আলপনা ঘোষ
বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপুজো যাপনের ব্যাপারে কলকাতা শহরের তুলনায় জেলাগুলিও কিন্তু কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। বারোয়ারি পুজোগুলির পাশাপাশি বনেদি বাড়িগুলিও শারদীয়া উৎসবে মেতে ওঠে। সাবেকি এইসব জেলার পুজোর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাসের কাহিনি। বিভিন্ন জেলার সাবেকি পুজোতে দেবীর ভোগ নিবেদনের মধ্যেও আছে এক বৈচিত্র্যের ছোঁওয়া।
বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রচলন নিয়ে কথা উঠলে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কথা বলতেই হবে। তিনিই প্রথম অত্যন্ত জাঁকজমক করে সর্বসাধারণের মধ্যে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন যা পরবর্তীকালে সর্বজনীন রূপ ধরে। রাজবাড়ির পঙ্খ অলংকৃত দুর্গাদালানে দেবী পূজিত হন রাজরাজেশ্বরী নামে। এটাই এই রাজবাড়ির দুর্গার প্রচলিত নাম। প্রথা মেনে আজও এই পুজোর জন্য গঙ্গাজল আনা হয় নবদ্বীপ থেকে।
এই বংশের উত্তরসূরিরা এখনও তাঁদের সাধ্যমতো এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। এবাড়ির পুজোর ভোগে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। প্রাচীন প্রথা মেনে দেবীর ভোগের আয়োজনে তিন দিনই থাকে খিচুড়ি বা পোলাও, ভাজা, তরকারি, চাটনি, সুজির পায়েস। সপ্তমীতে থাকে সাত রকম ভাজা। অষ্টমীতে থাকে পোলাও, ছানার ডালনা, আট রকম ভাজা, চাটনি, ক্ষীর। নবমীতে থাকে খিচুড়ি, নয় রকমের ভাজা ও তিন রকমের মাছ ইত্যাদি। শীতল ভোগে থাকে লুচি, ভাজা, তরকারি ও সুজির পায়েস।
নবদ্বীপের যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন। এই পুজোর বৈশিষ্ট্য নবমীর দিন মাকে থোড় ও বোয়াল মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।
কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় আগরপাড়ায় মাটির ঠাকুরদালানে দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন ১০৮২ সালে। এই বনেদি বাড়ির পুজো ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ির পুজো বলে পরিচিত। এই বাড়িতে পুজো শুরু হয়ে যায় প্রতিপদ থেকে। সেই দিন থেকেই চণ্ডীর ঘট পুজো হয়। একশো আটটি প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধিপুজো হয়।
এই পরিবারে পুজো মানেই একান্ন পদ। হরেক রকমের মাছ এবং হরেক রকমের ভাজা। প্রাচীন এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ভোগ। এঁচোড়, কচু, নানা রকমের তরিতরকারি, মাছ দিয়ে সাজিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়।
নদিয়া জেলার অন্যতম প্রাচীন পুজো হল চাঁদুনিবাড়ির পুজো। এ পুজোর বয়স সাড়ে পাঁচশো বছরেরও বেশি। এই পুজোতে কিছু ব্যতিক্রমী আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। তার মধ্যে একটি হল দেবীর ভোগ বাড়ির মহিলারা রান্না করলেও তাঁরা পুজোর আয়োজন করতে পারেন না। সে কাজটি করেন বাড়ির পুরুষেরা।
পুজোর ভোগেও আছে নানা বৈচিত্র্য। ষোড়শ উপাচারে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। তিনদিনের ভোগে থাকে অন্ন, খিচুড়ি, ভাজা, নানা রকমের তরকারি, পাকা কলার বড়া এবং চালতের চাটনি। নবমীতে থাকে অন্যান্য কিছুর সঙ্গে ইলিশমাছ। দশমীতে পান্তাভাত, ইলিশের টক ইত্যাদি।
আগে সপ্তমীতে একটি, অষ্টমীতে দুটি ও নবমীতে তিনটি পাঁঠাবলি হত। বর্তমানে পশুবলি নিষিদ্ধ হওয়ায় আখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়।
শান্তিপুরের বড় গোস্বামীবাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স হল কম করে ৩৫০ বছর। এখানে কাত্যায়নী রূপে দেবী পূজিত হন। সপ্তমী থেকে নবমীর ভোগে থাকে ৩৬ রকমের পদ। ভাত, তিন রকমের ডাল, নানাবিধ শাক, ওল, থোড়, মোচার ঘণ্ট, ডালনা ইত্যাদি নানা নিরামিষ পদ। এই ভোগ রান্না করেন বাড়ির দীক্ষিত বউমায়েরা।
আটপুরের মিত্রবাড়ির পুজোর সূচনা হয়েছিল ১৬৮৬ সালে। সেই সাবেকি পুজো এখনও বহাল আছে। অষ্টমী, নবমীর দিন সাবেক আমলের জমিদারি এস্টেটের অন্তর্গত গ্রামবাসীরা এখনও প্রসাদসহ মধ্যাহ্ন ভোজনে আপ্যায়িত হন। এ রীতি বহু কাল ধরে চলে আসছে। অতিথিদের জন্য অন্ন ও মাছের ব্যবস্থা থাকলেও, মিত্রবাড়িতে মা দুর্গাকে কিন্তু আমিষ কোনও পদ নিবেদন করা হয় না। লুচি, নারকেলের নানাবিধ মিষ্টান্ন ও ফলমূল দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।
মহামহোপাধ্যায় শ্রীমুরারিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজো হাওড়ার আদি বনেদি বাড়ির পুজোর অন্যতম। এই পুজোর সূত্রপাত ঘটেছিল প্রায় তিনশো বছর আগে। মহালয়ার দিন থেকে এই বাঁড়ুয্যে পরিবার নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। লক্ষ্মীপুজোর পরে আমিষ স্পর্শ করেন। মাতৃ আরাধনায় এই পরিবার একান্ন প্রকার ভোগের আয়োজন করেন। এর মধ্যে থাকে বাঁধাকপি ফুলকপির তরকারি, মোচার ঘণ্ট, আবার এঁচোড়ের ডালনা, পাকা আম, চালতার চাটনি প্রভৃতি নানা অসময়ের পদসম্ভার। এসবের সঙ্গে থাকে অন্নভোগ। ভোগের সমস্ত পদের আয়োজন করেন দীক্ষিত মহিলারা মুখে কাপড় বেঁধে।
মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত জঙ্গপুরের ঘোষালবাড়ির পুজো হল তিনশো সাতান্ন বছরের পুরানো। পুজোর ক’দিন নানা ধরনের ভোগ হয়। সপ্তমীতে সাত পদে, অষ্টমীতে আট পদে এবং নবমীতে নয় পদের ভোগ দেওয়া হয়। দশমীতে দেওয়া হয় ইলিশ মাছের ভোগ। সন্ধেতে বাসি লুচি ও শাক দিয়ে দেবীকে ভোগ দেওয়ার পর নদীতে দেবী বিসর্জন সম্পন্ন হয়।
উপকরণ: গোবিন্দভোগ চাল; সোনামুগডাল; কড়াইশুঁটি, ফুলকপি; আলু; তেজপাতা; শুকনোলঙ্কা; সাদাজিরা; গোটা গরমমশলা; কাঁচালঙ্কা; আদাবাটা; হলুদগুঁড়ো; ঘি; নুন ও চিনি; স্বাদ অনুযায়ী।
প্রণালী: প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে খিচুড়িতে সব সময়ে চালের থেকে ডালের পরিমাণ খানিকটা বেশি নিতে হবে। একটি পিতলের কড়াইতে মুগডাল শুকনো খোলায় ভেজে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রেখে দিন। চাল বেছে ধুয়ে আলাদা করে রাখুন। কড়াইতে ঘি গরম করে তাতে আদাবাটা দিয়ে কষে শুকনোলঙ্কা, তেজপাতা, গোটা জিরা ফোড়ন দিন। মশলার গন্ধ বেরুলে, থেঁতো করা গরমমশলা ও কাঁচালঙ্কা দিন। নাড়াচাড়া করে আলু ও ফুলকপি দিন। মাঝারি আঁচে সাঁতলান। এবারে মাপ মতো ঈষদুষ্ণ জল দিন। ফুটতে শুরু করলে ডাল দিন। এর পরে চাল ও কড়াইশুঁটি দিন ও নুন হলুদ দিন। ভাল করে নাড়ুন। আরও খানিকটা ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রান্না করুন। সব সুসিদ্ধ হয়ে এলে স্বাদমতো চিনি মিশিয়ে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন