পর্তুগিজ এল দেশে

আলপনা ঘোষ

১৫৭৯ সাল নাগাদ পর্তুগিজ সাহেব পেদ্রো ট্রাভারেস মোঘল সম্রাট আকবরের ‘ফরমান’ নিয়ে এই বঙ্গভূমিতে পা রেখেছিলেন ধর্ম প্রচার ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। ব্যান্ডেল চার্চ ও ব্যান্ডেল শহরের নামকরণ ওঁরই কীর্তি। সাগরপার থেকে যত ফিরিঙ্গি— ইংরেজ, ফরাসি ও ওলন্দাজেরা— হানা দিয়েছে বঙ্গভূমিতে, তাদের মধ্যে প্রথম কিন্তু পর্তুগিজরা। সেই প্রথম পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন বাঙালির। স্বাভাবিকভাবে তার প্রভাব পড়ল তার ভাষা এবং খাদ্যরুচিতে।

রান্নায় আলুর ব্যবহার অজানা ছিল সে যুগের বঙ্গসন্তানের কাছে। সেই আলুর সঙ্গে পরিচয় করাল এই পর্তুগিজরা। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে এক পর্তুগিজ সাহেব নাকি বন্ধু ওয়ারেন হেস্টিংসকে উপহার দিয়েছিলেন এক বস্তা আলু। তিনি নাকি কী মনে করে আলুর চাষ শুরু করে দিয়েছিলেন।

বাঙালির ভাবের ঘরে অবশ্য আলুর অনুপ্রবেশ আরও অনেক পরে। আলুর সঙ্গে তার প্রেম তখন এমনই গভীর হল যে সেই ১৮ শতকে নবাবি সংস্কৃতির সৌজন্যে যে বিরিয়ানি কলকাতায় ঢুকেছিল তাতে বাঙালি সংযোজন করল পর্তুগিজ আলু। এখন তো কলকাতা বিরিয়ানি আলু ছাড়া ভাবাই যায় না।

বঙ্গভূমিতে পর্তুগিজ অনুপ্রবেশের অনেক আগেই ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গোয়া, দমন ও দিউ ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ যার স্থায়িত্ব বজায় ছিল ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। গোয়ার রন্ধনকুশলতায় পর্তুগিজ প্রভাব তাই অনস্বীকার্য।

বাঙালি যে রান্নায় শুকনো ও কাঁচালঙ্কার ব্যবহার জানত না সে কথা আজ কেউ বোধহয় আর বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু ইতিহাস বলে রান্নায় এই লঙ্কা ব্যবহারের জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে সেই পর্তুগিজ সাহেবদের কাছে, কারণ তাঁরা লঙ্কা নামক বস্তুটিকে এই ভারতভূমে আমদানি করেছিলেন সুদূর আমেরিকা থেকে।

আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, লিচু প্রভৃতি স্বাদু ও রসালো যেসব ফলের আমদানি হয়েছিল এ দেশে, তাও নাকি এই বিদেশিদের সৌজন্যে। এই কারণেই পর্তুগিজ ‘আনানাস’ নামটির সঙ্গে মিল রয়েছে আমাদের বাঙালি ‘আনারস’-এর।

বাঙালির অতি প্রিয় লুচির পিছনেও রয়েছে পর্তুগিজ অবদান। কারও কারও মতে বাঙালির জিভে জল-আনা শুক্তো পদটির উৎপত্তি ঘটেছিল নাকি পর্তুগিজ হেঁশেলে। শুক্তোর অন্যতম প্রধান উপকরণ করলা যদিও নির্ভেজাল একটি বাঙালি সবজি, কিন্তু রান্নাবান্নার ইতিহাস অনুসারে জানা যায়, প্রাচীন পর্তুগিজ হেঁশেলে শুক্তো রান্নার চল ছিল। শুধু কি তাই? শিঙাড়ার পুর এবং মাংসের ঝোলে আলুর ব্যবহারও আমরা শিখেছি পর্তুগিজদের কাছ থেকে।

বাঙালির ছানা দিয়ে তৈরি মিষ্টির পেছনে পর্তুগিজদের অবদান কম নয়। আর্য সমাজে দুধ কাটিয়ে ছানা বানানো নিয়ে যে ধর্মীয় বিধিনিষেধ ছিল তা কিন্তু উঠে যায় সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে বঙ্গভূমিতে পর্তুগিজ আগমনের পরে। চিজ়-ভক্ত পর্তুগিজরা দুধ কাটিয়ে চিজ় বানাতেন। আজও ব্যান্ডেল চিজ়ের সঙ্গে পর্তুগিজদের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

খাদ্যগবেষক টি কে আছাইয়ার মতে বাঙালি মিষ্টি বানানোর কারিগরেরা লেবুর রস জাতীয় পদার্থ যোগে দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করার বুদ্ধিটি নিয়েছিলেন পর্তুগিজদের থেকে আর তার থেকেই শুরু হয়েছিল বাঙালির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মিষ্টি— সন্দেশ, রসগোল্লা যার যাত্রাপথ পর্তুগিজ কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সময় থেকে।

পর্তুগিজ শব্দ ‘পাঁও’ থেকে বাঙালি পাঁউরুটির উৎপত্তি আর তার শুরুও করেছিলেন কলকাতাবাসী পর্তুগিজেরা। তাঁদের হাত দিয়েই কেক, পেস্ট্রির সঙ্গে প্রথম পরিচয় বাঙালির। পরে অবশ্য সে পরিচয়ের আরও উন্নতি ঘটে যখন কলকাতাতে ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসি, ইহুদি প্রমুখ বিদেশিরা এসে বসবাস করতে শুরু করেন। বেকারিজাত খাদ্যবস্তুর প্রতি বাঙালিদের আকর্ষণ সেই সময় থেকেই।

৯০-এর দশকে পর্তুগিজ ভাষা শিখতে গিয়ে আমার পরিচয় হয়েছিল শিক্ষিকা নাতালিয়া বিয়েকের সঙ্গে। সে পরিচয় অচিরে বন্ধুতায় পরিণত হয়েছিল। নাতালিয়া শুধু ভাষাবিদ ছিলেন না, ছবি আঁকা, সংগীত এমনকী নানা ধরনের রান্নাবান্নায় তাঁর পারদর্শিতা ছিল অসাধারণ। জন্মসূত্রে তিনি পর্তুগিজ ছিলেন কিন্তু তাঁর স্বামী ছিলেন জার্মান। সেই সূত্রেই তিনি কয়েক বছরের জন্য কলকাতাবাসী হয়েছিলেন। ওঁর স্বামী সে সময়ে কলকাতার ম্যাক্সমুলার ভবনের পরিচালক।

প্রায়ই নাতালিয়া তাঁর আলিপুরের বাংলোতে তাঁর ভাষা ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের নিমন্ত্রণ করতেন। উদ্দেশ্য পর্তুগিজ সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয় করানো। পর্তুগিজ চলচ্চিত্র, সংগীত ও রান্নার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমাদের ওঁর সৌজন্যে। অবশ্য ছাত্র-ছাত্রীদের পর্তুগিজদের রন্ধন-সংস্কৃতির প্রতিই আকর্ষণ ছিল বেশি।

আমার রান্নাবান্নায় আগ্রহের কথা জানতে পেরে আমাকে নিজে হাত ধরে নাতালিয়া শিখিয়েছিলেন কিছু পর্তুগিজ রান্না। আজ পর্তুগিজ রান্না বিষয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে সেসব দিনের কথা।

তাই নাতালিয়ার কাছে শেখা দুটি পর্তুগিজ পদ দিয়ে শেষ করছি আজকের পর্ব।

ভিন্ডালু

উপকরণ: পর্ক চৌকো করে কাটা।

মশলার মিশ্রণের উপকরণ: রেড ওয়াইন ভিনিগার, আদাবাটা, রসুনবাটা, শুকনোলঙ্কা বাটা, ধনে, জিরে, লবঙ্গ, ছোটএলাচ, দারচিনি (শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করা), নুন।

রান্নার জন্য: সরষের তেল, ফোড়নের জন্য: তেজপাতা ও গোটা গোলমরিচ।

প্রণালী: মাংসতে নুন ভিনিগার এবং মশলার মিশ্রণ ভাল করে মেখে একটি কাচের পাত্রে ১৮-২৪ ঘণ্টা রেখে দিন।

একটি স্টেইনলেস পাত্রে তেল গরম করুন ও তাতে তেজপাতা ও গোলমরিচ ফোড়ন দিয়ে মশলামাখা মাংস ও পুরোটা মিশ্রণ ঢেলে দিন। ভাল করে নাড়াচাড়া করুন। কম আঁচে ঢাকা দিয়ে ঘণ্টা তিনেক ধরে মাংস রাঁধুন যতক্ষণ না মাংস সুসিদ্ধ হয়।

সাদা ভাতের সঙ্গে গরম গরম ভিন্ডালু পরিবেশন করুন।

ফ্রিজে ভিন্ডালু এক সপ্তাহ পর্যন্ত রেখে খাওয়া যায়।

বোলো দ্য পর্তুগাল

পর্তুগিজ ভাষায় ‘বোলো’ শব্দের অর্থ হল কেক।

উপকরণ: সুজি ১ কাপ, গুঁড়ো চিনি ১ কাপ, মাখন / কাপ, ডিম ৪টে, অ্যামন্ডস বা কাঠবাদাম ১২৫ গ্রাম, গোলাপ জল ২ চা চামচ, ব্র্যান্ডি ১ টেবিল চামচ।

প্রণালী: গোলাপজল দিয়ে কাঠবাদাম মিহি করে পিষে নিন। এবারে এতে মাখন, গুঁড়ো করা চিনি ও সুজি দিয়ে ভাল করে ফেটান। এই মিশ্রণে একটি করে ডিমের কুসুম দিন ও ফেটাতে থাকুন। ভাল ফেটানো হলে ব্র্যান্ডি মেশান। অন্য একটি পাত্রে ডিমের সাদা ফেটিয়ে রেখে দিন। এবারে এই মিশ্রণে ডিমের সাদা মিশিয়ে একটি পাত্রে মাখন মাখিয়ে তাতে ময়দা ছড়িয়ে পুরো মিশ্রণ ঢেলে ১৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ওভেনে বেক করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%