আলপনা ঘোষ
বাস্তুশাস্ত্রের দৌলতে আজকাল বাড়ির মধ্যেকার প্রতিটি ঘরের সঙ্গে হেঁশেল নিয়েও লোকজনের চিন্তাভাবনা কিছু কম নয়। আগের তুলনায় আমরা এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। রান্নাঘর আর অবহেলিত নয়। আর তাই আধুনিক বাসগৃহে আলো-বাতাসহীন ঝুলকালি মাখা রান্নাঘরের চেহারা অকল্পনীয়। বাসস্থানের কোন অংশে হেঁশেল থাকবে তা স্থির হয় প্রধানত বাস্তুবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে। এ ব্যাপারে চিনের ‘ফেংশুয়ে’র অবদান কিছু কম নয়। ভারত ভূমিতেও কিন্তু বাস্তুশাস্ত্রের চর্চার শুরু সে কোন বৈদিক যুগ থেকে। সেই শাস্ত্র অনুসারে গৃহের দক্ষিণপূর্ব কোণে যেহেতু অগ্নিদেবের অবস্থান তাই হিন্দু পাকশালার জন্য এই দিকটিকে বেছে নেওয়া হত। শাস্ত্রের অনুশাসন মেনে রান্নার চুলা বা উনুন স্থাপন করা হত পাকশালার দক্ষিণপূর্ব কোণে।
মাটির সঙ্গে এ দেশের মানুষের প্রাণের যোগ গভীর। তারা ধরিত্রীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করে। সেই প্রাচীনকালে তাদের কর্মশীলতা, তাদের কার্যক্ষেত্র, তাদের দৈনন্দিন অভ্যেস— এ সব কিছুর সঙ্গে মাটির ছিল গভীর যোগ। তাদের খাওয়া, শোয়া, রান্নাবান্না, পূজাপাঠ, ধ্যান এমনকী পাশাখেলা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সাধিত হত এই মাটিতে। সেকালের রান্নাঘরে চুলাটি যেহেতু মাটিতে স্থাপন করা হত, তাই রাঁধুনিকে রান্না করতে জলচৌকি বা পিঁড়িতে বসতে হত। কুটনো কোটা, মশলা পেষা, বড়ি দেওয়ার মতো গৃহস্থালীর সব কাজই সংঘটিত হত মাটিতে বসে।
বৃহৎ যৌথ পরিবারের জন্য মধ্যবিত্ত বাঙালি হেঁশেলে মস্ত ‘দোপাকা’ অর্থাৎ পাশাপাশি একজোড়া বসা উনুন থাকত। হাঁড়ি, কড়াই প্রভৃতি বসাবার জন্য উঁচু ঝিঁক তোলা কয়লার উনুনের চল ছিল। উনুনের পাশে চূড়া মতো বস্তুটিকে ‘ঝিঁক’ বলা হত। এখনও গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কী শহরতলির পথে চায়ের ঠেকে ‘দোপাকা’ উনুনের দেখা মিলতে পারে। এই বাঁধানো উনুনের পাশাপাশি থাকত নানা মাপের ‘তোলা উনুন’। আমার দিদিমা ছিলেন সাত্ত্বিক হিন্দু বিধবা। মাঝে মাঝে তিনি এসে যখন আমাদের বাড়িতে থাকতেন, ঠাকুমাকে তাঁর প্রিয় বেয়ানের জন্য ‘তোলা’ উনুনে স্বাদু সব নিরামিষ পদ রান্না করতে দেখেছি। লক্ষ্মীপুজোর সময় ঠাকুরের ভোগ রান্না হত এই ‘তোলা’ উনুনে, আঁশ হেঁশেলের চৌহদ্দির বাইরে। উনুনে আঁচ দেবার মধ্যেও ছিল রকমারিত্ব। ঘুঁটে, কয়লা ছাড়া আঁচ দিতে ব্যবহার করা হত কাঁটা গাছের ডাল, আমের শুকনো আঁটি, কাঁইবিচি বা তেঁতুলের বীজ, পোড়া কয়লা ইত্যাদি।
সেকেলে গিন্নিরা নাকি উনুন ধরানোর সময়ে কাঠকয়লার সঙ্গে দিতেন প্রচুর পরিমাণে ভাল গুড়ের মুড়কি। মুড়কির ভাপে যে আঁচটি উঠত তাতে রান্নার স্বাদ বৃদ্ধি পেত। সুলেখিকা কল্যাণী দত্ত তাঁর ‘থোড় বড়ি খাড়া’ গ্রন্থে এসব তথ্য দিয়েছেন। উনুন প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তালপাতার তৈরি হাতপাখার কথা। আঁচ জোরালো হয়ে না উঠলে এই হাতপাখাই তখন মুশকিল আসান। উনুনের নীচে জোরে পাখা দিয়ে বাতাস করলে তবেই তো গনগনিয়ে আঁচ উঠবে।
বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘পাক-প্রণালী’ গ্রন্থে গোবর-মাটি দিয়ে উনুন নিয়মিত নিকোনো এবং ‘অঙ্গার ও ভস্মাদি’ উনুন থেকে তুলে ফেলার আবশ্যিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তাঁর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইতে ‘বাবুর্চি চুলা’র উল্লেখ করেছেন। এতে একসঙ্গে ইটের গাঁথনি করা নানা মাপের ছয়টি চুলা থাকত। এই চুলাতে বাবুর্চিরা যেমন গরম ছাইয়ের ওপরে পাত্র রেখে দমে রান্না করতেন, তেমনি বানাতেন পুডিং, পাই ইত্যাদি নানাবিধ বিদেশি পদ। অর্থাৎ ওই একই চুলাতে বেক/রোস্ট করা সম্ভব ছিল।
রান্নাঘরে কম করে দুটি করে বঁটি রাখতে হত। একটিকে বলা হত ‘আঁশ’ বঁটি যাতে মাছ কাটা হত। খাঁড়ার মতো ধারালো এই মস্ত বঁটিতে অনায়াসে কাটা যেত দশসেরি মাছের মুড়ো। অন্য বঁটিটি থাকত শাক-সবজি এবং ফলমূল কাটার জন্য। এখনও মনে পড়ে আমাদের ছেলেবেলার কথা। বাড়িতে বিয়েথা-র অনুষ্ঠান থাকলে মা-খুড়ি, জেঠি, মাসি, পিসি সবাই ঝুড়ি ভরতি আনাজ আর বিশাল আকারের বঁটি নিয়ে বসে যেতেন কুটনো কুটতে। কাঠের বারকোশে রাখা হত কাটা সবজি। কুটনো কাটার সঙ্গে চলত মেয়েলি গল্প, ঠাট্টা তামাশা। হাতে হাতে কাজ আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ— সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত।
পুজোর সময় নারকেলের নাড়ু বানাবার ধুম পড়ে যেত। বাড়ির মেয়েরা বঁটি-কুরুনি নিয়ে বসে যেতেন নারকেল কোরাতে। পুজোর বাসনের সিন্দুক থেকে বেরুত পেতলের মস্ত কড়াই, হাতা, খুন্তি। সেই কড়াইতে গুড় দিয়ে পাক দেওয়া হত বারকোশ ভরতি নারকেল কোরা। গুড় আর পাক দেওয়া নারকেলের গন্ধে ম ম করত সারা বাড়ি। হাতে হাতে তৈরি হয়ে যেত গরম নাড়ু।
রান্নাঘরের দাওয়াতে রাখা থাকত দুটো-তিনটে পাথরের তৈরি শিলনোড়া। একটিতে ভিজে বাটনা হত। হলুদ, শুকনোলঙ্কা, ধনে, জিরে, সরষে, পোস্ত ইত্যাদি গোটা মশলা। জল দিয়ে মিহি করে বাটতেন কাজের মাসিরা। শিল থেকে চেঁছেপুঁছে তুলে ঝকঝকে কাঁসার ছোট ছোট বাটিতে রাখা সদ্য বাটা মশলা দিয়ে রাঁধা হত ছক্কা, মোচাঘণ্ট, চচ্চড়ি, কালিয়া প্রভৃতি পদ। একটিতে পেষা হত শুকনো মশলা, গুঁড়ো করা হত সৈন্ধব লবণ। পেঁয়াজ, আদা, রসুন বা মাছ অথবা মাংসের কিমা বাটা হত আলাদা শিলে। পেতলের হামানদিস্তে ছিল গরমমশলা গুঁড়ো করার জন্য। দন্তহীন ঠাকুরদা ঠাকুমায়ের জন্য পান ছেঁচে দিতে ছিল ছোট মাপের হামানদিস্তে। মা ঠাকুমাকে দেখেছি লোহার হামানদিস্তেতে কাসুন্দির জন্য সরষে গুঁড়ো করতে।
রান্নার বাসনকোসনের মধ্যে রোজকার ব্যবহারের জন্য লাগত হাঁড়িকুড়ি, চাটু-কড়া, ডালের কাঁটা, পরাত, চাকি-বেলুন, হাতা-খুন্তি, চাল ধোওয়া ও ভাতের মাড় গালবার ধুচুনি। মাছ ধোওয়ার জন্য আলাদা করে রাখা থাকত আর একটি ধুচুনি। গরম হাঁড়ির কানা ধরবার জন্য লাগত হাতাবেড়ি। তালের সময় তাল-মাড়াই গামলা বেরুত তালের কাই বের করতে। তারপর সেই কাই দিয়ে তৈরি হত ক্ষীর আর বড়া।
গরমের দিনে পাথরের বাটিতে দই বসানো হত। পেট ঠান্ডা রাখতে মিছরি ভেজানো জল খাওয়ার চল ছিল। সেই মিছরি ভিজিয়ে রাখা হত পাথর বাটিতে। পাতের পাশে ছোট ছোট পাথরের বাটি ভরতি করে অম্বল চাটনি পরিবেশন করা হত। বিধবারা বারোমাস পাথরের বাসনে খেতেন। সধবারা ব্রত পালনের সময়ে পাথরে ফলার করতেন।
সেকালে পেতল কাঁসা ব্যবহারের যুগ ছিল। যেসব গিন্নির বাসনের শখ থাকত, তাঁরা সংগ্রহ করতেন বিভিন্ন অঞ্চলের সেরা সব বাসনপত্র— রকমারি থালাবাটি, রেকাবি। মুর্শিদাবাদের খাগড়াই বাসনের খুব নামডাক ছিল এক সময়ে। খাগড়া অঞ্চলের পদ্মকাটা বাটি, কামরাঙা বাটি, ধুতরোফুলি গেলাস সংগ্রহে না থাকলে সে বাড়ির গিন্নির মাথা হেঁট। কাঁসার বাসন তৈরিতে মেদিনীপুরও পিছিয়ে ছিল না। কর্তার জন্য বরাদ্দ থাকত যে জামবাটি ভরতি মাংস সেই মস্ত কাঁসার বাটিটি আসত মেদিনীপুর থেকে। পূর্ববঙ্গের ঢাকাই বা সুলতানপুরি বাসনের খ্যাতিও কিছু কম ছিল না সে যুগে। আসামেও তৈরি হত ভাল কাঁসার বাসন। হাতির পায়ের ছাপের মতো মস্ত ‘হাতিখুঁজিয়া’ বাটি বা ‘বানবাটি’ ইত্যাদির দেখা মিলত বনেদি বাড়ির হেঁশেলে।
যৌথ পরিবারে বাসন রাখা হত দুটো-তিনটে কাঠের সিন্দুক ভরতি করে। একটিতে থাকত পুজোর বাসন— যেটির স্থান ছিল পুজোর ঘরে। রোজকার ব্যবহারের বাসনপত্র যেমন কাঁসার থালা, বাটি, গেলাস কখনও একটি জলচৌকি বা হেঁশেলের বাঁধানো তাকে উপুড় করে রাখা থাকত আর ভারী বাসন ঢোকানো থাকত সিন্দুকে। তৃতীয় সিন্দুকটিতে থাকত তোলা অথবা শৌখিন বাসনপত্র।
খাবার জল থাকত পেতলের ঘড়ায়। গ্রীষ্মের দিনে ঠান্ডা জল খেতে হলে মাটির কুঁজোয় জল রাখা হত। আমাদের ছেলেবেলায় ফ্রিজের চল ছিল না। ভারী মিষ্টি লাগত ফিটকিরি মেশানো কুঁজোর ঠান্ডা জলের স্বাদ।
রান্নাঘরের একটি অতি জরুরি আসবাব ছিল তারের জালি দেওয়া খাবার রাখার আলমারি যার অধিক পরিচিতি ছিল ‘মিটসেফ’ নামে। রান্নাকরা মাছ-মাংস, ডাল, তরকারি, দুধ, দই ইত্যাদি অন্য বেলার জন্য তুলে রাখা থাকত মিটসেফে। পিঁপড়ে বা পোকামাকড় যাতে বেয়ে উঠতে না পারে তার জন্য মিটসেফের চার পায়ার নীচে রাখা থাকত জল ভরা চারটি ছোট মাপের কাঠের বাটি।
কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসে ভাত খাওয়া হত। এঁটোর ছোঁওয়া লেগে যেত বলে রোজ ধুতে হত পিঁড়ি। এখনও মনে আছে বড় রান্নাঘরে বাড়ির ছোটরা পাশাপাশি পিঁড়ি পেতে খেতে বসেছি। পেতলের হাঁড়ি থেকে মা আমাদের কাঁসার থালায় ভাত বেড়ে দিচ্ছেন। গরম ভাতের সঙ্গে ঘি আর মায়ের হাতে মাখা আলুসেদ্ধ। খেয়ে মনে হত অমৃত। ভাত বেশি গরম থাকলে মা হাতপাখা নাড়িয়ে ভাত ঠান্ডা করে দিতেন যাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে সময়মতো স্কুলে যেতে পারি। এই হাতপাখার প্রসঙ্গে একটি মধুর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মায়ের হাতে ফুল তোলা কার্পেটের আসনে বাবা খেতে বসেছেন। ঝকঝকে মস্ত কাঁসার থালার ওপরে বাটি ভরতি ভাত উপুড় করে বাড়া। থালার এক কোণে লেবু, নুন। থালা ঘিরে ছোট, বড়, মাঝারি নানা মাপের কাঁসার বাটি সাজানো। তাদের কোনওটাতে রয়েছে ডাল, কোনওটিতে যে-কোনও একটি তরকারি, বড় বাটিতে মাছের ঝোল, কুচি পাথরবাটিতে অম্বল আর শেষ পাতে দই। লালপেড়ে শাড়ি পরে মাথার ঘোমটা টেনে মা বাবার পাশে বসে পাখা দিয়ে বাতাস করছেন।
একটি অতি পুরানো রান্নার পদ— ডাল ফেলা।
উপকরণ: মটরডাল, পাকা কুমড়ো, সিম, মুলো, বেগুন, ঝিঙে, লাউডগা, আদাবাটা, কাঁচালঙ্কা, শুকনোলঙ্কা, নুন, মিষ্টি, কালোজিরে, তেল ও ঘি।
প্রণালী: তরকারি ডুমো ডুমো করে কেটে নিন। তেলের মধ্যে কালোজিরে ও শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ডাল তরকারি একসঙ্গে কষে জল দিন। ডাল ফুটে উঠলে নুন ও আদাবাটা দেবেন। ডাল তরকারি সেদ্ধ হয়ে এলে স্বাদ অনুযায়ী মিষ্টি দিন। গাওয়া ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন