আলপনা ঘোষ
এককালে পয়লা বৈশাখের দিনটি ধুমধাম করে উদ্যাপিত হত আমাদের বাড়িতে। নতুন জামাকাপড়ের আকর্ষণ তো ছিলই আর ছিল খাওয়ার ঘটা। মা, ঠাকুমা সকাল থেকে ব্যস্ত পঞ্চব্যঞ্জন রান্নায়। আত্মীয়-পরিজনদের সেদিন ঢালাও নেমন্তন্ন থাকত আমাদের বাড়িতে। এসবই অবশ্য পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের কথা।
গত কয়েক দশকে সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে বাঙালির রন্ধন-রুচিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। যৌথ পরিবার ভেঙে খানখান, মহিলারা উচ্চশিক্ষিত এবং বহির্জগতে কর্মমুখী। আজকের ইঁদুরদৌড়ের দিনে অতিথির জন্য শুক্তো, মোচার ঘণ্ট বা মাছের পাতুরি রাঁধবার সময় নেই তাঁদের। অগত্যা অতিথি আপ্যায়ন করতে হোটেল, রেঁস্তোরাই ভরসা, যেখানে এইসব সাবেকি বাঙালি পদ নিয়ে উৎসব যাপনের শেষ নেই।
‘বাসনার সেরা রসনায়’। রসনাকে লালায়িত করার জন্য নানাবিধ স্বাদু ব্যঞ্জনের সম্ভারের কোনও অভাব নেই এদেশে। তাই রান্নার পেশাদার কারিগরেরা সদাই ব্যস্ত থাকেন, বিচিত্র সব উপকরণ এবং তাঁদের রন্ধননৈপুণ্যের সম্মিলিত সঙ্গতে সৃষ্টি করতে অভিনব সব পদ। কখনও তাতে থাকে তাঁদের রন্ধন-দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাবনার স্বাক্ষর, আবার কখনও বিদেশি বা প্রতিবেশী রাজ্যের প্রভাব।
নানা ভাষা, নানা জাতি, নানা রন্ধনশৈলী নিয়ে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। প্রতি রাজ্যে শুধু নয়, প্রতি পরিবারে আছে তার নিজস্ব ঘরানা। কবি ঠিকই বলেছেন, ‘বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’। চিরদিনের খাদ্যরসিক বাঙালি আজকাল শুধু শুক্তো, ধোঁকা বা মাছের কালিয়াতে তৃপ্ত নন। খাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা চান বিশ্ব-দর্শন করতে। খোদ কলকাতায় বসে তাঁদের চাই ‘প্রন ককটেল’, ‘চিকেন-প্রন-মাশরুম অগ্রাতোঁ’-র মতো সব বিদেশি পদ। তাঁদের কৌতূহল বর্মি, সিলোনিজ, থাই, আফ্রিকান, মধ্যপ্রাচ্যের নানাবিধ অপরিচিত ভিন্ন স্বাদের পদ নিয়ে। আর এর কোনওটাই এখন এ শহরে দুষ্প্রাপ্য নয়। শুধু উদরপূর্তি নয়, খাওয়াটা বাঙালির কাছে এক অজানাকে আবিষ্কার করার অভিজ্ঞতা।
এই তো সেদিন, আমার বন্ধুদের সঙ্গে এক ক্লাবে গিয়ে খেলাম ‘চিকেন শাওয়ারমা র্যাপ’ (Chicken Shawarma Wrap) নামে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অতি স্বাদু পদ। ক্লাবের লেবানিজ হেঁশেলে প্রস্তুত সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের পদটি আস্বাদ করে তো আমরা যারপরনাই মোহিত। রান্নার ভাবে বাঙালির ‘রোল’-এর সঙ্গে খানিকটা মিল যে নেই তা বলতে পারি না। কিন্তু আদি অনন্তকাল ধরে খেয়ে আসা সেই ‘চিকেন রোল’-এর একঘেয়েমি মুক্ত এই পদটির উত্তরণ ঘটেছে শুধু স্বাদে নয়, দর্শনদারিতেও। কুচনো সেদ্ধ মুরগিকে দই, লেবুর রস ও তাহিনি স্যস-এর মিশ্রণে জারিত করে তার মধ্যে যোগ করা হয়েছে শসা, পেঁয়াজ ও টম্যাটোর মিহি কুচি। পিটা রুটির মোড়কের মধ্যে পুর হিসেবে এই স্বাদু মিশ্রণটি ভরে ক্রিমের হালকা ছোঁয়া দিয়ে পরিবেশিত এই পদটির স্বাদ নিয়ে কোনও কথা হবে না। এই বিশেষ পদটির স্বাদের গোপন রহস্য হল এতে তাহিনি স্যসের জাদুর ছোঁয়া।
থেঁতো করা রসুন, তার সঙ্গে তিল-বাটা, পর্যাপ্ত পরিমাণ লেবুর রস এবং আধ-বাটা পার্সলিপাতা সব একসঙ্গে মিশিয়ে তাতে মাপ মতো উষ্ণ জল দিয়ে ব্লেন্ডারের সাহায্যে প্রস্তুত ঘন মিশ্রণটিই হল তাহিনি স্যস।
এখন তো আবার দেশি-বিদেশি মিশ্র-খাদ্য বা ফিউশন খাবার নিয়েও বাঙালির আগ্রহের অন্ত নেই। এই যে পদটি নিয়ে এত কথা বললাম, তা আবার নিরামিষ পদে রূপান্তরিত হয়েছে, মাংসের পরিবর্তে এতে ভারতীয় উপকরণ পনির যোগ করে। ওই ক্লাবের খাদ্যতালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের এই পদটির আর-এক পরিচিতি এখন ‘পনির শাওয়ারমা’ নামে।
সেই নেহরু আমলে ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’-এর যুগের অনেক আগেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে চিনদেশ থেকে মানুষজন এসে কলকাতার এক অংশতে নিজেদের বসতি বানিয়েছিলেন। আজও কলকাতার চিনা অধ্যুষিত একটি এলাকা পরিচিত ‘চায়না টাউন’ নামে। দীর্ঘদিন এ শহরে বসবাসের ফলে কলকাতার চিনাদের ভোজনরীতির উপরে একটা আঞ্চলিক প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় সবজি, স্থানীয় মশলাপাতি নিজেদের রান্নাতে ব্যবহার করতে শুরু করেন ওঁরা। শীঘ্রই কলকাতাবাসীদের মধ্যে ইন্দো-চিনা খাদ্যের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে দেশি-বিদেশি মিশ্র রন্ধনরীতির মেলবন্ধনের সেরা নজির মেলে ভারতীয় চিনাখাদ্যে। চিন-ফেরত বহু বঙ্গ ভ্রমণকারী দাবি করেছেন যে, ভারতীয় চিনা খাবারের সঙ্গে খাঁটি চিনা খাবারের নাকি কোনও সাদৃশ্যই নেই।
ইন্দো-চিনা খাদ্যের মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় পদগুলির অন্যতম হল চিলি পোট্যাটো বা ড্রাই চিলি চিকেন, গোবি মাঞ্চুরিয়ান, হাক্কা নুডলস প্রভৃতি পদ।
কলকাতার চায়না টাউনের এইসব চিনা খাবার আজ আর শুধু ভারতবর্ষের অন্য শহরেই নয়, পৃথিবীর প্রধান প্রধান শহরগুলিতেও যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে বাংলা রান্না আজ আর শুধু আলু পোস্ত, বিউলির ডাল, মোচাঘণ্ট, সরষেবাটা সহযোগে মাছ বা কলাপাতায় মোড়া মাছের পাতুরি বা মালাইকারিতে থেমে নেই। বাংলা রন্ধনশিল্পের কারবারীরা বুঝেছেন যে বাংলা সাবেকি রান্নাকে পুনরুদ্ধারের কাজটি যেমন সঠিকভাবে করতে হবে, সেইসঙ্গে এই বিশেষ রান্নাকে জনপ্রিয় করতে তাকে একটু অন্য স্বাদে, অন্য রূপে পৌঁছে দিতে হবে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষজনের কাছে। কলকাতা এমনই এক শহর যেখানে দেশি-বিদেশি অতিথিদের আনাগোনার বিরাম নেই। তাই নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই বঙ্গভূমির রন্ধনশিল্পকে আর তারই ফলশ্রুতি হিসেবে আমরা পাই এমন কিছু পদ যেখানে রন্ধনপদ্ধতিতে বিদেশি ধারা অনুসরণ করলেও উপকরণে ব্যবহৃত হয়েছে আমাদের দেশি মশলা। আবার এর বিপরীত দৃষ্টান্তও মেলে কোনও কোনও পদের ক্ষেত্রে। ইটালিয়ান পিৎজ়ায় কলকাতার এক শেফ তো টপিং হিসেবে ব্যবহার করেছেন তন্দুরি চিকেন!
একথা বুঝতে বাকি নেই যে, আজকাল মানুষজনের মধ্যে মিশ্র বা ফিউশন-রান্না নিয়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ শহরের নামী-দামি ভোজনালয়ের সেরা সেরা শেফরা অনায়াসে রেঁধে ফেলছেন মাছেভাতে বাঙালির প্রিয় কলমিশাক দিয়ে ‘বেকড কাঁকড়া’, পাঁচফোড়নে সুবাসিত ‘চিকেন এস্ক্যালোপ’ বা ‘অক্টোপাস মেলাঞ্জ’ কিংবা মা-ঠাকুমার হাতে তৈরি কাসুন্দি-সিক্ত ‘বেকন র্যাপড চিকেন’-এর মতো মুখরোচক সব ফিউশন-রান্না। এইভাবে কবে যেন চেনা স্বাদ এবং অচেনা রন্ধন-কলার এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে গেছে কলকাতার ভোজনসংস্কৃতিতে, খুলে গেছে স্বাদের দুনিয়ার নতুন দিক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন