আলপনা ঘোষ
তখন আমি কালীঘাটের এক মিশনারি কলেজের ছাত্রী। সময়টা ষাটের দশক। আমার বন্ধুত্ব হল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে রোজ়ি মার্টিনের সঙ্গে। রোজ়ির বাড়ি কলিন্স স্ট্রিটে। ও থাকে সেখানে ওর বেশ বড়সড় পরিবারের সঙ্গে। আমি কলেজে যাই বিনুনি ঝুলিয়ে, শাড়ি পরে আর রোজ়ি আসে ফুলছাপ লম্বা স্কার্টের সঙ্গে সাদা ব্লাউজ পরে। ববকাট চুলে হিলতোলা জুতো পরে সে যখন ক্লাসে ঢোকে, ভারী সুন্দর দেখায় ওকে। আমাদের দু’জনের বিষয় ছিল এক— ইংরেজি সাহিত্য। ইংরেজিতে ফরফরিয়ে কথা বলত সে। কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে সে কথা বলার চেষ্টা করত বাংলায়। তাই আমাদের কথা বলার মাধ্যম ছিল আমার বাংলা স্কুলে পড়া অনভ্যস্ত ইংরেজি আর লোরেটো স্কুলে পড়া রোজ়ির ভাঙা বাংলা।
দু’জনে টিফিন ভাগ করে খেতাম। আমার টিফিন কৌটোতে থাকত আমার মায়ের হাতে বানানো কোনওদিন চিঁড়ের পোলাও, কোনওদিন লুচি, কুমড়োর ছক্কা। রোজ়ি বেশির ভাগ দিনই আনত নানা ধরনের স্যান্ডুইচ, কোনও দিন আবার ওর ঠাকুমার হাতে বেক করা স্বাদু ফ্রুটকেক। দু’জনে ভাগাভাগি করে খেতাম। এরকম করে দিন কাটছিল আমাদের।
মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ ছিল না তেমন। আমার জন্মদিন শীতকালে তাই মা বানাতেন নলেনগুড়ের পায়েস। কলেজে যাবার আগে মা সেদিন নিজের হাতে চামচে করে আমার মুখে তুলে দিতেন সেই পায়েস। কীভাবে যেন রোজ়ি আমার জন্মতারিখ জেনে গিয়েছিল। রোজকার মতো দুই বন্ধু সেদিনও টিফিন ভাগাভাগি করে খাচ্ছি। খাওয়া শেষ হতে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এক দারুণ চমক। রোজ়ি তার ব্যাগ খুলে আমার হাতে তুলে দিল একটি গোল কেকের বাক্স। বলল, ওর মা আমার জন্য একটি কেক করে পাঠিয়েছেন। আমি যেন বাড়ি গিয়ে খুলে দেখি আর মোমবাতি জ্বালিয়ে কেক কাটি। চোখে জল এসে গেল আমার ওর কথা শুনে।
বাড়ি গিয়ে বাক্স খুলে দেখি কেকের উপরে আমার নাম লেখা। বাবা-মা বললেন, একদিন রোজ়িকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে। রোজ়ি কলেজে আসাযাওয়া করত বাড়ির গাড়িতে। তাই একদিন কলেজের পরে রোজ়ি এল আমাদের বাড়ি। মা সেদিন অনেক রান্না করেছিলেন। যাবার সময়ে মাকে বলে গেল একদিন এবার যেতে হবে আমাকে ওদের বাড়ি।
এক শীতের ছুটির দিনে রোজ়ির সঙ্গে গাড়ি করে গেলাম ওদের কলিন্স স্ট্রিটের বাড়ি। কী সুন্দর করে সাজানো ওদের বাড়ি। বসার ঘরের এক কোণে রয়েছে একটি পিয়ানো। ক্রিসমাসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। একটি মস্ত ক্রিসমাস ট্রি রাখা রয়েছে ঘরের আর এক দিকে। কেকের গন্ধে বাড়ি ম ম করছে। রান্নাঘরে চলছে জোর প্রস্তুতি। রোজ়ির পরিবারের সবাই আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। আমার মনে হল আমি যেন এক অন্য জগতে এসেছি। রোজ়ি আমাকে ওর ঘরে নিয়ে গেল। সারাদিন দুই বন্ধুতে কত গল্প করলাম। ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁতেই রোজ়ির মা ডাক দিলেন। রোজ়ির সঙ্গে খেতে বসলাম। মনে হল যেন কোনও সাহেব বাড়িতে এসেছি। একেবারে সাহেবি কেতায় সাজানো টেবিল। রোজ়ির বাবা, দাদা, দিদি, ঠাকুমা সবাই বসেছেন। রোজ়ির মা বললেন ভাল করে খাও। আজ তোমার জন্য আমাদের বিশেষ পদ সব রেঁধেছি। আশা করি তোমার ভাল লাগবে। শুরু হল খাওয়া ইয়েলো রাইস দিয়ে, নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি এটি পোলাও জাতীয় একটি পদ। তার সঙ্গে আলুচপ বলে যা দিলেন তাকে আমরা বাঙালিরা জানি মাংসের চপ বলে। এল মাংসের ঝাল ফ্রেজি। পরে জেনেছি আগের দিন মাংসের রোস্ট বাড়তি থেকে গেলে তাই দিয়ে তৈরি করা হয় ঝাল ফ্রেজি।
কিন্তু এর পরে এল যে পদ তা দেখে এবং চেখে আমি তো হতবাক। এক ছড়ানো পাত্রে এসেছে ডিমের পোচের ঝোল। আরে এ পদ তো আমার অতি পরিচিত। আমার ঠাকুমার হাতে রান্না এই পদটি খাবার জন্য আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। রোজ়িদের বাড়িতে এই পদটির নাম ‘পোচড এগ ইন টম্যাটো গ্রেভি’। স্বাদে বর্ণে প্রায় একই রকম। খেতে খেতে ভাবছি কী করে সম্ভব? শেষ পর্যন্ত কৌতূহল চেপে রাখা গেল না। জিজ্ঞেস করলাম কে রেঁধেছেন এই পদটি। প্রশ্ন শুনে রোজ়ির মা, ঠাকুমা পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করলেন। বললেন, আমার কি ভাল লাগছে না পোচড এগের পদটি খেতে। তা হলে ওঁরা আমাকে অন্য কিছু দেবেন। আমি জোরে মাথা নাড়লাম। না না খুব ভাল হয়েছে রান্না কিন্তু আমি জানতে চাই কে রেঁধেছেন এই পদটি। রোজ়ির ঠাকুমার মুখে হাসি ফুটল। রোজ়ির মা বললেন এটি ওঁর শাশুড়ি অর্থাৎ রোজ়ির ঠাকুমা বানিয়েছেন। এই পদটি এই পরিবারের এক বিশেষ রান্না। বংশ পরম্পরায় এ বাড়িতে রান্না হয়ে আসছে। কিন্তু আমি কেন জানতে চাইছি এসব কথা, জিজ্ঞেস করলেন ওঁরা। আমি বললাম আমার ঠাকুমা যাঁর বয়স আশির কাছাকাছি তিনিও এই পদটি রান্না করেন আর তার স্বাদ একবারে একই রকম।
ঠাকুমা দেশ বিভাগের আগে পর্যন্ত কাটিয়েছেন তদানীন্তন পূর্ব বাংলার বরিশাল জেলায়। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী পাঠিকা ছিলেন এ কথা যেমন ঠিক, তাঁর কিন্তু স্কুল বা কলেজের কোনও তকমা ছিল না। ছিল না বহির্বিশ্বের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ।
ডিমের এই পদটির রন্ধন প্রণালী অতি সহজ এবং এর উপকরণ এত সহজলভ্য যে তা নিয়েও কোনও সমস্যা নেই। কথায় আছে ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচারি’। আমার ঠাকুমা যখন লাল তেলের বিছানায় শোয়ানো টম্যাটোর রসে সিক্ত সোনালি ডিমের পোচ আমাদের পরিবেশন করতেন তখন তার সৌন্দর্যে আমাদের ক্ষুধা সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ত। স্বাদ ও দর্শনে অপরূপা এই পদটি আমার ঠাকুমার রান্নাঘরে চুপিসারে ছিল। তার প্রচার হয়নি কোনও।
সেসময়ে মা ঠাকুমাদের মধ্যে রান্নার বই দেখে রান্না করার তেমন চল ছিল না, অন্তত আমাদের পরিবারের মহিলাদের এই প্রবণতা কখনও লক্ষ করিনি। কোনও সূত্রে কলিন্স স্ট্রিট নিবাসী মার্টিন পরিবার দূরের কথা, কোনও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের সঙ্গে তাঁর ন্যূনতম যোগাযোগ ছিল না এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। এসব কথাই সেদিন আমি রোজ়ির পরিবারকে জানিয়েছিলাম। ওঁরা এই ঘটনাকে কাকতালীয় বলে মনে করতে চেয়েছেন কিন্তু আমি কিছুতেই এই যুক্তি মেনে নিতে পারিনি। আজও এই ঘটনা সম্পর্কে তাই আমার বিস্ময় কাটেনি।
রান্নার বই খুঁজলে ডিমের নানা রকমের রন্ধন প্রণালী মিলবে। কিন্তু আমার ঠাকুমার হাতের ডিমের পোচের ঝোলের রন্ধন প্রণালী মিলবে না। শুধুমাত্র ক্যালকাটা কুক বুকের রচয়িত্রী তিন রন্ধন বিশেষজ্ঞার অন্যতম মীনাক্ষী দাশগুপ্তর লেখা বাংলা রান্নার বইতে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রান্না বিভাগে মার্টিন পরিবারের পোচড এগ উইথ টম্যাটো গ্রেভির উল্লেখ মেলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঠাকুমার রান্না করা ডিমের এই বিশেষ পদটি কী করে কলিন্স স্ট্রিটের রান্নাঘরে ঢুকেছিল আজও সে কথা আমাকে ভাবায়, বিস্মিত করে।
উপকরণ: ডিম, টম্যাটো, পেঁয়াজবাটা, আদা ও সামান্য রসুনবাটা, হলুদ ও লঙ্কাবাটা, থেঁতো করা গরমমশলা (এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি), তেজপাতা, নুন, চিনি স্বাদমতো, সরষের তেল বা ঘি।
প্রণালী: টম্যাটোগুলি ঘসে রস বের করে নিন। ৪টি ডিম নিলে অন্তত ২ কাপ রস নেবেন। কড়াইতে তেল গরম করুন। তেলের ঝাঁঝ চলে গেলে তেজপাতা আর থেঁতো করা গরমমশলা (এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি) দিন। ফুটতে শুরু করলে সব বাটা মশলা ও চিনি দিয়ে কষুন। সামান্য জলের ছিটে দিতে পারেন যাতে ধরে না যায়। টম্যাটোর রস দিন। নুন মেশান। খানিকক্ষণ ফুটতে দিন। মাঝারি আঁচে রাখুন। এবার গ্রেভির মধ্যে একটি করে ডিম ভেঙে পোচ করুন। চামচে করে গ্রেভি পোচের উপরে ছড়িয়ে দিন। ডিমের সাদা অংশ জমে গেলে খুব সাবধানে পাত্রে ঢালুন ও উপর থেকে গ্রেভি ছড়িয়ে দিন। আমার মায়ের হাতের এই রান্নাতে ডিমের কুসুম কিন্তু জমানো হত না। আমিও সেইভাবে করার চেষ্টা করি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন