আলপনা ঘোষ
বাঙালির এক কালের প্রিয় ‘ভাদুরে ফল’ তাল নিয়ে গল্পের শেষ নেই। বিশেষ করে আমাদের কেষ্ট ঠাকুরের নানাবিধ লীলাখেলার সঙ্গে যেহেতু এই ফলটিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত আছে নানা গাথা।
ভাদ্র মাসে তাল পাকার সময়েই জন্মেছেন কৃষ্ণ। বছরের এই মোক্ষম সময়ে জন্মে তাল ভাল না বেসে তাঁর উপায় কী? জন্মাষ্টমীর দিন তাই কৃষ্ণভক্তরা বাল গোপালকে তাঁর পছন্দের যেসব বিশেষ মিঠাই নিবেদন করেন তার মধ্যে ঘি-তে ভাজা মুচমুচে তালের বড়া একটি।
জন্মাষ্টমীর পরের দিন আবার নন্দোত্সব। শোনা যায় বাসুদেব কৃষ্ণকে নন্দরাজের কাছে রেখে আসার পরে গোকুলে কৃষ্ণের আবির্ভাব উপলক্ষে নন্দ উৎসবেই প্রথম খাওয়া হয়েছিল তালের বড়া। গ্রামেগঞ্জে এমনকী শহরের বনেদি বাড়িগুলিতেও অর্ধ শতক আগে পর্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হত এই উৎসব। ‘কী আনন্দ হল ব্রজে, কী আনন্দ হল/ তালের বড়া খেয়ে নন্দ নাচিতে লাগিল/ গোকুলে গোয়ালা নাচে, আর নাচে নন্দ/ শিব নাচে, ব্রহ্মা নাচে আর নাচে ইন্দ্র/গোকুলে গোয়ালা নাচে, পাইয়া গোবিন্দ।’ পরনে হেঁটো ধুতি, মাথায় ময়ূরের পালক গোঁজা মুকুটধারী বালক নাচিয়ের দল খোল করতাল সহযোগে এই গান গেয়ে, নেচে তুলসী মঞ্চ প্রদক্ষিণ করত। সব শেষে ঝুড়ি ভরতি করে ওদের মধ্যে বিতরণ করা হত গোপালের প্রসাদ— তালের বড়া বা ফুলুরি আর বিদায়ী হিসাবে বাড়ির কর্তার কাছ থেকে মিলত নতুন ধুতি এবং উত্তরীয়।
বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে সারা ভাদ্রমাস জুড়ে তাল উৎসব। জন্মাষ্টমীর পরে এই মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে আবার উদযাপিত হয় শ্রীরাধার জন্মতিথি। তারপর তালনবমী, বামন দ্বাদশী। উপলক্ষ ভিন্ন হলে কী হবে, বৈষ্ণবরা এই সময় তাল রসের ভাবে এমন বিভোর হয়ে থাকেন যে কোনও ভাবেই এই সময়ে তাঁরা বেতাল হন না। তাই ‘এ ভরা ভাদরে’ তালের বড়া, তালফুলুরি, তালবরফি, পাটালি গড়ার ধুম পড়ে যায়।
কিছুকাল আগে পর্যন্ত ঘরে ঘরে তৈরি হত তালের বড়া। সকাল সকাল স্নান সেরে শুদ্ধ কাপড়ে তাল মেড়ে রস বের করতে বসে যেতেন ঠাকুমা-দিদিমারা। বিকেল জুড়ে চলত ফুলুরি ভাজার কাজ। তবে সেসব এখন অতীত। দোকানেই মিলছে তালের তৈরি হরেক রকম মিষ্টি। তা দিয়েই গোপালকে তুষ্ট করার চেষ্টা চলছে গৃহস্থের ঘরে।
ভাদ্র মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে আজও বাংলার গ্রামেগঞ্জে এয়োস্ত্রীরা ‘তালনবমী’ ব্রত উদ্যাপন করেন। এটি মূলত লক্ষ্মীনারায়ণের পুজো যে পুজোর রীতি অনুযায়ী ব্রতচারিণী পরিপক্ক তাল ফলটি নারায়ণকে প্রথম নিবেদন করে তবে মুখে তোলেন।
পুরাণের কথা অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের দুই মহিষী সত্যভামা এবং রুক্মিণীর মধ্যে স্বামীকে একান্তে পাওয়া নিয়ে অবিরাম অশান্তি লেগেই থাকত। এক ঋষির নির্দেশে সত্যভামা ন’বছর ব্রতপালন করে এই সমস্যা নিরসন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দুষ্ট লোকে বলে এই ব্রত উদযাপনের সময় সত্যভামা নাকি নিজের হাতে কেষ্ট ঠাকুরকে তালের নানাবিধ স্বাদু পিঠে, বড়া, ক্ষীর ইত্যাদি তৈরি করে খাইয়ে বশীকরণ করেছিলেন এবং সেই কারণেই এই ব্রতর নাম হয়েছিল ‘তালনবমী’।
প্রাচীনকালে কলকাতার লোকেদের নতুন কুটুমবাড়িতে নানা উপলক্ষে তত্ত্ব পাঠানো লেগে থাকত প্রায় সংবৎসর ধরে, এ যেন বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। ভাদ্রমাসের তত্ত্বতে আবার তালের একটি মুখ্য ভূমিকা ছিল। অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে যেত তালের বড়া, লুচি, পিঠে, ফুলুরি, তালক্ষীর এবং বেয়াই বেয়ান লেখা দুটি কালো হেঁড়ে তাল।
রসরাজ অমৃতলাল বসুর একটি কবিতাতে এই তালফুলুরির তত্ত্ব কুটুমবাড়িতে পাঠানোর এক রসালো বিশদ বর্ণনা পাই। এই তত্ত্ব নিয়ে দুই বাড়ির মধ্যে আড়ম্বর দেখানোর যে রেষারেষি চলত তা কিন্তু কবির চোখ এড়িয়ে যায়নি। তাই তিনি লিখলেন— ‘তালফুলুরির তত্ত্বে করিয়া জমক/ ধার্য হল লোক মাঝে লাগাবে চমক।’ কীভাবে যাবে সে তত্ত্ব? ‘কাঁধে তাল নিয়ে যাবে আটজন বাঁকি।/ আলগা তালের ঝুড়ি, কুড়ি ধরে রাখি॥/ গুঁড়ি ভরে চাল যাবে, কুটিবার ঢেঁকি।’ তাল মাড়াতে ঝুড়ির প্রয়োজন তাই তত্ত্বতে ঝুড়িও বাদ যায়নি। তালের বড়াতে চালের গুঁড়ি না মেশালে মুচমুচে হবে না সেই কথা মাথায় রেখে চাল কোটার জন্য ঢেঁকি পর্যন্ত যাচ্ছে তত্ত্বতে। তালের ক্ষীর বানাতে লাগবে নারকেলকোরা, তাই কুটুম্বিতার মান রাখতে নারকেলের সঙ্গে কুরুনি পাঠাতেও ভোলেননি কন্যার পিতা।
‘নাচ্-গাড়ি নারিকেল দিলে রবে মান।/কুরিতে কুরুনি তাহা দুখানি দোকান।/গড়িয়ে ক্ষীরের তাল দিলে হবে বেশ।/জানে বটে তত্ত্ব দিতে মেনে নেবে শেষ।’ বেয়ানবাড়িতে যে রাঁধুনি তালের বড়া ভাজবে সে কী পাবে?
‘রাঁধুনি কাপড় পাবে বড়া ভাজিবার।/গামছা তোয়ালে তার হাত মুছিবার।’
লোভে পড়ে বেশি ফুলুরি খেয়ে যদি কারও পেটের ব্যামো হয় তা নিরাময়ের উপায় বাতলে দিতেও রসরাজ ভুলে যাননি। ‘ফুলুরি খাইলে যদি পেটে ধরে ব্যথা।/পেপেরমিন্টো দিতে হবে, নাহিক অন্যথা।’
একটা সময় ছিল যখন গ্রামেগঞ্জে প্রচুর সংখ্যক তালগাছ সারি সারি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। গ্রামগুলি চিহ্নিতকরণের প্রতীক ছিল তখন এই তালগাছ। তাই কবি মঈনুদ্দিন লিখেছিলেন, ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ/ঐ আমাদের গাঁ। ঐখানেতে বাস করে/কানা বগির ছা।’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের সেই ‘তালগাছ’ কবিতা। ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে।’ ছেলেবেলায় এইসব কবিতা পড়েননি এমন বাঙালি খুঁজে মেলা ভার।
ছেলেবেলায় কোনও না কোনও সময়ে আমরা সকলেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘তালনবমী’ গল্পটিও পড়েছি। সকলের মনে আছে নিশ্চয়ই দুটি গরিব বাচ্চা ছেলের নিমন্ত্রণের আশায় বসে থাকার করুণ বিবরণ। তাল পেড়ে বিনা পয়সায় সে তাল তারা বড়লোকের গিন্নির বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল শুধু এই আশায় যে তালনবমীতে ব্রত উদযাপন উৎসবে পাড়ার অন্যদের সঙ্গে তাদের দুই ভাইয়েরও নেমন্তন্ন থাকবে আর তারা অনেক দিন বাদে সেদিন পেট ভরে খেতে পারবে। কিন্তু গরিব বলে ওদের ভাগ্যে নেমন্তন্নই জুটল না। অভাগা দুই ভাইয়ের আশাও পূর্ণ হল না।
এককালে গ্রামে তালগাছের অভাব ছিল না। আকাশ ছোঁয়া গাছগুলিতে প্রচুর তাল ধরত আর পাকা তাল গাছের নীচে ধুপধাপ শব্দ করে পড়ত। রাতবিরেতে তাল পড়ার শব্দ কানে গেলে ভূতপেতনি, সাপখোপের ভয় ভুলে ছেলেপুলেরা এক দৌড়ে পৌঁছে যেত তাল কুড়োতে।
তালগাছের গোড়াতেই থাকত ভয়ংকর সব সাপের গর্ত। অনেক সময় রাতের বেলা গাছ থেকে পাকা তাল পড়ে বিষাক্ত সাপের দেহ যেত থেঁতলে। এ নিয়েও আবার ছড়া বাঁধা হত। যেমন গায়ের উপরে তাল পড়ে আহত সাপ নাকি তালকে বলেছিল, ‘কালা কালা কেবলি,/তুই আমাকে ছেঁচলি?’ উত্তরে তাল বলল, ‘জানিস না আমার জাতের ধারা?/তুই কেন আছিলি আমার তলে খাড়া?’
তালের কথা উঠলেই সকলেরই তালপিঠা খাওয়ার জন্য মন আকুলিবিকুলি করে ওঠে। কথায় বলে ভাদ্রমাসে তালপাকা গরম পড়ে। আর গ্রামেগঞ্জে পাকা তালের মৌ মৌ গন্ধে ভরে যায় চারদিক।
এই মুহূর্তে তাল প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলার কথা। দেশ বিভাগের পরে বরিশাল থেকে আমরা এসে উঠেছি কলকাতার বাসাবাড়িতে। জন্মাষ্টমীর দিন আমাদের বাঙাল হেঁশেলে তালের বড়া, ক্ষীর বানানোর ধুম পড়ে যেত। ঠাকুমা, দিদিমা, মা, পিসি, মাসি সবাই মিলে সেই কাকভোর থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তাল নিয়ে। একজন তাল ছাড়াচ্ছেন তো অন্যজন নতুন ঝুড়ির গায়ে তালের আঁশ ঘসে নির্যাস বের করছেন। কেউ আবার ভেজানো আতপ চাল শিলনোড়ায় বাটছেন। কারও হাতের বিরাম নেই। কেউ নারকেল কুরিয়ে কলাপাতার উপরে চুড়ো করে রাখছেন, কেউ পাকাকলা চটকে বারকোশে জড়ো করছেন। এসবই তাল দিয়ে নানাবিধ মিষ্টি পদ তৈরির উপকরণ।
মনে আছে আমার মা দোপাকা উনুনের সামনে কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসে পেতলের মস্ত কড়াইতে দুধ জ্বাল দিচ্ছেন। আগুনের গনগনে তাপে মায়ের ফরসা মুখে লালের আভা। সাদাসিধে করে লালপেড়ে শাড়ি-পরা মাকে কী সুন্দর দেখাত। অনেকক্ষণ ধরে দুধ জ্বাল দিয়ে সেই ঘন দুধে তালের রস আর বাতাসা মিশিয়ে তৈরি করতেন স্বাদু ক্ষীর।
আমরা বাচ্চারা হা পিত্যেশ করে বসে থাকতাম তালের নুটি আস্বাদনের লোভে। সে নুটি মুখে পড়লে মুখ একেবারে রসময়। পুজোপাট চুকলে তবে তালের বড়া আর পাথরের বাটি করে তাল ক্ষীর দেওয়া হত আমাদের আর মুঠো ভরতি করে মুড়ি। আজও মুখে লেগে আছে সে স্বাদ।
সময়ের পরিবর্তনে যৌথ পরিবারগুলি সব ভেঙে খানখান হয়ে গেছে আর তার সঙ্গে বাড়িতে মা, মাসিদের হাতে তালের বড়া, তালের লুচি, তালের বরফি, ক্ষীর বানানোর পাটও চুকে গেছে। এখন এসব খাওয়ার জন্য দু’-একটি বিশেষ মিষ্টির দোকানই ভরসা। আজ এভাবেই কেটে যাচ্ছে বাঙালির তাল উৎসবের তাল।
এ সত্ত্বেও তালে তাল রেখে তালের বড়ার এক সহজ প্রণালী দিচ্ছি আমার প্রিয় পাঠকদের জন্য।
উপকরণ: তালের ক্বাথ, চালের গুঁড়ো, বাতাসা বা চিনি, নারকেলকোরা, ভাজার জন্য তেল।
প্রণালী: একটি পাত্রে তালের ক্বাথ, চালের গুঁড়ো, নারকেলকোরা ও বাতাসা হালকা গরমজলে ভাল করে মেখে নিন। এর থেকে হাতের তালুর চাপে গোল গোল বড়া বানিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। কড়াইতে তেল গরম করে ডুবো তেলে মুচমুচে, বাদামি করে ভেজে তুলুন তালের বড়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন