আলপনা ঘোষ
সেসব গত শতকের পাঁচের দশকের কথা। খোদ এই কলকাতা শহরে বসে আমার বাঙাল পিত্রালয়ে প্রাতরাশ বলতে বোঝাত এক দলা মাখন বা ঝাঁঝালো সরষের তেল দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ ভাত। সকালে স্কুলে যাবার আগে আমাদের ছোটদের জন্য এই বরাদ্দ ছিল। যেদিন আবার এর সঙ্গে হলদে কুসুমওয়ালা নরম সেদ্ধ ডিম যোগ হত, সেদিন তো আর কোনও কথা নেই।
গোবিন্দভোগ চালের ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ আলু আর ডিমের সাদা হলুদ আর সোনালি মাখন মেখে মা যখন আমার মুখে গরাস করে তুলে দিতেন তার স্বাদ যেন এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে যেত। বাড়ির অফিস-যাত্রীদের জন্য সকালে বরাদ্দ ছিল ধোঁয়া-ওঠা এক কাপ চা, তার সঙ্গে দুটি করে বিস্কুট। খবরের কাগজের পাতা উলটে, স্নান সেরে তৈরি হতে হত ওঁদের। সকাল ন’টার মধ্যে মা, ঠাকুমা রেঁধে ফেলতেন ভাত, পাতলা মুশুরডাল, বেগুনভাজা আর মাছের ঝোল। ছুটির দিন ছাড়া সাধারণ ‘বাঙাল’ মধ্যবিত্ত বাড়ির প্রাতরাশের এই ছিল নমুনা। তখনও আমাদের বাড়িতে আটার রুটির চল হয়নি। গৃহিণী ও বয়স্ক মানুষ, যাঁদের বাইরে বেরুনোর প্রয়োজন হত না, তাঁরা প্রাতরাশ সারতেন সাধারণত চিঁড়েভাজা, মুড়ি বা সেঁকা পাঁউরুটি দিয়ে।
আমরা আর একটু বড় হতে অবশ্য ভাত দিয়ে প্রাতরাশ নিয়ে আমাদের আগ্রহের অভাব ঘটলে, মা কোনওদিন বানিয়ে দিতেন ডিমের স্যান্ডুইচ, কোনওদিন হাতরুটি, সবজি বা কোনওদিন মাখন বা মায়ের নিজের হাতে বানানো পেয়ারার জেলি দিয়ে উনুনে সেঁকা টোস্ট আর তার সঙ্গে পেঁয়াজকুচি ও কাঁচালঙ্কার আভাস দেওয়া হাঁসের ডিমের ‘মামলেট’।
আম-কাঁঠালের দিনে আমাদের ফরমায়েশি খাবার তৈরিতে মা সাময়িক বিরাম টেনে দিতেন আর তা নিয়ে ট্যাঁ-ফোঁ করার সাধ্যি বাড়ির ছোটদের ছিল না। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের সময় পেট ঠান্ডা রাখতে বাড়িতে পাতা দই দিয়ে চিঁড়ে বা মুড়ি খেতে হত। মা যখন তার সঙ্গে রসালো, মিষ্টি আম মেখে দিতেন তখন স্বাদে, গন্ধে তা হত অতুলনীয়। বাড়িতে কোনও পুজো-আচ্চা থাকলে এর সঙ্গে যোগ হত মাথা পিছু একটি করে সন্দেশ। চমৎকার সেই ফলারের স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে আছে।
রবিবারের প্রাতরাশ হত একেবারে অন্য রকমের। দেশ ভাগের পরে এদেশে থাকতে থাকতে ঘটি প্রতিবেশীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল হৃদ্যতার সম্পর্ক আর তারই প্রভাব পড়ল দু’দিকের খাদ্যরুচিতে। ছুটির দিনে মা ঘটি সখীদের কাছে শেখা স্বাদু সব জলখাবার বানাতে শুরু করলেন। লুচি/পরোটার চল ছিল বিশেষ বিশেষ দিনে। এবারে রোববারের মেনুতে যোগ হল ফুলকো লুচি বা পরোটা আর তার সঙ্গে জিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দেওয়া আলুর সাদা তরকারি। লুচির সঙ্গে সংগতে লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা, আলুর দম, মিষ্টি ছোলার ডাল বা কষা মাংস দারুণ জমে গেলেও বিশেষ কোনও উপলক্ষ ছাড়া এসব পদ রোববারের মেনুতে থাকত না। জিভে জল-আনা এসব পদের বাইরে শুধু চিনি বা ঝোলা গুড় দিয়ে লুচিও কিন্তু ছেলেবেলায় আমাদের কাছে কম আকর্ষণীয় ছিল না।
লুচি বেলা আর ভাজা এই দুই প্রক্রিয়ার জন্য কিছু দক্ষতা জরুরি। বিশেষ কারিগরি দক্ষতায় লুচি ফুললে রাঁধুনির হাত-যশ আর লুচি না ফুলল তো রাঁধুনির কপাল পুড়ল। নতুন বউয়ের হাতে লুচি ফুলকো না হলে শ্বশুরবাড়িতে তার মান থাকবে না।
অপেক্ষাকৃত কম তেলে লুচির বদলে মাঝে মাঝে ভাজা হত তিন কোনা মুচমুচে বাদামি পরোটা। শীতকালে অবশ্য লুচি-পরোটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেত আমাদের আদি অকৃত্রিম কড়াইশুঁটির কচুরি। ময়দার লেচির মধ্যে কড়াইশুঁটির পুর ভরে ডুবো তেলে ভেজে তৈরি হয় এই কচুরি। শুকনো খোলায় ভাজা শুকনোলঙ্কা ও মৌরির গুঁড়ো মেশানো কড়াইশুঁটির পুরে ভরপুর কচুরি আর তার সঙ্গে চাই কষা আলুর দম।
প্রাতরাশে আমাদের আর একটি পছন্দের পদ ছিল ‘ডিম পাঁউরুটি’ যার পোশাকি নাম ‘ফ্রেঞ্চ টোস্ট’। ডিমের গোলায় কুচোনো পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, গোলমরিচগুঁড়ো, নুন, চিনি সামান্য দুধ মিশিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিয়ে তিন-কোনা করে কাটা পাঁউরুটির স্লাইস/টুকরো তাতে চুবিয়ে ডুবো তেলে ভেজে তুললেই ‘ফ্রেঞ্চ টোস্ট’ ষোলোআনা রেডি।
ডিমের আর একটি অতি লোভনীয় পদ ছিল ‘মোগলাই পরোটা।’ যে রোববারে মা এই পরোটা বানাতেন, সে দিন আমাদের খিদেটা এত বেশি জোরালো মনে হত যে পাতে পড়ার তর সইত না। মায়ের হাতে বানানো সেই জম্পেশ ‘মোগলাই পরোটা’র রন্ধন প্রণালী থাকছে এই পর্ব শেষে।
উপকরণ: ময়দা, ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, নুন, ময়ানের জন্য ঘি, সাদা তেল।
প্রণালী: ময়দাতে নুন ও ময়ান মিশিয়ে পরে জল দিয়ে ভাল করে মাখুন। মাখা মণ্ড এবারে ভেজা কাপড়ের টুকরো দিয়ে আধ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। একটি পাত্রে ডিমগুলো ভেঙে তাতে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা কুচি ও নুন দিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিন। ময়দার বড় লেচি কেটে পাতলা গোল করে বেলুন। সাদা তেল চাটুতে দিয়ে পরোটা সামান্য ভেজে নামিয়ে রাখুন। এবারে একটি করে পরোটা চাটুতে দিয়ে তার ওপরে ডিমের এই গোলা ঢেলে চার ভাঁজ করে মুড়ে দিন যাতে বেরিয়ে না যায়। এবারে তেল দিয়ে আস্তে আস্তে এ পিঠ ও পিঠ করে বাদামি করে ভাজুন। আলুর দম দিয়ে পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন