আলপনা ঘোষ
ঋগ্বেদে ও অথর্ববেদে আর্যদের খাদ্যতালিকায় তিলের বিবিধ প্রয়োগের উল্লেখ মেলে। খাদ্যের অন্যতম উপকরণ হিসেবে আর্যরা তিলতেল ও তিলের ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন সে কথা বিশিষ্ট খাদ্য বিশেষজ্ঞ টি কে আছাইয়া তাঁর ‘ইন্ডিয়ান ফুড’ গ্রন্থে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। আর্যশাস্ত্রে যে নয়টি পবিত্র বীজের কথা হয়েছে, তিল তার মধ্যে অন্যতম। শুধু খাদ্য উপকরণ নয়, নানা ধর্মীয় কাজে তিলের ব্যবহার আজও প্রচলিত। আর্যরা ভাত রান্না করার সময়ে তাতে তিল মিশিয়ে এক অতি স্বাদু পদ বানাতেন সে কথা আমরা আছাইয়ার গ্রন্থ থেকে জানতে পারি। এমনকী দুধ, চালের পায়েসেও তিল ব্যবহারের রীতি ছিল সে যুগে। তিল ও গুড় দিয়ে বানানো লাড্ডু অতি প্রিয় ছিল ওঁদের। শুকনো খোলায় তিল ভেজে, গুঁড়ো করে আর্য রমণীরা সবজিতে দিতেন, তার স্বাদ গুণ বাড়াতে। তিলের গুঁড়োতে জল মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করে রুটির মতো বেলে তা দিয়ে বানাতেন তিল পাঁপড়। তিলের সঙ্গে চালের গুঁড়ো ও গুড় মিশিয়ে এক ধরনের ভাজা মিষ্টান্ন প্রস্তুত হত যার আধুনিক নাম তিলকুট।
বাঙালির রান্নাঘরে তিলের অনুপ্রবেশ সাম্প্রতিক বলা চলে। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়, বেলা দে, বাংলাদেশের সিদ্দিকা কবীর প্রমুখ খাদ্য বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থে খুব বেশি কিছু পদ পাইনি যাতে তিলের ব্যবহার হয়েছে।
বিপ্রদাসের ‘পাক-প্রণালী’তে ‘তিলপটেশ্বরী’ নামে অভিনব পদ পেয়েছি যা এক কথায় অসাধারণ। গ্রন্থকার নিজে ‘তিলপটেশ্বরী’কে শুধু যে এক প্রকারের সুখাদ্য বড়া বলে উল্লেখ করেছেন তাই নয়, তিনি বলেছেন এটির স্বাদ খাসির তেলের বড়ার ন্যায়। উপকরণ হিসেবে তিনি এতে ব্যবহার করেছেন বেশ অনেকটা গাওয়া ঘি। এ ছাড়া থাকছে ময়দা, মিহি চালের গুঁড়ো সমান মাপে, সামান্য আদার রস, মৌরিবাটা, খোসা ছাড়ানো তিল ও স্বাদ অনুযায়ী নুন। ময়দা ও চালের গুঁড়ো আলাদা করে ভাল করে চেলে নিতে হবে। তার পরে ঘিয়ের ময়ান সমান মাপে দুটি উপকরণে দেওয়া হলে, ময়দা ও চালের গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে, এতে এমন পরিমাণে জল দিতে হবে যাতে মিশ্রণটি অত্যন্ত পাতলা বা খুব ঘন না হয়। এই গোলা হাতে করে আধ ঘণ্টা ফেটাতে হবে। এই সময় এতে বাকি সব উপকরণ দিয়ে ক্রমাগত ফেটিয়ে যেতে হবে। এক ঘণ্টা ফেটানোর পরে কড়াইতে বাকি ঘি দিয়ে বসাতে হবে। ঘিয়ের ফেনা মরে এলে তাতে অল্প অল্প করে উপরিউক্ত গোলা দিয়ে বেশ ভাজা হলে ছেঁকে তুলে নিতে হবে।
আমাদের এই বঙ্গভূমিতে বিবাহ প্রভৃতি মঙ্গল অনুষ্ঠানে আনন্দনাড়ু খাওয়ানোর এক রীতি আছে। শ্রীমতী বেলা দে-র ‘গৃহিণীর অভিধান’ গ্রন্থে এই আনন্দ নাড়ুর উল্লেখ মেলে যাতে চালের গুঁড়োর সঙ্গে ক্ষীর, ময়দা, নারকেল কোরা, তিল, চিনি মিশিয়ে নাড়ু পাকিয়ে ভাজতে হবে। তিনি অবশ্য এই প্রসঙ্গে বাঙালির আদি অকৃত্রিম তিলের নাড়ুর উল্লেখ করতে ভোলেননি। তিলের নাড়ুর প্রস্তুত প্রণালীটি কিন্তু অন্যান্য নাড়ুর তুলনায় স্বতন্ত্র ও অপেক্ষাকৃত জটিল। এই নাড়ুর উপকরণ হল, তিল, গুড় বা চিনি, ঘি এবং কর্পূর। তিল প্রথমে ঝেড়েবেছে খাঁটি ঘিয়ে খানিকটা নেড়েচেড়ে নামিয়ে রেখে দেবেন। এখন উনুনে কড়াই চাপিয়ে গুড় বা চিনি কিছুটা জলসহ ঢেলে দেবেন। মিশ্রণটি আঠাআঠা মতো হয়ে এলে ভাজা তিল ও সামান্য কর্পূরের গুঁড়ো দিয়ে ভাল করে নেড়েচেড়ে নামিয়ে ফেলবেন এবং গরম অবস্থায় হাতে নাড়ু পাকিয়ে একটি কৌটোতে ভরে ফেলবেন। এই নাড়ুতে কর্পূরের ব্যবহার নিয়ে কিন্তু কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
অধ্যাপিকা সিদ্দিকা কবীরের ‘রান্না খাদ্য পুষ্টি’ গ্রন্থে তিলের পুলির উল্লেখ পাই যা এক কথায় অনবদ্য। দুধে মুগডাল সেদ্ধ করে কোরানো নারকেল দিয়ে তা প্রথমে শুকনো করে বেটে নিয়ে তাতে তিল ও গুড় মেশালেই পুর প্রস্তুত। এবারে পরিমাণ মতো আটা বা ময়দা জল ও নুন দিয়ে ভাল করে মেখে মণ্ড তৈরি করে নিতে হবে। রুটি বেলে ভিতরে ডালের পুর ভরে অর্ধচন্দ্রাকারে পুলি তৈরি করে মুখ চেপে মুড়ে দিন। বাঁশের চটা দিয়ে পুলিপিঠা কাটলে সুন্দর হয়। তিলের পুলি স্বল্প তেলে যেমন সেঁকে নেওয়া যায় তেমনি আবার ডুবো তেলে ভাজা যায়।
তিলের একটি আধুনিক নিরামিষ পদ দিয়ে ইতি টানছি আজকের তিল পর্বে।
উপকরণ: নতুন আলু, লঙ্কা, ধনে, জিরে, আমচুর, সাদা তিল, সামান্য তেল।
প্রণালী: আলু সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে একটি পাত্রে রেখে দিন। মাপ মতো লঙ্কা, ধনে, জিরে শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে তার সঙ্গে আমচুর ও নুন মেশান। এবারে এই মিশ্রণ সমানভাবে সেদ্ধ আলুর ওপরে ছড়িয়ে একটি কাচের পাত্রে চালুন। এই অবস্থায় ফ্রিজে বেশ কিছুক্ষণ রেখে দিন। এর ফলে মশলা-সিক্ত আলু আরও স্বাদু হবে। পরিবেশনের আগে তেল গরম করে নামিয়ে তাতে তিল দিন। ফুটতে শুরু করলে তত্ক্ষণাৎ তেল সমেত বাদামি হয়ে যাওয়া তিল আলুগুলির ওপরে ছড়িয়ে দিন। একটি ছড়ানো পাত্রে টুথপিক দিয়ে পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন