচীন নিজস্ব তার প্রমাণ মেলে পাণিনির গ্রন্থে।
‘বরেন্দ্র রন্ধন’-এর লেখিকা কিরণলেখা রায় কাবাব প্রসঙ্গে লিখেছেন মত্স্য বা মাংস লোহার শিকে ফুঁড়ে আবশ্যকমতো ঝাল নুনাদি ও তৎসহ ঘৃত মেখে প্রদীপ্ত অঙ্গারের উপর ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝলসে নিলে ‘কাবাব’ প্রস্তুত হয়।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের ভোজনরসিক ও রন্ধনশিল্পী হিসেবে নামডাক কিছু কম ছিল না। নানাবিধ রান্নার মধ্যে কাবাব নিয়ে তাঁরা পরীক্ষা নিরীক্ষা কিছু কম করেননি। ওঁদের আবার এক ভোজন সংঘ ছিল, যার সভ্যদের ভোটে জেতা নির্ভর করত তাঁদের রান্নার হাতযশের ওপরে। একবার নাকি কবি জসীমউদ্দীন রান্নার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে ভোটে প্রায় হেরে যেতে বসেছিলেন। সেবার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে রক্ষা করতে বানিয়ে ফেলেছিলেন ‘জোসী কাবাব’। এইভাবে জসীমউদ্দীন সেদিন ভোটে জিতে গিয়েছিলেন শুধু কাবাবের গুণে।
খ্যাতনামা সাংবাদিক বাচ্চি কারকারিয়ার প্রথম জীবন কেটেছিল এই কলকাতা শহরে। তাঁর মতে কলকাতার জাকারিয়া স্ট্রিট আর পার্ক সার্কাস অঞ্চলের হোটেল মিয়াদের হাতে বানানো কাবাব স্বাদে, গন্ধে নাকি সারা দেশের মধ্যে সেরা।
আদারসুনবাটাতে মাংসপিণ্ড রাতভর ভিজিয়ে রেখে তাতে জিরে-ধনেবাটা মেখে পাতলা কাঠের শিকে ঢুকিয়ে যে কাঠিকাবাব তৈরি হয়, গুণগত মানের দিক দিয়ে দেশের উত্তরভাগের শিককাবাব কিংবা মুম্বাই শহরের ফুটপাতে বোটিকাবাব বলে যে পদার্থটি মেলে, বাচ্চির মতে তা কলকাতার কাবাবের ধারেপাশে পৌঁছুতে পারে না। নিজাম হোটেলের পরোটা জড়ানো কাঠি রোল কাবাবের কথা উল্লেখ করতেও বাচ্চি ভোলেননি।
ইংরেজ শাসকদের জমানার প্রথমদিকে এই কলকাতা ছিল নির্বাসিত সুলতানদের আশ্রয়স্থল আর সেই যুগে চিত্পুর ছিল মোগলাইখানার আঁতুড়ঘর। সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত কত রকম কাবাবের চলে এ শহরে। বটি, হাঁড়ি, পছিন্দা, ঘটি প্রভৃতি কাবাবের মধ্যে রান কাবাবকে সেরা আখ্যা দিয়েছেন কলকাতার তিন খাদ্য গবেষিকা। সেই কাবাবের রন্ধন প্রণালী দিয়ে ইতি টানছি এই পর্বে।
উপকরণ: পাঁঠার রান, পোস্ত, দারচিনি, ছোটএলাচ, বড়এলাচ, লবঙ্গ, মৌরী, জিরে, পেঁয়াজ, আদা, রসুনবাটা। ভাজার জন্য ঘি বা তেল, তেজপাতা, টকদই, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, স্বাদ মতো নুন।
প্রণালী: শিকের সাহায্যে রানের মাংস ভাল করে ফুটো ফুটো করে করে রাখুন। মিশ্রণের প্রথম সাতটি উপকরণ গুঁড়ো করে পেঁয়াজ, আদা, রসুনবাটার সঙ্গে মিশিয়ে মাংসতে ভাল করে মাখিয়ে কাচের পাত্রে চব্বিশ ঘণ্টা রেখে দিন। এবারে একটি মস্ত প্যানে তেল বা ঘি গরম করে তেজপাতা দিন। নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। ঘি সামান্য ঠান্ডা হলে টকদই, কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো ও নুন এতে দিয়ে আবার উনুনে বসান। মিনিট দুয়েক কষে মশলামাখা রান-এর মধ্যে দিয়ে মাঝারি আঁচে এপিঠ ওপিঠ করে নাড়ুন। দু’পিঠ বাদামি হলে ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রাখুন যতক্ষণ না মাংস থেকে নিঃসৃত রসে তা সুসিদ্ধ হয়।
সহজে সুসিদ্ধ করতে পেঁয়াজের সঙ্গে এক টুকরো কাঁচা পেঁপে বেটে মাংসতে মাখিয়ে রাখতে পারেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন