আলপনা ঘোষ
প্রথম যখন ‘ভোজনবিলাসে কলকাতা’ গ্রন্থটি লেখার চিন্তা মাথায় আসে, তখন বাংলা রান্নার একটি অতীত বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম।
কত জাতি, কত ভিন্ন-ভাষী, কত ভিন্ন-ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে এই শহরকে নিজের শহর মনে করে এখানেই থিতু হয়েছেন। তাঁদের সংস্কার, সংস্কৃতি আমাদের কলকাতাবাসীকে ঋদ্ধ করেছে যেমন, তেমনি দীর্ঘ সহবাসের ফলে তাঁরাও জীবনের ভিন্ন ক্ষেত্রে একাত্ম হয়ে উঠেছেন এই শহরবাসীর সঙ্গে। সেই কারণেই বোধহয় আজও পার্কস্ট্রিটবাসী, জন্মসূত্রে আর্মেনিয়ান, মিসেস স্টিফেনস দুর্গাপুজোর পরে বিজয়া করতে তাঁর আপিসে ঢোকেন সহকর্মীদের জন্য এক বাক্স সন্দেশ নিয়ে। দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে— এই গ্রন্থের অন্যতম বক্তব্য।
রন্ধন শুধু একক কোনও শিল্প নয়, তা সর্বতোভাবেই জীবনশৈলীর অঙ্গীভূত। আমাদের জীবন ও কৃষ্টির সঙ্গে নানা সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন ঘটেছে তার রাশি রাশি প্রমাণ মেলে রন্ধন-প্রক্রিয়া ও রসনাতে।
কলকাতা শহরে আজও যে অল্পসংখ্যক বাগদাদি ইহুদি অবশিষ্ট আছেন তাঁদের বিশেষ পছন্দের পদ ‘আলু মাকাল্লা’-র উদ্ভবের কাহিনিতে রয়েছে দুই ভিন্নদেশি প্রতিবেশীর আদানপ্রদানের গল্প। প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যে আলুর ফলন না থাকায় ইহুদিদের মধ্যে আলু খাওয়ার চল ছিল না তেমন। কলকাতায় বসবাস শুরু করার পরেই তাঁরা নাকি প্রথম আলু খেতে শুরু করেছিলেন। শোনা যায় এক বাঙালি বান্ধবীর বাড়িতে মুচমুচে আলুভাজা খেয়ে মোহিত হয়েছিলেন এক ইহুদি রমণী। বাড়ি ফিরে তিনি ভেজে ফেলেন নুন, হলুদ মাখা আলু আর তাঁদের চিকেন মাকাল্লার (Makallah) সহযোগী পদ হিসেবে তার নাম দিলেন ‘আলু মাকাল্লা’ যা আজও কলকাতাবাসী মুষ্টিমেয় ইহুদির কাছে বঙ্গ-ইহুদি সৌহার্দ্যের প্রতীক।
আবার আর্মেনিয়ানদের ‘দোলমা’ আর বাঙালির অতি প্রিয় চিংড়ি মাছের পুর-ভরা পটলের দোর্মার কথাই ধরুন না কেন। উপকরণে কিছু পার্থক্য থাকলেও এই পদ দুটির রন্ধন-প্রণালীতে কিন্তু যথেষ্ট মিল।
আমাদের পড়শি রাজ্যের অধিবাসী যেসব মানুষ জীবিকার সন্ধানে বা অন্য কোনও কারণে এ রাজ্যকে তাঁদের ঘরবাড়ি বানিয়েছেন বা ইউরোপীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত বর্ণময় সেইসব অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান— এঁদের সকলের সঙ্গে আমাদের আত্মিক বন্ধনের যোগসূত্র কিন্তু সেই রান্নাঘর।
তাই বুঝি আমাদের প্রতিবেশী সারদা তেওয়ারি আমার মায়ের কাছ থেকে শিখে তাঁর হেঁশেলে পাঞ্জাবি ‘নাস্তা’র বদলে বানিয়ে ফেলেন ময়দার ধবধবে সাদা ফুলকো লুচি আর কুমড়োর ছক্কা।
আমার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বন্ধু রোজির বাড়ির ‘পোচ্ড এগ ইন টম্যাটো গ্রেভি’, ‘ডিমের পোচের ঝোল’ হয়ে ঢুকে পড়ে আমার মা-ঠাকুমার রন্ধন-তালিকায়।
শহুরে বাঙালির আধুনিক রান্নাঘরে আজকাল গ্যাস ও বৈদ্যুতিক উনুন জ্বলে। শিলনোড়ার বদলে চালু হয়েছে বৈদ্যুতিক মিক্সি, গ্রাইন্ডার, মাইক্রোওভেন প্রভৃতি নানাবিধ যন্ত্র যাতে বাইরের জগতে কর্মরতা নারী সহজে এবং স্বল্প সময়ে প্রস্তুত করে ফেলতে পারেন নানা পদ।
সাবেককালে কিন্তু হেঁশেলের কাজ এত সহজ ছিল না। তবে সেসব দিনে ছিল যৌথ পরিবার আর রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করার লোকের অভাব ঘটত না। হাসি, গল্পগাছার মধ্য দিয়ে অনায়াসে সব কাজ সারা হয়ে যেত। সেসব দিনে ‘দোপাকা’ উনুন জ্বলত বৃহৎ পরিবারগুলিতে। বাড়ির মেয়েরা মাটিতে বসে রাঁধতেন, কুটনো কুটতেন। কাজের মাসি শিলনোড়ায় মশলা বেটে দিতেন। গুঁড়ো মশলার চল ছিল না তখন। সাবেকি পাকশালা এবং মা-ঠাকুমার রন্ধনশৈলীর কথা লিখতে গিয়ে এসবই অল্পবিস্তর লিখেছি আমি, যাতে নব্যযুগের রন্ধনশিল্পীরা ধারণা করতে পারেন যে কী পরিস্থিতিতে, কী পরিবেশে থেকেও ওঁরা সৃষ্টি করে গেছেন অসাধারণ সব স্বাদু পদ।
বাংলা ভাষাতে রন্ধন-সংস্কৃতি নিয়ে লিখব আর বাংলা রান্নার কথা লিখব না তা কি সম্ভব! প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এমন কিছু সাবেকি বাংলার রান্নার কথা ও কাহিনি আধুনিক পাঠকের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস করেছি আমি। আশা রাখি তাঁদের হাতে লুপ্তপ্রায় এইসব পদগুলি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে এই গ্রন্থের মাধ্যমে।
পরিশেষে কৃতজ্ঞতা আমার সকল শুভানুধ্যায়ী আত্মীয়-বন্ধুদের, যাঁরা নানাভাবে আমার এই কাজে সাহায্য করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন। ধন্যবাদ আনন্দ পাবলিশার্সকেও, আন্তরিক কৃতজ্ঞতা সাংবাদিক লেখক শ্রীসুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখে দেবার জন্য। সুসম্পাদক, প্রবন্ধকার শ্রীশমীক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়ে পরিমার্জন করে দিয়েছেন। বইয়ের শিরোনামটিও ওঁরই দেওয়া। তাঁর কাছে আমার ঋণের শেষ নেই।
আলপনা ঘোষ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন