আলপনা ঘোষ
আমার ছেলেবেলার বন্ধু খালেদা আলমের দেশের বাড়িতে একবার গিয়েছিলাম শবে বরাতের সময়ে। সেবার আমার অভিজ্ঞতা হয়েছিল উৎসবের আঁচে ওঁদের রান্নাঘর কেমন গনগনিয়ে ওঠে দেখার। সকাল থেকেই খালেদার আম্মি, চাচি, ফুফুরা ব্যস্ত হেঁশেলে। হাত চলছে যেমন, ওঁদের মুখেরও বিরাম নেই। ছোট ছোট সুখ দুঃখের কথার আদানপ্রদান, হাসিমশকরা করতে করতে কাজ এগুচ্ছে। উনুনের আঁচে লাল হয়ে ওঠা খালেদার আম্মির সেই হাসিভরা মুখ আজও চোখে ভাসে। সারাদিন ধরে ওঁরা হাতে হাতে বানিয়ে ফেলছেন চালের রুটি, নানা কিসিমের হালুয়া। কোনওটা সুজির, কোনওটা ছোলার কিংবা মুগ ডালের। শবে বরাতের রাতে এই রুটি আর হালুয়া বিলি হয় ভিখিরিদের মধ্যে। সন্ধে থেকে শুরু হয় বাজি পটকা ফাটানো। ইমামবারা, মসজিদ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে মোমবাতি জ্বালানো হয়।
খালেদার এক চাচি শবে বরাতে বানাতেন এক বিশেষ ধরনের হালুয়া। বিশাল এক হাঁড়ির মধ্যে চালের গুঁড়োকে ঘি-তে নেড়ে তাতে চিনি আর গুড় মিশিয়ে তাতে দিতেন গোটা গরমমশলা আর কিশমিশ। বড় বড় থালা-কুলোর ওপরে কাগজ বিছিয়ে রাখা হত তিনখানা করে রুটি আর চাচির বানানো সেই দারুণ হালুয়া। এক-একেকটা থালায় দশ-বারোটা করে ভাগ। এইভাবে সারা সন্ধে ধরে চলত হালুয়া বিলি।
বিয়ে শাদিতে ওপার বাংলার গাঁয়েগঞ্জে সেসব দিনে খাওয়াদাওয়াতে কিছু কম ঘটা হত না। ক’দিন আগে থেকে শুরু হত পিঠে বানানোর পর্ব। আত্মীয় কুটুমের আসা শুরু গায়েহলুদের আগের দিন থেকে। তাদের জন্য হরেক রকমের পিঠের আয়োজনের আগাম প্রস্তুতি নিতে হত। একেক রকম পিঠের জন্য চাই আবার একেক রকম চাল। ফুলপিঠার জন্য চাই আলোচাল, পাকনের জন্য আবার আলোচালের সঙ্গে লাগবে সোনামুগ। পিঠের জন্য চাল গুঁড়ো করাও কম ঝক্কির কাজ নয়। চাল গুঁড়ো হবার পরে চালুনিতে চালার পালা। মিহি গুঁড়ো আর মোটা গুঁড়ো আবার আলাদা করে চেলে, মোটা গুঁড়ো আর একবার তা মিহি করে গুঁড়ো করে নিতে হয়। এর পরে মস্ত এক হাঁড়ির ফুটন্ত জলের মধ্যে ছাড়া হয় ভাল করে ঠেসে চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো গোলা। সব ক’টা চালগুঁড়োর গোলা জলে ছাড়া হয়ে গেলে মাটির সরা দিয়ে হাঁড়ি ঢেকে ফুটতে দেওয়া হয়।
চালের গুঁড়ো সেদ্ধ করে পিঠের কাই তৈরি হলে সেই গোলা দিয়ে ছোট ছোট রুটি বেলে কলাপাতায় সাজিয়ে দেওয়া হয়, ফুলপিঠায় নকশা কাটায় দক্ষ বাড়ির দাদি, চাচি, আম্মা আর ফুফুদের সামনে। খেজুরের কাঁটা দিয়ে তাঁরা নকশা কাটেন। কত রকমের নকশা— কোনওটাতে ফুল, কোনওটাতে মাছ আবার কোনওটাতে জ্যামিতিক নকশা। সকাল থেকে সারাদিন ধরে চলে এই পর্ব। এর পরে শুরু হয় ডুবো তেলে একটি একটি করে পিঠে ভাজা। মুচমুচে এই ফুলপিঠা খাওয়ার সময় কড়মড়ে আওয়াজ হয় বলে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের মানুষ ভালবেসে এর নাম দিয়েছেন মড়মইড়া পিঠা।
বিয়ের পরে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর সময় চিঁড়ে, মুড়ি, পান, সুপুরির সঙ্গে যায় ডালা ভরতি ভাজা ফুলপিঠা। বাড়ির মেয়েদের হাতে কুরুশে বোনা রঙিন ঢাকনা দেওয়া ডালিতে দেওয়া হয় বাদামি রঙের পিঠা। খাওয়ার আগে আর একবার ডুবো তেলে ভেজে গরম গরম চিনির সিরায় ফেলে তবে তা পরিবেশন করতে হয়।
খেতে ধান পেকে সোনালি হয়ে এলে, তা কাটা হয়ে যায়। ধান ভাঙিয়ে যে চাল হয়, তা থেকে আলাদা করে রেখে দেওয়া হয় পিঠে বানানোর জন্য। শীতের প্রথম পিঠে হল নারকেলের পুর ভরা ‘মিঠে পুলি’। পিঠে পর্ব শুরু হবার আগে কিন্তু নিয়ম মেনে প্রথমে নতুন চাল দিয়ে শিন্নি বানিয়ে মসজিদে দিতে হয় আর বাচ্চাদের মধ্যে তা বিলোতে হয়।
শীতকালে খেজুর গুড় দিয়ে পোয়া বানানো হয়। স্বাদ আর গন্ধে অতুলনীয় এই পোয়া। গুড়ের ঘন সিরায় চালের গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি করা হয় পোয়ার কাই যা টগবগ করে ফোটা তেলের মধ্যে হাতায় করে এক হাতা করে ঢেলে দিলেই গুড়ের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসবে। লুচির মতো ফুলে ফেঁপে উঠবে পোয়া। বাঁশের সরু কাঠির ছুঁচলো দিক দিয়ে উলটে দিতে হয়। তারপরে গুড়ের মিঠে সুবাস নিয়ে একটি একটি করে তা পড়বে অপেক্ষমাণ ‘পোলাপানদের’ পাতে।
বিয়েবাড়ির সকালের নাশতায় চিতই পিঠা বা চালের রুটির সঙ্গে গোস্ত থাকবেই। ছেলেবেলায় চিতই পিঠে খেয়েছি ঝোলাগুড় আর নারকেলকোরা দিয়ে। কিন্তু এ পিঠে দিয়ে যে মাছের বিরানি বা ভুনা গোস্ত খাওয়া যায় এ ধারণা ছিল না। বাংলাদেশি বন্ধুদের দেখেছি আগের দিন রেঁধে রাখা শোলমাছের মুড়ো দিয়ে লাউঘণ্ট চিতই পিঠে সহযোগে খেতে। এর সঙ্গে যদি আবার ঝাল ঝাল কই মাছের বিরানি থাকত তা হলে তো জবাব নেই।
সাধারণভাবে বাঙালি হিন্দু ঘরে পৌষ-সংক্রান্তিকে ঘিরে পিঠের উৎসবের শুরু। নানা উপলক্ষে পায়েস করার রীতি থাকলেও সারা বছর ধরে পিঠে করার তেমন চল নেই। ওপার বাংলার মুসলমান সমাজে চিত্রটা কিন্তু একেবারে ভিন্ন। যে-কোনও উৎসব তা সে সামাজিক বা ধর্মীয় যাই হোক না কেন তার সঙ্গে পিঠের ছোঁয়া থাকবেই।
উপকরণ: আতপচাল, গম, মুগডাল, চিনি, ডিম, তেল।
প্রণালী: চাল, গম, মুগডাল আটার কল থেকে ভাঙিয়ে মিহি চালুনি দিয়ে চেলে নিন। চিনি দিয়ে ঘন সিরা তৈরি করে রেখে দিন। খানিকটা গুঁড়ি সরিয়ে রেখে বাকি গুঁড়ি অল্প জলে দিয়ে সেদ্ধ করে কাই তৈরি করুন। ঠান্ডা হলে সামান্য তেল ও ডিম দিয়ে ভাল করে মাখুন। এবারে বড় করে রুটি বেলে খেজুর কাঁটা দিয়ে নকশা কেটে ডুবো তেলে ভেজে দু’-তিন মিনিট সিরায় ডুবিয়ে রাখুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন