পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না

আলপনা ঘোষ

ছেলেবেলায় আমাদের যৌথ পরিবারে মা-ঠাকুমাদের দেখেছি সংসারের সব কাজ সবাই মিলে হাতে হাতে করে ফেলতে। রান্নাঘরের কাজেও তার অন্যথা হতে দেখিনি। কেউ সবজি কাটছেন তো কেউ শাক বাছছেন, কেউ বা আবার আঁশবটিতে মাছ কাটছেন।

দিন পালটেছে। একান্নবর্তী সব পরিবার ভেঙে খান খান। এখন তো সবই অণু পরিবার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রা এবং দৃষ্টিভঙ্গিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। মেয়েরা আজকাল বহির্বিশ্বে পা রাখছেন। সুচারুভাবে সামলাচ্ছেন ঘর ও বাহির। আশার কথা এই যে, তাঁদের জীবনসঙ্গীদের মধ্যেও এসেছে একটা সচেতনতা। স্ত্রী তাঁর দপ্তরের কোনও একটি জরুরি কাজ করছেন ঘরে বসে। বাড়িতে সেই মুহূর্তে অতিথি এসে হাজির। স্বামী চা করছেন, অতিথিকে চা-এর সঙ্গে ঘরে বানানো কেক দিচ্ছেন, নিজেও এক কাপ নিচ্ছেন, কাজে ব্যস্ত স্ত্রীকেও চা দিতে ভুলছেন না।

আজকের এই ইঁদুরদৌড়ের যুগে, যাতে সব চাইতে বেশি টান পড়েছে তা হল সময়। শুধু কি সময়? কাজের মাসিরাও আমাদের জীবন থেকে প্রায় অপসৃয়মাণ। এই পরিস্থিতিতে রান্নাঘর বা যে-কোনও সাংসারিক কাজের ধারাতে পরিবর্তন আসবে, তাতে আর সন্দেহ কী!

ইতিমধ্যেই আমরা সেই পরিবর্তনের ছবি দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে রান্নাঘর-বান্ধব হয়ে উঠেছে। রান্নাকে সহজ থেকে সহজতর করতে কত যে উপকরণ তারা বাজারে আনছে তা গুনে শেষ করা যায় না।

যে-কোনও আধুনিক রান্নাঘরে চটজলদি খাবার গরম করতে ব্যবহৃত হচ্ছে মাইক্রোআভেন, মশলা পিষতে শিলনোড়ার জায়গায় মিক্সি, আবার তরকারি কাটতে বঁটির জায়গায় নানা ধাঁচের ধারালো সব ছুরি। আগে তাওয়া কিংবা লোহার জালির উপরে পাঁউরুটি রেখে উনুনে সেঁকার চল ছিল। আজকাল তার বদলে আমাদের হাতের কাছে রয়েছে ইলেকট্রিক টোস্টার। প্রেসার কুকার নামক বস্তুটি তো বহুদিন যাবৎ আমাদের রান্নাঘরের কাজে বিশেষ অপরিহার্য সরঞ্জাম হিসেবে কায়েম হয়ে বসেছে। এরকম হাজারটা রান্নার সরঞ্জাম এখন আধুনিক কর্মব্যস্ত নারীর হাতের কাছে মজুত রয়েছে তাঁর কাজকে শুধু সহজতর করতে নয়, দ্রুত সম্পন্ন করতেও।

বাঙালি ভোজনরসিক সে-কথা কে না জানে! কিন্তু আধুনিক কর্মব্যস্ত জেটযুগে সময় কোথায় দীর্ঘ সময় নিয়ে রান্না করবার? মোচা, থোড়, এঁচোড় ইত্যাদি তরকারি কেটেকুটে রান্না করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তাই এসব পদ বাড়িতে রান্না করার পাট প্রায় উঠে গেছে বললেই হয়। তবে সাম্প্রতিক কঠিন প্রতিযোগিতার যুগে আধুনিক শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাজারগুলিতে কেটেকুটে প্যাকেটজাত মোচা, থোড়, এমনকী শুক্তোর সবজি পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।

ধোঁকার ডালনা, দোসা, ইদলি, ধোকলা করতে ডাল ভেজানো বা বাটার হ্যাপা থেকে মুক্তি দিতে নামীদামি কোম্পানিগুলো বাজারে আমদানি করেছে প্যাকেটজাত বিভিন্ন ডালের মিশ্রণ। লঙ্কা, হলুদ, জিরে, ধনের এমনকী সরষের মতো মশলার গুঁড়ো তো আজ অতি সহজলভ্য। আজকের পেশাদার রমণী ছুটির দিনে এইসব উপকরণের সাহায্যে অতি সহজে স্বাদু কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে জটিল সব পদ রান্না করে অতিথি ও প্রিয়জনদের খাইয়ে তৃপ্ত করছেন এবং নিজেও তৃপ্ত হচ্ছেন।

এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে, নানাবিধ সুবিধা থাকলেও সোম থেকে শুক্র সাংসারিক নানাবিধ দায়িত্বের পাশাপাশি রোজকার রান্নার কাজটি সম্পন্ন করে সারাদিনের মতো নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কঠিন দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করা কিন্তু খুব সহজ ব্যাপার নয়। রান্না করা মেয়েদের একটি সহজাত গুণ। পেশার দিক দিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপিকা বা অভিনেতা যাই হোন না কেন, রান্নাটা তাঁরা ভালবেসেই করে থাকেন। ভাবনাচিন্তা করে, স্বাদু স্বাস্থ্যকর চটজলদি রান্না করাতে তাঁদের জুড়ি মেলা ভার।

শুধুমাত্র বাংলা রান্নাই নয়, আজ আধুনিক বঙ্গরমণী তাঁর হেঁশেলে অন্য প্রদেশের রান্না নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন। ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রস্তুত বিদেশি রান্নাও ব্রাত্য নয় তাঁদের কাছে। এই কারণে বাঙালির হেঁশেলে ভিন্ন দেশি রান্নার প্রভাবও কিছু কম নয়। এর ফলেই বোধ হয় রন্ধন পদ্ধতিতে এসেছে যুগান্তকারী সব পরিবর্তন। ঝাল, ঝোল, ঘণ্ট-র পাশাপাশি বাঙালির আজ পছন্দ বেকড, স্টিমড বা রোস্টেড ফুড। কম তেলমশলা, কম সময়ে প্রস্তুত স্বাদু রান্না তৈরি করে আমাদের ঘরোয়া রন্ধনশিল্পীরা তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের আপনজনদের।

আগেই বলেছি, যে-কোনও রান্নার ক্ষেত্রে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই কারণে চটজলদি রান্নার ক্ষেত্রে রান্নার পদ্ধতি এবং উপকরণের ভূমিকা কিন্তু যথেষ্ট জরুরি। পদ্ধতি যত সহজ হবে, উপকরণে জটিলতা যত কম থাকবে, আজকের জেট রাঁধুনিদের পক্ষে তত সহজতর হবে একটি স্বাদু চটজলদি পদ বানিয়ে ফেলা। পদ্ধতি সহজ করতে সেদ্ধ, ভাপে, পুড়িয়ে রান্না অনেকটা সময় বাঁচাতে সাহায্য করে। এই ধরনের রান্নার প্রচলন কিন্তু বাঙালির হেঁশেলে যথেষ্ট প্রাচীন। তাই আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে বিশেষ করে আমাদের মঙ্গলকাব্যগুলিতে পোড়া, ভর্তা, সেদ্ধ, ভাপে বা দমে রান্নার ঝুড়ি ঝুড়ি উল্লেখ পাই। তবে অনেকের মতে দমে রান্নার শুরু হয়েছিল মোগল সম্রাটদের আমলে। এখন তো এসব রান্না করতেও হাতের কাছে মেলে নানাবিধ সরঞ্জাম।

প্রেশার কুকারের উল্লেখ তো আগেই করেছি। এই বস্তুটি রান্নার জগতে প্রায় বিপ্লব এনে দিয়েছে। আগে চাল, ডাল, মাংস আমরা উনুনে কড়াই বা ডেকচি বসিয়ে তাতে রান্না করতাম যা ছিল সময়সাপেক্ষ। এখন প্রেশার কুকার, স্টিমার প্রভৃতি নানাবিধ সরঞ্জামের সাহায্যে ভাত, ডাল, মাছ, মাংস, এমনকী কিছু সবজিও সময় বাঁচিয়ে ও জ্বালানির সাশ্রয় করে রেঁধে ফেলা কোনও সমস্যাই নয়। স্বাদের দিক দিয়েও এতে কোনও হেরফের হয় না।

বিশেষ বিশেষ রান্নাতে উপকরণের বাহুল্য দেখা যায়। অনেকেরই ধারণা আছে যে রান্নাতে বেশি উপকরণের বাহুল্য থাকলেই সে রান্না স্বাদেগুণে সর্ব সেরা হবে। এ ধারণাও ঠিক নয়। কম মশলা, কম তেল দেওয়া রান্নাও কিছু কম স্বাদু হয় না তবে তাতে প্রয়োজন রাঁধুনির হাতের কেরামতি।

রান্না করবার আগে তার জোগান দেওয়ার কাজটিও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজকাল তো এই কাজটিও গৃহিণীদের নিজের হাতেই করে নিতে হয়।

আমাদের ছেলেবেলায় কিন্তু সময়ের পুঁজিতে এত টান পড়েনি। গৃহিণীরা তখন বেশির ভাগই অন্তঃপুরবাসিনী। সেসময়ে আমার মা-ঠাকুমাকে দেখেছি আচমকা বাড়িতে অতিথি এসে উপস্থিত হলে, চটজলদি কিছু একটা বানিয়ে ফেলতে। মা এবং ঠাকুমার হাতের ফিশ কাটলেট ছিল এমনই একটি পদ যা বানাতে তেমন কিছু ঝকমারি ছিল না। যে-কোনও মাছ, তা সে রুই, কাতলা বা আড়, যাই বাড়িতে থাকুক না কেন, তার থেকে দু’-তিনটি গাদার মাছ নিয়ে তাতে নুন-ভিনিগার মেখে সেদ্ধ করে কাঁটা বেছে রাখতেন। এতে সামান্য আদা-রসুন বাটা, মিহি করে কুচনো পেঁয়াজ, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা ও স্বাদমতো নুন মিশিয়ে জলে ভেজানো পাঁউরুটি, জল নিংড়ে মাছের সঙ্গে ভাল করে মেখে, কাটলেটের আকারে গড়ে ডিম বা ময়দার গোলায় চুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়োতে গড়িয়ে নিয়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই কাটলেট প্রস্তুত।

এরকম হাজারটা চটজলদি রান্না করতে অভ্যস্ত এই প্রজন্মের মেয়েরাও। সময় ও স্বাস্থ্য এই দুটি বিষয়কে মাথায় রেখে তাঁরা তাঁদের রান্নার পরিকল্পনা করেন, যার মধ্যে স্বাদ এবং বৈচিত্র্য কোনওটারই অভাব ঘটে না।

স্যুপ, স্যালাড, নানা স্বাদের মকটেল, নানাবিধ পুর-ভরা অমলেট, আলুর চপ, নানা স্বাদের চাট, নানা কিসিমের পকোড়া, নিমকির মতো চায়ের সঙ্গে টা যেমন করে ফেলা তত কঠিন নয়, তেমনি দুপুর বা রাতের খাওয়াতেও ভাপে, দমে, এমনকী কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন সহযোগে বাঙালির নির্ভেজাল বেগুন-মাছের ঝোল কিংবা পাঁচফোড়ন দেওয়া পাঁচমেশালি নিরামিষ তরকারিও কম স্বাদু নয়।

মেটেভাজা

উপকরণ: মেটে, পেঁয়াজবাটা, রসুনবাটা, আদাবাটা, কুচনো টম্যাটো, টম্যাটো স্যস, স্বাদ অনুযায়ী নুন, গোলমরিচ এবং তেল।

প্রণালী: প্যানে বেশ খানিকটা তেল গরম করে তাতে পরিমাণমতো পেঁয়াজবাটা দিন ও মাঝারি আঁচে বাদামি করে কষুন। এবারে এতে বাকি বাটা মশলা দিন। ভাজা গন্ধ বেরুলে কুচনো টম্যাটো দিন ও গলে এলে তাতে মেটে দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে মিনিট দুয়েক রাখুন। স্যস, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো ভাল করে মিশিয়ে নামিয়ে নিন।

পছন্দ হলে মেটের সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস, সেদ্ধ ডিম, সেদ্ধ করা মটরশুঁটি দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করতে পারেন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%