আলপনা ঘোষ
আমার বাপের বাড়িতে অনন্ত নায়েক ঢুকেছিল তরুণ বয়সে। বৃহৎ যৌথ পরিবারে আমার মা ঠাকুমাকে দৈনন্দিন রান্নার কাজে সাহায্য করতে বহাল হয়েছিল সে। পুরী থেকে জীবিকার্জনের উদ্দেশ্যে সে এসে উঠেছিল তার বাপ ঠাকুরদার সঙ্গে ভবানীপুরের ‘উড়িয়াপাড়া’য়।
অনন্তদাদা আমাদের বাড়ির লোক হয়ে গিয়েছিলেন। এ বাড়িতে থেকেই চুলে পাক ধরেছিল ওঁর। আমাদের তিন ভাইবোনের বিয়ের পরে স্বাস্থ্যের কারণে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।
প্রথম দিকে রান্নাঘরে সাহায্যকারী হিসেবে ঢুকলেও, পরে রান্নায় এমন কেরামতি দেখিয়েছিলেন যে আমার ঠাকুমা ওঁর হাতেই হেঁশেলের ভার অর্পণ করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। আমার পিতৃদেব জীবিকাসূত্রে চিকিত্সক ছিলেন কিন্তু তাঁর নেশা ছিল দেশবিদেশের নানাবিধ রান্না নিয়ে চর্চা করা। কাজেই অনন্ত নায়েক আসার পর থেকে বাবার আর্জি অনুসারে আমাদের হেঁশেলে ওড়িশি রান্নার অনুপ্রবেশ ঘটল। বাবা এবং অনন্তদাদার দৌলতে সেই আমার প্রথম ‘দালমা’ আর ‘চুড়চুড়া’র সঙ্গে পরিচয়।
একটা সময় ছিল যখন এই বঙ্গভূমিতে উড়িষ্যার পুরী অঞ্চলবাসী ব্রাহ্মণ রাঁধুনিদের বিশেষ চাহিদা ছিল। রাঁধুনি মানেই ধরে নেওয়া হত তিনি উড়িষ্যার মানুষ। কয়েক দশক আগে পর্যন্ত কলকাতায় বাঙালি বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান উদযাপনের সম্ভাবনা হলেই বাড়ির কর্তা ভবানীপুর অঞ্চলের ‘উড়িয়া-পাড়ায়’ গিয়ে হাজির হতেন। উড়িষ্যার ওস্তাদ রন্ধন কারিগরদের বাস ছিল এই অঞ্চলে। বেশির ভাগ পরিবারেই নির্দিষ্ট রাঁধুনি থাকতেন। রান্নার বরাত পেলেই নির্দিষ্ট দিনে সদলবলে হাঁড়িকুড়ি, হাতা, খুন্তি নিয়ে হাজির হতেন। যে ক’দিনের জন্য তাঁদের উপরে দায়িত্ব দেওয়া হত, সে ক’দিন বাড়ির মানুষদের আর রান্নার হ্যাপা নিয়ে ভাবতে হত না। প্রাতরাশ থেকে শুরু করে রাতের ভোজ— যজ্ঞিবাড়ির সব দায়িত্বই ওঁদের।
সব ধরনের রান্নাতেই উড়িষ্যার এই রন্ধনশিল্পীদের পারদর্শিতা ছিল। তখনকার দিনে বাড়িতেই ভিয়েন বসত। মিষ্টির সেরা কারিগরেরা মিষ্টি বানাতেন। উৎসবের শেষে সব কাজ সাঙ্গ করে পাওনাগন্ডা বুঝে নিয়ে রাঁধুনিঠাকুর যখন বিদায় নিতেন, গৃহকর্তা খুশিমনে তাঁদের উপরি দিতে ভুলতেন না। ওঁদের হাতের রান্না খেয়ে বাড়ির কর্তাও খুশ, নিমন্ত্রিত অতিথিরাও খুশ।
উড়িষ্যার এই রন্ধন-কারিগরদের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক যথেষ্ট প্রাচীন। ১৯২৭ সালে মানগোবিন্দ পাণ্ডা নামে এক ব্যক্তি উড়িষ্যা থেকে এসে কলকাতাতে খুলেছিলেন হিন্দু হোটেল। সে হোটেলের নিয়মিত খদ্দের ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা সুভাষচন্দ্র বসু। ঋষি অরবিন্দ সহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী মধ্যাহ্ন-ভোজন সারতে এখানে আসতেন। শুধু খাওয়া নয়, পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে বিপ্লবীরা কখনও কখনও গা-ঢাকাও দিতেন এই হোটেলে, এমনই আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল হোটেলের মালিক ও তাঁর গ্রাহকদের মধ্যে।
এই হোটেলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বারো-তেরো রকমের মাছের পদ। বাঙালির খাদ্যাভাস ও তাঁদের মত্স্যপ্রীতি সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন উড়িষ্যা থেকে আসা মানগোবিন্দ ও তাঁর সহযোগীরা। তাই মাছের পদগুলিকে স্বাদু করতে তাঁরা কোনও হেলাফেলা করতেন না আর তাতেই বোধহয় মজে গিয়েছিলেন অরবিন্দ থেকে শুরু করে নেতাজি ও সব বাঘা বাঘা বিপ্লবীরা।
ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রাদেশিক রান্নার তুলনায় ওড়িয়া রান্নাতে তেল মশলার চল চিরদিন কমই ছিল। কিন্তু ওঁদের রান্নার মুখ্য আকর্ষণ হল ফোড়ন। এই ফোড়নের গন্ধতেই বোধহয় অর্ধেক খাওয়া হয়ে যাওয়া সম্ভব।
এই প্রদেশের রান্নার আর একটি বিশেষত্ব হল নিকটবর্তী সীমানাভুক্ত অঞ্চলের প্রভাব। উড়িষ্যার দক্ষিণ ভাগের রান্নাতে আমরা অন্ধ্রপ্রদেশের রান্নার প্রভাব দেখতে পাই। সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল হিসেবে উড়িষ্যাবাসী শুধু যে সামুদ্রিক মাছের ভক্ত তাই নয়, মাছ রান্নার ব্যাপারেও ওঁদের পারদর্শিতা সর্বজনবিদিত।
অনেকের ধারণা, উড়িষ্যার রান্না তার বিস্তার পেয়েছে প্রতিবেশী রাজ্য বাংলা থেকে। এই ভাবনাটি কিন্তু সঠিক নয়। দুই প্রদেশের রান্নার মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্য। মাছে সরষেবাটা ব্যবহার বাঙালির বহুদিনের অভ্যাস এবং এ ব্যাপারে তার শিল্পনৈপুণ্য সন্দেহাতীত। উড়িষ্যাবাসীরও মাছে সরষেবাটা ব্যবহারে কোনও কার্পণ্য নেই, কিন্তু ওঁদের পদ্ধতিগত পার্থক্য ও কিছু বিশেষ উপাদানের ব্যবহার ওঁদের রান্নাকে দিয়েছে এক অন্য মাত্রা। ওঁরা সরষেবাটার সঙ্গে মেশান রসুন ও শুকনো লঙ্কাবাটা আর তাকে আরও স্বাদু করতে এতে যোগ করেন নুনমাখা কুচোনো আমসি। সরষের ঝাঁঝের সঙ্গে অন্য ধারার মশলার মিশ্রণ ও আমসির অম্লস্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এভাবে।
বাংলা মাছ রান্নায় একাধিক সবজির ব্যবহার যথেষ্ট প্রচলিত। সাধারণত আমরা বাঙালিরা মাছ ও সবজি আলাদা করে সাঁতলে নিয়ে তবে তো রান্না করি। উড়িষ্যার রান্নায় সবজি ভাজবার চল খুবই কম। ওঁরা সবজি সেদ্ধ করে তবে রান্না করেন। মাছের ক্ষেত্রেও প্রধানত কাঁচা মাছ গ্রেভিতে দিয়ে রাঁধবার রীতি ওঁদের।
বাঙালিদেরও অবশ্য বেশ কিছু মাছের পদ আছে যাতে মাছ না সাঁতলে রান্না করা হয়। সরষেবাটা দিয়ে ভাপে মাছ রান্না বা পাকা রুইমাছ দিয়ে দই মাছ হল এমনই কিছু পদ। আমার মাকে দেখেছি গঙ্গার টাটকা ইলিশমাছ না সাঁতলে রাঁধতে।
উড়িষ্যার একটি ভিন্ন স্বাদের মাংস রান্না খেয়েছি আমার অনন্তদাদার হাতে যার স্বাদ আজও আমার মুখে লেগে আছে। এই বিশেষ পদটি রান্না করতে রসুন, সামান্য পেঁয়াজ ও সরষে একসঙ্গে বেটে রাখতে হবে। আর পেঁয়াজ, টম্যাটো ও কাঁচালঙ্কা কুচিয়ে নিতে হবে। এবারে মাংসের কিমার সঙ্গে সব বাটা মশলা ও উপকরণ ভাল করে মেখে নিয়ে এতে যোগ করতে হবে হলুদ, লঙ্কা ও জিরে গুঁড়ো, সরষের তেল ও নুন। মাখা অবস্থাতে উনুনে এক ঘণ্টা মশলা-মাখা কিমা রেখে মাপ মতো জল দিয়ে রান্না করতে হবে যতক্ষণ না কিমা সেদ্ধ হয় এবং গ্রেভি শুকিয়ে মাখো মাখো হয়।
ছোট মাছ দিয়ে চুনা মাছের চুড়চুড়া হল উড়িষ্যাবাসীর একটি স্বাক্ষর ডিশ যা বাঙালি ভোজনরসিকদেরও বেশ পছন্দের। এর জন্য চাই মৌরলা মাছ, কলাই ডালের বড়ি, পাঁচফোড়ন, জিরে, সরষে, হলুদ, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, রসুন, পেঁয়াজ, নুন ও সামান্য তেল।
মাছে নুন, হলুদ মেখে ভেজে নিন। কাঁচালঙ্কা, সরষে, জিরে, রসুন একসঙ্গে বেটে রাখুন। কড়াইতে তেল দিয়ে বড়ি ভেজে তুলে নিন। কুচোনো পেঁয়াজ ওই তেলে দিয়ে সামান্য নেড়ে পাঁচফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ বেরুলে বাটা মশলা দিন ও অর্ধেক কষা হলে কুচোনো ধনেপাতা, চেরা কাঁচালঙ্কা, নুন, হলুদ ও সামান্য জল দিন। ফুটে উঠলে মাছ ও বড়ি ভেঙে দিন। পছন্দ হলে একটু লেবুর রস দিতে পারেন। জল শুকিয়ে এলে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন