আলপনা ঘোষ
বাঙালির প্রধান উৎসব দুর্গা পুজোর একটি প্রধান অঙ্গ হল দেবীকে নিবেদিত ভোগ। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পুজোর তিন দিনই ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ভোগ দেবার রীতি আছে। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী কিন্তু শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদেরই দেবীকে অন্নভোগ দেবার অধিকার ছিল। কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির দুর্গা পুজোর ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন। এইসব পরিবার কিন্তু এখনও ভোগের ব্যাপারে নিজেদের প্রাচীন ধারাকে বজায় রাখতে যথেষ্ট যত্নশীল।
পাথুরিয়াঘাটার রামলোচন ঘোষ দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন আনুমানিক ১৭৮৩ সালে। দোকানের কেনা মিষ্টি পুজোয় দেওয়ার রীতি ছিল না সে যুগে। তাই বাড়িতে তৈরি হত নানা রকমের মিষ্টি। এক বরফিই হত ভিন্ন রকমের। যেমন কাঠবাদামের বরফি, মুগের বরফি, পেস্তা বরফি ইত্যাদি। এ ছাড়া হত ক্ষীরের ছাঁচ, রসবড়া, চন্দ্রপুলি আর গুড় দিয়ে পাক দেওয়া নারকেলের নাড়ু।
শীতলভোগে থাকে লুচি, মিষ্টি ও চন্দনী ক্ষীর। এই ক্ষীর এখনও তৈরি হয় নতুন বাজারের নলিনচন্দ্র দাসের দোকানে।
আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বহু লোক এসে পুজোর দিনগুলিতে পাত পেড়ে খেয়ে যেতেন। ষষ্ঠী ও অষ্টমীর দিনে নানা নিরামিষ পদ রান্না হত অতিথিদের জন্য। নবমীর দিনে অতিথিদের ভিড় বেশি হত কারণ সেদিন থাকত তিন রকমের মাছ, পাঁঠার মাংস ও নানাবিধ মিষ্টি।
মহারাজ নবকৃষ্ণ দেব তাঁর শোভাবাজারের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন ১৭৭৪ সালে। ইংরেজভক্ত রাজার এই পুজোতে উপস্থিত ছিলেন লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ। সাহেব অতিথিদের তুষ্ট করতে এলাহি খানাপিনা ও তার সঙ্গে প্রচুর আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা করেছিলেন নবকৃষ্ণ। তাঁর বংশধরেরা এখনও এই পূজা চালিয়ে যাচ্ছেন সাবেকি প্রথা যতটা সম্ভব বজায় রেখে।
পুজোয় অন্নভোগ না হলেও বাড়ির ভিয়েনে বামুনঠাকুরের হাতে তৈরি নানা মিষ্টি ও নোনতা স্বাদের পদ নিবেদিত হত মা দুর্গার জন্য। সে প্রথা এখনও মেনে চলছেন বর্তমান প্রজন্ম। এদের মধ্যে উল্লেখ করতেই হয় খাজা, মিঠে গজা, চৌকো গজা, বালুসাই, দরবেশ, পান্তুয়া, নারকেল ছাপা ইত্যাদি মিষ্টি। এ ছাড়া থাকত দারচিনি সুবাস দেওয়া ক্ষীরের পুর ভরতি প্যারাকি, কটকটি, গরম শিঙাড়া, নিমকি এবং রাধাবল্লভী। দেববাড়ির আর এক বিশেষ মিষ্টি মতিচুর হল এক বিশাল মাপের লাড্ডু যার রং মুক্তোর মতো সাদা। পুজোর ভোগে শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের অধিকার থাকলেও, আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য থাকে লুচি, আলুর দম ও মিষ্টির ব্যবস্থা। সাধারণত বাড়ির সদস্যরাই যত্ন সহকারে অতিথিদের তা পরিবেশন করেন। সুগন্ধী চাল ও ফলের নৈবেদ্যর সঙ্গে নারকেল ও ক্ষীর দিয়ে তৈরি এ বাড়ির বিশেষ মিষ্টি ‘আগা’ সাজিয়ে দেওয়া দেবীর নৈবেদ্যের উপরে।
সন্ধ্যায় দেওয়া হয় মিছরি ভোগ। ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে বাড়ির মহিলারা লুচি-তরকারি খান। আর বিধবারা তিনদিনই খান লুচি-তরকারি যা ‘ভাজাঘর’ থেকে তৈরি হয়ে আসে। ঠাকুরের ভোগও তৈরি হয় এই ভাজাঘরে।
বিডন স্ট্রিটের ছাতুবাবু, লাটুবাবুর বাড়ির পুজোও কম প্রাচীন নয়। এবাড়ির ভোগে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি ও তিন রকমের সবজি। এই রান্নার বিশেষত্ব হল ভোগ রান্না হয় নুন ছাড়া। অতিথিদের জন্য অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। ওঁদের জন্য ভিয়েন বসে। খাদ্যতালিকায় থাকে রাধাবল্লভী, ছানার ডালনা, ধোঁকার ডালনা, ফুলকপির তরকারি, মিষ্টিদই, দরবেশ, লেডিকেনি ইত্যাদি।
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা দুর্গাপুজোও কিন্তু যথেষ্ট প্রাচীন। বড়িশাতে ১৬১০ সালে প্রথম পুজো শুরু। আজও এখানে পুজোতে দু’বেলা অন্নভোগ দেওয়ার প্রথা চালু আছে। পুজোয় মোট তিনবার অন্নভোগ হয়। সকালে দেবীকে দেওয়া হয় লুচিভোগ, তারপরে সাদাভোগ এবং খিচুড়িভোগ। মহাভোগে থাকে ঘি ভাত, প্রচুর পরিমাণে শুকনো ফল দেওয়া, বাসন্তী পোলাও, খিচুড়ি, চচ্চড়ি, বড়ির ঝাল, নানাবিধ মাছের পদ, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। সন্ধিপুজোয় ল্যাটা মাছ পুড়িয়ে তা ভোগে দেওয়া হয়। দশমীর দিন দেবীকে নিবেদিত হয় পান্তাভাত, খেসারির ডাল, কচুর শাক, কইমাছের ঝাল, চালতার অম্বল ইত্যাদি।
পাথুরিয়াঘাটার বাবু খেলাৎ ঘোষের বাড়ির পুজো প্রায় একশো আশি বছরের পুরানো। দেবীকে ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয় চন্দন সুবাসিত একটি মিষ্টি পদ যার নাম চন্দন ক্ষীর। এই পদটির রন্ধনপ্রণালী যথেষ্ট পুরানো। সন্ধ্যায় আবার জাফরান দেওয়া রাবড়ি নিবেদিত হয়। অষ্টমীতে থাকে ঘি-তে ভাজা শিঙাড়া-নিমকির মতো নানা স্বাদের নোনতা পদ। এ ছাড়া মিষ্টির মধ্যে থাকে চন্দ্রপুলি, মস্ত আকারের রাজভোগ, জল-ভরা তালশাঁস সন্দেশ। এসবের সঙ্গে থাকে বাড়িতে তৈরি নারকেলের নাড়ু, ক্ষীরের ছাপা মিষ্টি।
দর্জিপাড়ার মিত্রবাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স দুশো বছরের বেশি। এদের ভোগ একটু অন্য ধরনের। এঁদের ফল মিষ্টি নৈবেদ্যর সঙ্গে মাকে দেওয়া হয়, খিচুড়ি রান্নার সব কাঁচা উপকরণ। এ ছাড়া থাকে নানা রকমের বড়ি, ডাল, পোস্ত, বাদাম, পালংশাক ও আচার বা চাটনির পাঁচমেশালি উপকরণ যেমন তেঁতুল, কাঁচাআম, আমসি ইত্যাদি। রান্না করা ভোগ বলতে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি এবং নুন ছাড়া পাঁচ রকমের ভাজা ও মিষ্টি।
বিজয়া দশমীর দিন দেবীকে বরণ করার আগে বাড়ির মেয়েদের ভোগের প্রসাদ হিসাবে খেতে হয় শুক্তো, শাক, মাছ ও আচার।
বলরাম দে স্ট্রিটের দত্তবাড়ির পুজো শুরু হয়েছিল ১৮৮২ সালে। এই পরিবার হাটখোলার দত্তপরিবার নামে খ্যাত। ওঁদের বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব হল কুমারীপুজো। ষষ্ঠীর আগে থেকেই পুজোতে দেবীর ভোগ রান্নার জন্য ভিয়েন বসে এবং বামুন ঠাকুররাই ভোগ রান্না করেন। রাধাবল্লভী, লুচি, খাস্তাকচুরি, পদ্মনিমকি, লেডিকেনি, দরবেশ, নারকেল নাড়ু, খাস্তাগজা এবং মিষ্টিদই নিবেদন করা হয় দেবীকে। দশমীর দিন অতিথিদের জন্য খিচুড়ি এবং পায়েসের ব্যবস্থা থাকে।
উপকরণ: নারকেল কোরা; ছানা; খোয়া ক্ষীর; চিনি; কাজু; পেস্তা; কিশমিশ; বড় এলাচ।
প্রণালী: কোরানো নারকেল মিহি করে বেটে নিতে হবে। নারকেলের সঙ্গে ছানা ও মাপ মতো চিনি একসঙ্গে মিশিয়ে পাক দিতে হবে। তৈরি হয়ে গেলে পাথরের থালায় ঢেলে তাতে এলাচগুঁড়ো মেশাতে হবে। পুর হিসাবে নিতে হবে খোয়া ক্ষীর ও চিনির মিশ্রণ যা পিতলের কড়াইতে জ্বাল দিতে হবে। কাঠের হাতার সাহায্যে ক্রমাগত নাড়িয়ে এই পুর তৈরি করতে হয় যাতে লেগে না যায়। প্রায় আট-দশ ইঞ্চি মাপের স্যাঁকা কলাপাতার টুকরো হাতের চেটোতে পেতে তাতে গরম নারকেল ও চিনির মিশ্রণের লেচি রেখে কলাপাতা চার ভাঁজ করে চাপ দিতে হবে। চাপ দিয়ে বড় গোল তৈরি হলে ভিতরে পুর দিয়ে কলাপাতা কোনাকুনি ভাঁজ করতে হবে। তার পরে কাঁচি দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকার করে কেটে নিতে হবে। পরে কলাপাতা সরিয়ে কাজুবাদামের টুকরো, পেস্তা, কিসমিস, বড় এলাচ দিয়ে সাজাতে হবে। ধারগুলি বিনুনির মতো পাকিয়ে নিতে হবে। এই মিষ্টির কারুকাজই হল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন