বাকরখানির গল্প

আলপনা ঘোষ

আমার ঠাকুমা ছিলেন ঢাকার মেয়ে। বাকরখানি রুটি নিয়ে তাঁর কাছে কত গল্পই না শুনেছি আমাদের ছোটবেলায়। ঢাকার পুরানো সেই সব দিনে ওখানকার মানুষজন এই বাকরখানি রুটি দিয়ে সারতেন তাঁদের প্রাতরাশ।

হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর ‘ঢাকা পাঁচাশ বরষ পহলে’ বইতে ঢাকার খাদ্যাভাস ও রন্ধনপ্রণালী সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী ঢাকার মানুষজনের কাছে ভাত প্রধান খাদ্য হলেও নানা প্রকারের স্বাদু রুটির যথেষ্ট চল ছিল। এদের মধ্যে বাকরখানির স্থান ছিল এক নম্বরে। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক হল এই যে প্রতিটি রুটি তৈরির পেছনে ছিল এক পরম্পরার ইতিহাস। অনেকেরই জানা নেই যে এই বাকরখানির নামকরণের পেছনেও লুকিয়ে আছে এক করুণ প্রেমের কাহিনি।

সে অনেক কাল আগের কথা। মুর্শিদকুলি খান যখন দেওয়ান হয়ে ঢাকায় এলেন তখন তিনি সঙ্গে এনেছিলেন আগা বাকরখান নামে এক বালককে যাকে তিনি পুত্রস্নেহে পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই বাকরখান মস্ত বীর যোদ্ধা হিসেবে বহু যুদ্ধ জয় করে সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইতিমধ্যে তরুণ বাকর খানিবেগম নামে এক পরমা সুন্দরী নর্তকীর প্রেমে পড়েন। দু’জনের মধ্যে যখন গভীর প্রেম-পর্ব চলছে সেই সময়ে জয়নুল খান নামে এক অতি দুষ্ট কোতোয়ালের কুদৃষ্টি পড়ে খানি বেগমের ওপরে ও অসদুদ্দেশে তাকে সে অপহরণ করে। বাকর খান প্রেমিকাকে উদ্ধার করতে গেলে দু’জনের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। পরাস্ত হবার মুখে খানিবেগমকে হত্যা করে জয়নুল পালিয়ে যায়। বাকর খান প্রেমিকার রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখে শোকে আকুল হন। মুর্শিদকুলি খানের নির্দেশে বাকর পরে বিবাহ করলেও খানিবেগমকে তিনি কোনও দিন ভুলতে পারেননি। তাঁদের সেই প্রেমকে অমর করে রাখতে তিনি তাঁর পছন্দের এক ধরনের রুটির নামকরণ করেন বাকরখানি।

প্রাচীনকালে বাকরখানিওয়ালারা মাঝ রাতে তন্দুর জ্বালিয়ে রুটি তৈরি করতেন যাতে ভোরের আলো ফোটার মধ্যে রুটি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়। ময়দার সঙ্গে মেশাতেন খোয়া ক্ষীর ও ঘি। আজকাল অবশ্য দুধ আর ঘিয়ের পরিবর্তে বাদামি রং ও অন্য স্বাদ আনতে দেওয়া হয় গুড়ের মিশ্রণ।

আর এক ধরনের বাকরখানিতে প্রতি পরতে ঘিয়ের বদলে পড়ে সুজির মোহনভোগ। এই বাকরখানি রুটি আবার পরিচিত ‘ভিগারোটি’ বা ‘ভিজারুটি’ নামে। বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘন দুধের ক্ষীরে ভেজানো রুটি বাদাম ও কিশমিশ দিয়ে সাজিয়ে কনের বাড়ি থেকে বরের বাড়ি তত্ত্ব পাঠানোর রেওয়াজ ছিল এক সময়ে।

অবিভক্ত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হৃদ্যতার এক অসাধারণ যোগসূত্র ছিল এই বাকরখানি। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রাতরাশ করতেন ধোঁয়া ওঠা চা আর বাকরখানি দিয়ে। মুসলমানদের রমজান উৎসবের সময় ওঁদের এক মাস রোজা পালন করতে হয়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ওঁদের নিরম্বু উপবাসের সময়। ঢাকার হিন্দু কারিগরেরা তাঁদের মুসলমান ভাইদের বিশ্রাম দিতে, নিজেরা সারা রাত জেগে তন্দুর জ্বালিয়ে বানাতেন বাকরখানি।

ঢাকার বাকরখানির স্বাদ নোনতা হলেও চট্টগ্রামের লোকেদের আবার মিঠা পরোটার স্বাদ পছন্দ। তাই ওই এলাকার কারিগরেরা তন্দুর থেকে বাকরখানি বের করে চিনির সিরাতে ডুবিয়ে নিতেন।

পাকিস্তানে মানুষেরও পছন্দ মিষ্টি বাকরখানি। তাই ময়দা মাখার সময়ে মেশানো হয় চিনির জল। কাশ্মীর উপত্যকার মানুষজনের কাছেও এই রুটির জনপ্রিয়তা কম নয়। প্রাতরাশে যাই খান না কেন গরম গরম বাকরখানি রুটি থাকবেই।

ঢাকার বাকরখানি

উপকরণ: ময়দা ২ কাপ সেই সঙ্গে খামিরের ওপরে ছড়াবার জন্য অতিরিক্ত ময়দা, মাওয়া বা খোয়া ক্ষীর / কাপ, / চা-চামচ নুন স্বাদ অনুযায়ী, চিনি / চা-চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, জল / কাপ এবং ৩ টেবিল চামচ, তিল বাকরখানির ওপরে ছড়িয়ে দেবার জন্য।

মাওয়ার উপকরণ: ঘি ১ টেবিল চামচ, গুঁড়ো দুধ / কাপ।

মাওয়া প্রস্তুত প্রণালী: মাঝারি তাপে কড়াইতে ঘি গরম করে গুঁড়ো দুধ দিয়ে ক্রমাগত নাড়ুন। সামান্য সোনালি রং ধরলে নামিয়ে নিন। মাওয়া ছানা দিয়েও করা যায়। সেক্ষেত্রে সোনালি রং না ধরা পর্যন্ত ছানা নেড়ে নামিয়ে নিন। ঠান্ডা হলে, গুঁড়ো করে নিন।

বাকরখানির প্রস্তুত প্রণালী:

১। তন্দুর গরম হতে দিন।

২। ময়দা, মাওয়া, নুন, চিনি ও ঘি একসঙ্গে ভাল করে মেশান। ঝুরো ঝুরো হলে আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে জল মিশিয়ে ঠেসে ঠেসে মেখে খামির বা মণ্ড তৈরি করুন।

৩। একটি ভেজা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ময়দার মণ্ড মুড়ে আধ ঘণ্টা রেখে দিন।

৪। এর পরে মাখা ময়দাতে ঘি মাখিয়ে আরও কিছুক্ষণ রেখে দিন।

৫। এবারে বেলুনিতে ঘি মাখান ও মাখা ময়দা দু’ভাগে ভাগ করুন।

৬। কোনও শুকনো ময়দা ছাড়াই ময়দার এক ভাগ বেলুনির ওপরে যথা সম্ভব পাতলা করে বেলুন।

৭। আঙুলে খানিকটা ঘি নিয়ে বেলা রুটির ওপরে মাখান ও ওপর থেকে ময়দা ছড়িয়ে বেলুন ও রুটি ভাঁজ করুন।

৮। আবার ঘি ও ময়দা ছড়িয়ে রুটি দ্বিতীয়বার ভাঁজ করুন ও আলতোভাবে রোল করুন।

৯। রোল থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে রুটি বেলে নিন।

১০। মাখা ময়দার দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে ধাপ ৬ থেকে ৯-এর পুনরাবৃত্তি করুন।

১১। এবারে বাকরখানির ওপরে ছুরি দিয়ে তিনটি করে দাগ কাটুন ও তিল ছড়িয়ে তন্দুরে ঢোকান। মাঝে দু’বার করে বাকরখানিগুলির ওপরে ভাল করে দুধের ছিটা দেবেন।

১২। বাকরখানি সোনালি রং ধরলে নামিয়ে ঘি ছড়িয়ে কাবাবের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%