আলপনা ঘোষ
ক্রিসমাস মানেই লাল কোট, লাল টুপি পরা সান্টা বুড়ো, ক্রিসমাস ট্রি, টার্কি রোস্ট, রিচ ফ্রুট কেক, রাস্তায় আলোর মালা। আমাদের ছেলেবেলায় ক্রিসমাসে লম্বা ছুটি থাকত। আর ছুটি মানেই উৎসব, খাওয়াদাওয়া, সার্কাস, চিড়িয়াখানা, চড়ুইভাতি।
ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আমাদের ভারতবর্ষ। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে হিসেব করলে দেখা যাবে হিন্দু মুসলমানদের পরেই এখানে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী মানুষেরা। এঁদের মধ্যে এক সময়ে এক উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিলেন কলকাতার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। আজ যদিও দ্রুত এই সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এই শহর থেকে।
শীত পড়তে না পড়তে নভেম্বর মাসের গোড়া থেকে সেসব দিনে শুরু হয়ে যেত বড়দিনের প্রস্তুতি। উৎসবের এই প্রস্তুতির সিংহভাগ সংঘটিত হত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রান্নাঘরে। ঠিক ইংরেজ রাজ-ঘরানার অনুকরণে শুরু হত ‘কেক মিক্সিং সেরিমনি’। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই আমন্ত্রিত হতেন এই উৎসবে। পরিবারের সব সদস্যদের সঙ্গে অতিথিরা হাত মেলাতেন এই মিশ্রণ পর্বে। রেড ওয়াইন, ডার্ক রাম মেলানো হত বাদাম, কিশমিশ ও নানা রসালো ফলের সঙ্গে। এক মাস ধরে এই রসালো মিশ্রণ জার-বন্দি করে রাখা হত কেকে ব্যবহারের জন্য। এই উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটত নৈশভোজ ও পানীয় দিয়ে। গ্রামোফোনে বাজত ক্যারলের সুর। ক্রিসমাস কেক তৈরির কাজেও পরিবারের ছোটবড় সদস্যরাও অংশ নিতেন। কেউ ডিম ফেটাতেন, কেউ মিশ্রণ তৈরি করতেন আবার কেউ বা ফল ও বাদামের খোসা ছাড়িয়ে কুচিয়ে রাখতেন। আজও পার্ক স্ট্রিটের বড় বড় হোটেলগুলিতে ‘কেক মিক্সিং সেরিমনি’তে যোগ দিতে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন, সমাজের এলিট অংশের মানুষজন।
বড়দিনের আগের দিন মধ্যরাতে চার্চে উপাসনা হবার রীতি আজও বজায় আছে। পরিবারের ছোট-বড় সবাই নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে চার্চে যেতেন। সাহেবদের আমলে সুন্দরী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণীরা অর্গাঞ্জা ও টাফেটা দিয়ে তৈরি লম্বা গাউন বা প্রচুর কুঁচি দেওয়া স্কার্ট পরে ক্রিসমাস ইভের পার্টিতে নেচে-গেয়ে সারারাত কাবার করে দিতেন।
অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রান্নার ষোলোআনাই ছিল বিফ-পর্কের পদ। তাই বড়দিনের দিন বাড়ির গিন্নিকে বিফ-পর্ক রাঁধতেই হত। মধ্যাহ্ন ভোজে ইয়েলো রাইসের সঙ্গে সাইড ডিশ হিসেবে থাকত চর্বি চপচপে পর্ক ভুনি, সরষের তেলে ভাজা সসেজ, পর্ক ভিন্ডালু। কলিন্স স্ট্রিটের কোনও কোনও বাড়িতে এসব কিছুর সঙ্গে যেত মাছ বেগুনের ভাজা কারি। শেষ পাতে দই-রসগোল্লা আর বাড়িতে বানানো কেক। এ ছাড়া থাকত অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের নিজস্ব মেঠাই কুলকুল আর রোজা কুকিজ।
বড়দিনের খাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ‘সল্ট মিটে’র কথা না বললে চলে না। এলিয়ট রোড, বো-ব্যারাকসের বা যে-কোনও ইঙ্গ-ভারতীয় ঘরে নুন, লেবু, আদা, ভিনিগারে মজানো ও সামান্য গুড়ের আভাস দেওয়া এই গোমাংস ছাড়া ক্রিসমাস ভাবা যায় না। রন্ধন বিশারদদের লেখা থেকে জানা যায় যে অনেক কাল আগে বাড়ির বাগানে গর্ত খুঁড়ে মশলামাখা মাংস মাটির হাঁড়িতে মুখ বন্ধ করে ছয়-সাত দিন রেখে দেওয়া হত। বার করে উনুনে বসিয়ে হালকা সেদ্ধ করে নিলেই পাতে দেবার জন্য রেডি ভারী তুলতুলে নরম স্বাদু এই মাংস।
ক্রিসমাস ডিনার ছিল বেশ জমকালো এক ব্যাপার। সন্ধে থেকে অতিথিরা আসতে শুরু করতেন। ডিনার টেবিলের ঠিক মাঝখানে একটি বড় বোলে থাকত ‘রাম পাঞ্চ’। এর সঙ্গে থাকত ট্রে-ভরতি নানা রকমের ‘hors d’ oeuvres’ বা স্ন্যাক্স। ঘড়ির কাঁটায় ন’টা বাজতেই রাতের ভোজ পরিবেশিত হত। বাচ্চারা বসত অন্য টেবিলে। স্যুপ দিয়ে শুরু হত। ফার্স্ট কোর্সে থাকত রোস্টেড লেগ অফ মাটন বা ডাক রোস্ট ইন অরেঞ্জ সস্। এর সঙ্গে দেওয়া হত রোস্টেড আলু, গাজর, সেদ্ধ মটরশুঁটি, হ্যাম উইথ পাইনঅ্যাপল গ্লেজ, স্টাফ্ড টম্যাটো, বিটরুট স্যালাড, ফ্রেশ ব্রেড অ্যান্ড বাটার।
ডিনার শেষ হত মিষ্টি পদ মার্মালেড পুডিং বা প্লাম পুডিং-এর মতো অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের বড় পছন্দের ডেজার্ট দিয়ে। বাচ্চাদের জন্য এর সঙ্গে থাকত চকোলেট ফাজ ও নানা রকমের কুকিজ।
ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পরে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। দেশে এই সম্প্রদায়ের মানুষ যাঁরা রয়ে গেলেন, তাঁরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেন দেশের বিভিন্ন বড় শহরগুলিতে। পার্ক স্ট্রিট থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে রয়েছে কলিন্স স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, এলিয়ট রোড প্রভৃতি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান অধ্যুষিত অঞ্চল। এ প্রসঙ্গে বউবাজার থানার খুব কাছে ‘বো ব্যারাকস্’-এর কথা না বললেই হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘বো ব্যারাকস্’ ব্যবহৃত হত ইংরেজদের সেনানিবাস হিসেবে। যুদ্ধ শেষে সেনারা ফিরে গেলে বহু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সরকারি চাকুরে, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসারেরা এখানে স্থায়ী ভাবে থাকতে শুরু করেন। এভাবে এটি একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কলোনি হয়ে ওঠে। লাল ইটের দেয়ালআলা বাড়িগুলি আজও পুরনো দিনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। বড়দিনের সময় এই পাড়ার মানুষজন উৎসবে মেতে ওঠেন।
এক সময়ে বো-ব্যারাকসের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান গৃহিণীদের হাতে তৈরি ওয়াইনের খুব সুখ্যাতি ছিল। আজও কিছু পরিবার সেই পরম্পরা বজায় রেখেছেন। বড়দিনের সময় অতিথিরা এলে হোমমেড ওয়াইন আর কেকের স্বাদ গ্রহণ না করে চলে যাবেন একথা ও পাড়ার গিন্নিরা কল্পনাও করতে পারেন না।
বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোনও কোনও কলকাতা ‘কানেকশন’ এই উৎসবের দিনগুলিতে হানা দেন বো-ব্যারাকস্, কলিন্স স্ট্রিটের মতো আদ্যিকালের এইসব পাড়াগুলিতে তাঁদের শিকড়ের খোঁজে। এ ক’দিন অনাবাসী স্বজনদের জন্য পামেলা পিসিরা তাঁদের ঘরের স্বাক্ষর মশলাদার সব পদ রাঁধবেন। ওই সময়ে ওই সব পথ দিয়ে যেতে পথচারীদের নাকে ভেসে আসবে লিকার স্নাত রিচ ফ্রুট কেকের গন্ধ।
উপকরণ: বোনলেস পর্ক, চৌকো করে কাটা আলু, কুচোনো পেঁয়াজ, আদা— রসুনবাটা, হলুদ, শুকনোলঙ্কাবাটা, সরষের তেল, নুন।
প্রণালী: কুকারে তেল গরম করে তাতে পেঁয়াজ সোনালি করে ভেজে তুলে নিন। আলু বাদামি করে ভেজে রেখে দিন। এবারে বাটা সব মশলা দিয়ে কষে পর্ক দিন ও নুন দিন। ভাল করে নাড়ুন। ভাজা গন্ধ বেরুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন যতক্ষণ না মাংস সুসিদ্ধ হয়। এবারে আলু ও ভাজা পেঁয়াজ দিন। আলু সেদ্ধ হলে ও গ্রেভি শুকিয়ে এলে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন